রায়ের খসড়ার অংশবিশেষ ফাঁস হয়েছে : ট্রাইব্যুনাল

0
35

স্টাফ রিপোর্টার: সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার চূড়ান্ত রায়ের খসড়া কপির কিছু অংশ কোনো-না কোনোভাবে ফাঁস হয়েছে বলে স্বীকার করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এ বিষয়ে রাজধানীর শাহবাগ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে। জিডি নম্বর ৮৫। ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার একেএম নাসিরউদ্দিন মাহমুদ গতকাল বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা জানান। বেলা দেড়টার দিকে ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রারের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে নাসিরউদ্দিন মাহমুদ বলেন, চূড়ান্ত রায় প্রকাশের আগে সেটা ট্রাইব্যুনালের কম্পিউটারে খসড়া আকারে প্রস্তুত করা হয়। চূড়ান্ত রায়ের সাথে কথিত ফাঁস হওয়া রায়ের অনেক জায়গাতেই মিল নেই। যেমন, মূল রায়ে অনুচ্ছেদ নম্বর থাকে। কিন্তু কথিত ফাঁস হওয়া রায়ে অনুচ্ছেদ নম্বর নেই। এ বিষয়ে শাহবাগ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে। যারা এর সাথে জড়িত, তাদের সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে। জিডির বিবরণী: ট্রাইব্যুনাল-১-এ বিচারাধীন আইসিটি মামলা নম্বর ০২/২০১১-চিফ প্