র‌্যাবের চাকরিচ্যুত ৩ কর্মকর্তাকেঢাকা ক্যান্টনমেন্টে লগ এরিয়ায়অন্তরীণ

0
32

নারায়ণগঞ্জের ওয়ার্ড কাউন্সিলর নজরুল ইসলামসহ সাতজনের লাশের সাথে সেদিন আরো চারটি লাশ ফেলা হয় শীতলক্ষ্যায়?

 

স্টাফ রিপোর্টার: নারায়ণগঞ্জের ওয়ার্ড কাউন্সিলর নজরুল ইসলামসহ ৭ জনকে অপহরণের পর খুনের নেপথ্যের চাঞ্চল্যকর তথ্য একের পর এক বেরিয়ে আসছে। তাদেরকে কীভাবে হত্যা করা হয়েছে তাও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে স্পষ্ট হয়েছে। গতকাল ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়েছে। অপরদিকে টাকার বিনিময়ে হত্যার অভিযোগে র‌্যাবের চাকরিচ্যুত ৩ কর্মকর্তাকে ঢাকা ক্যান্টেনমেন্টে লগ এরিয়ায় অন্তরীণ রাখা হয়েছে বলে একাধিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।

নারায়ণগঞ্জের ওয়ার্ড কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম ও আইনজীবী চন্দন সরকারসহ সাতজনের লাশের সাথে সেদিন আরো চারটি লাশ ফেলা হয় শীতলক্ষ্যায়। এ শেষের চারজনের অপরাধ, তারা সাতজনের লাশ নদীতে ফেলার দৃশ্য দেখে ফেলেছেন। তাই এচারজনকে হত্যা করে লাশ একই স্থানে ডুবিয়ে দেয়া হয়।নূর হোসেনেরই একঘনিষ্ঠ ক্যাডার কিলিং মিশনে অংশ নিয়ে তার আরেক বন্ধুর কাছে এসব তথ্য ফাঁসকরে। পুলিশও তথ্যটি বেশ গুরুত্বের সাথে নিয়ে শীতলক্ষ্যার যে যে স্থান থেকেসাত লাশ উদ্ধার হয়েছে সেখানে আরো অনুসন্ধানের পরিকল্পনা নিয়েছে।মিশনেঅংশ নেয়া কিলারের বন্ধুটির তথ্যমতে, লাশ সাতটি খুনিরা দুটি নৌকাযোগেশীতলক্ষ্যা ও ধলেশ্বরী নদীর সংযোগস্থলে নেয়। পরে লাশের সাথে ইট বেঁধেনদীতে ছেড়ে দেয়া হয়। আর এ ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ওই দু নৌকার মাঝিরকপালেও জোটে একই পরিণতি। তাদেরকেও গুলি করে হত্যা করে লাশ ফেলা দেয়া হয়একই স্থানে। পাশেই মাছ ধরছিল এমন দুই ব্যক্তি এই ঘটনা দেখে ফেলায় তাদেরওধরে খুন করে লাশ নদীতে ডুবিয়ে দেয় খুনিরা।

নারায়ণগঞ্জের কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম, আইনজীবী চন্দনকুমার সরকারসহ ৭ জনকে হত্যার আগে তাদের মাথায় আঘাত করে অচেতন করা হয়। এরপরগলায় রশি  পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়। হত্যার পর লাশ যাতে ভেসে নাওঠে এ জন্য পেট ফুটো করে দেয়া হয়েছিলো। নিহতদের পোস্ট মর্টেম রিপোর্টে এমনইতথ্য মিলেছে। গতকাল আনুষ্ঠানিকভাবে পোস্টমর্টেম রিপোর্ট উপস্থাপন করা হয়।রিপোর্টের তথ্য অনুযায়ী অপহরণের রাতেই তাদের হত্যা করে নদীতে ফেলে দেয়া হয়।লাশ উদ্ধার থেকে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয় ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টা আগে।

এদিকে একাধিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, নারায়ণগঞ্জেসাত খুনের ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে ত্রাণমন্ত্রী মায়ার জামাইলেফটেন্যান্ট কর্নেল তারেক সাঈদ মাহমুদসহ চাকরিচ্যুত ৩ র‌্যাব কর্মকর্তাকেঢাকা ক্যান্টনমেন্টে লগ এরিয়ায়অন্তরীণ করা হয়েছে।তাদের বিরুদ্ধেওঠা অভিযোগের বিষয়ে অধিকতর তদন্তের স্বার্থে বুধবার তাদেরকেক্যান্টনমেন্টে লগ এরিয়ায় অন্তরীণ করা হয়। অন্তরীণ অপর দু র‌্যাবকর্মকর্তা হলেন, মেজর আরিফ হোসেন ও লে. কমান্ডার এমএম রানা।অন্তরীণঅবস্থায় তারা মোবাইলফোন, টেলিফোন এবং ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারবেন না।শুধু অনুমতি সাপেক্ষে স্ত্রী-সন্তানের সাথে দেখা করতে পারবেন।এর আগে গত মঙ্গলবার সশস্ত্র বাহিনীর এই তিন কর্মকর্তাকে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে অবসরে পাঠানো হয়।তাদেরবিরুদ্ধে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর গডফাদার নূর হোসেন ওরফেহোসেন চেয়ারম্যানের কাছ থেকে ছয় কোটি টাকা ঘুষ নিয়ে আরেক কাউন্সিলর নজরুলইসলাম ও প্রবীণ আইনজীবী চন্দন সরকারসহ সাতজনকে অপহরণ করে হত্যায় জড়িতথাকার অভিযোগ রয়েছে।সশস্ত্র বাহিনীর তিন কর্মকর্তার মধ্যে সেনাকর্মকর্তা তারেক সদ্য সাবেক অধিনায়ক সেনা কর্মকর্তা আরিফ র‌্যাব-১১’রকর্মকর্তা ছিলেন। খুনের অভিযোগ ওঠায় সেনাবাহিনী দুজনকে আগাম অবসরে (প্রিম্যাচিউরড রিটায়রম্যান্ট) পাঠিয়েছে।নারায়ণগঞ্জ র‌্যাব ক্যাম্পের সাবেক প্রধান ছিলেন নৌ কর্মকর্তা রানা। তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছে নৌবাহিনী।গত মঙ্গলবারসেনা সদর দফতর থেকে দু কর্মকর্তা তারেক ও আরিফ এবং নৌবাহিনী সদর দফতরথেকে রানাকে অবসরে পাঠানো সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।তবেঅবসরে পাঠানো হলেও সাত খুনে জড়িত থাকার অভিযোগে সশস্ত্র বাহিনীর এ তিনকর্মকর্তাকে আপাতত গ্রেফতার করা হচ্ছে না। অভিযোগের বিষয়ে অধিকতর তদন্তেরস্বার্থে তাদেরকে ক্যান্টনমেন্টে অন্তরীণ করা হয়েছে।তদন্ত সম্পন্ন হওয়ার আগ পর্যন্ত তারা ক্যান্টমেন্টে লগ এরিয়ায়অন্তরীণ থাকবেন।অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাদেরকে ফৌজদারি আইনে আদালতের মুখোমুখি হতে হবে।

অপরদিকে নারায়ণগঞ্জ পুলিশসূত্র বলেছে, নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাত গুম-খুনের ঘটনাটির সাথে র‌্যাব সদস্যদের সম্পৃক্ততার কথা প্রথম থেকেই জানতো পুলিশ। অপহরণের আগেআদালত চত্বরে র‌্যাব সদস্যকে আটক করার পর সেখানে অবস্থানরত পুলিশ সদস্যরাধরে নিয়ে ছিলেন র‌্যাব কোনো অপারেশন চালাতে সেখানে অবস্থান নিয়েছে। এজন্যপরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর আটক র‌্যাব সদস্যকে ছেড়ে দেয়া হয়। অন্য একটি সূত্রজানিয়েছে, অপহরণ ঘটনার পরপরই জেলা পুলিশ জানতে পারে প্যানেল মেয়র নজরুলইসলাম, আইনজীবী চন্দন সরকার ও তাদের পাঁচ সহযোগীকে র‌্যাব হেফাজতে নিয়েগেছে। এ জন্য প্রথম দুদিন পুলিশ নজরুলসহ অন্যদের উদ্ধারে তেমন কোনো তৎপরতাদেখায়নি। তবে ঘটনার দুদিন পেরিয়ে গেলেও র‌্যাব যখন বিষয়টি অস্বীকার করতেথাকে তখন টনক নড়ে পুলিশের। তখনই তারা বুঝতে পারে এই সাতজনকে জীবিত উদ্ধারকরা আর সম্ভব নয়। এজন্য নারায়ণগঞ্জের প্রতিটি উপজেলায় টহল পুলিশদের সতর্ককরে দেয়া হয়। অপরদিকে অপহরণের ঘণ্টা দুয়েক আগে আদালত চত্বরে নজরুলকেঅনুসরণকারী শাদা পোশাকের র‌্যাবের এক সদস্যের বিষয়ে খোঁজ করতে থাকে পুলিশ।অস্ত্রসহ শাদা পোশাকে আটক হওয়া ওই র‌্যাব সদস্য সম্পর্কে জানতে পুলিশের দুকনস্টেবল ওমর হাওলাদার ও রফিক ইসলামকে ডেকে নিয়ে কথা বলেন পুলিশেরঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। দু কনস্টেবল র‌্যাব সদস্যকে আটকের পুরো কাহিনীকর্মকর্তাদের কাছে খুলে বলেন। নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের একাধিক কর্মকর্তাপ্রথম দিন থেকে র‌্যাব যে নজরুলসহ অন্যদের ধরে নিয়ে গিয়েছিলো তা জানার কথাস্বীকার করেছেন। জেলা পুলিশ সুপার খন্দকার মহিদ উদ্দিন বলেন, মামলার তদন্তচলছে। যারাই জড়িত হোক তাদের শনাক্ত ও গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।

এদিকে নারায়ণগঞ্জেরচাঞ্চল্যকর সাত অপহরণ ও খুনের মামলায় র‌্যাবের সাবেক তিন কর্মকর্তাকেআসামি করা হচ্ছে। মামলার এজাহারভুক্ত ৬ আসামির সাথে এদের নামঅন্তর্ভুক্তির আবেদন করা হবে বলে জানিয়েছেন নিহত প্যানেল মেয়র নজরুলইসলামের পরিবারের সদস্যরা। মামলার  আসামিদের গ্রেফতারের জন্য বিশেষ কমিটিকরেছে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ। এ কমিটিপ্রধান সন্দেহভাজন নূর হোসেনসহঅন্যদের গ্রেফতারে অভিযান চালাচ্ছে। একই সাথে তারা ঘটনার রহস্য উদঘাটনেরজন্য বিভিন্ন ক্লু অনুসন্ধানে নিয়োজিত বলে জানিয়েছেন নারায়ণগঞ্জের পুলিশসুপার। ৬ কোটি টাকা লেনদেনের বিষয়ে তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহের কাজও চলছে।ইতোমধ্যে দুটি বেসরকারি ব্যাংককে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট অ্যাকাউন্টের লেনদেনেরতথ্য জানাতে চিঠি দেয়া হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়রনজরুল ইসলামসহ সাতজনকে অপহরণ ও হত্যার ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার কারণের‌্যাব-১১’র সদ্য প্রত্যাহারকৃত অধিনায়ক লে. কর্নেল তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, মেজর আরিফ হোসেন এবং নারায়ণগঞ্জ ক্যাম্পের সাবেক প্রধান লে. কমান্ডার মাসুদরানাকে অবসর দেয়া হয়েছে। সেনাবাহিনীর দু সদস্যকে অকালীন এবং নৌবাহিনীরএকজনকে বাধ্যতামূলক অবসর দেয়া হয়। গত মঙ্গলবার সেনা সদর এবং নৌবাহিনী সদর দফতরথেকে আলাদাভাবে এ সংক্রান্ত আদেশ জারি করা হয়েছে। তিন কর্মকর্তাকে অবসরেপাঠানোয় এখন তাদের গ্রেফতারে আর কোনো আইনি বাধা নেই বলে জানিয়েছেনসংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা। একই সাথে ঘটনার পর প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়ারক্ষেত্রে নারায়ণগঞ্জের সাবেক এসপির কোনো গাফিলতি ছিলো কি-না তাও খতিয়ে দেখাহচ্ছে।

উল্লেখ্য, গত২৭ এপ্রিল দুপুর ২টায় ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের ফতুল্লার খান সাহেবওসমান আলী স্টেডিয়ামের সামনে থেকে কাউন্সিলর নজরুলকে বহনকারীপ্রাইভেটকারটিকে সামনে এবং পেছন থেকে দুটি মাইক্রোবাস ঘিরে ধরে।পরেনজরুলসহ তার প্রাইভেটকারচালক জাহাঙ্গীর, বন্ধু তাজুল, স্বপন ও লিটনকেঅস্ত্রের মুখে প্রাইভেটকার থেকে নামিয়ে মাইক্রোবাসে তুলে নেয়া হয়। এছাড়াওঅপহরণ করা হয় প্রবীণ আইনজীবী চন্দন কুমার সরকার ও তার প্রাইভেটকার চালকইব্রাহিমকে।অপহরণের চার দিন পর ৩০ এপ্রিল বিকেল থেকে সন্ধ্যাপর্যন্ত শীতলক্ষ্যা নদী থেকে নজরুল ইসলাম ও চন্দন সরকারসহ ছয়জনের লাশউদ্ধার করে পুলিশ। পরদিন ১ মে নজরুলের গাড়িচালক জাহাঙ্গীরের লাশও উদ্ধারকরা হয় শীতলক্ষ্যা থেকেই।এরপর প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামের শ্বশুরঅভিযোগ করেন, ৬ কোটি টাকার বিনিময়ে র‌্যাব ওই সাতজনকে হত্যা করেছে। এঅভিযোগের পর একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা তদন্তে নামে।

প্রধানমন্ত্রীরকার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, সাতজনকে অপহরণের পর প্রধানমন্ত্রীর দফতরেরনির্দেশে তিন কর্মকর্তাকে গত ২৮ এপ্রিল স্ব স্ব বাহিনীতে ফেরত পাঠানো হয়।এরপরপ্রধানমন্ত্রীর দফতর থেকে তাদের অবসরে পাঠানোরও নির্দেশ দেয়া হয়। এনির্দেশের ভিত্তিতে মঙ্গলবার তিন কর্মকর্তাকে অবসরে পাঠানোর বিষয়টি চূড়ান্তকরে সেনা ও নৌবাহিনী। এরপর বিকেলের দিকে তাদের অবসরের আদেশ পাঠানোরপ্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।চাঞ্চল্যকর সাত খুনের ঘটনায় সাবেকএ তিন কর্মকর্তার জড়িত থাকার অভিযোগ তদন্ত করতে একটি কমিটি গঠন করেছের‌্যাব।চার সদস্যের তদন্ত কমিটির প্রধান হলেন র‌্যাবের অতিরিক্তমহাপরিচালক আফতাব উদ্দিন আহমেদ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here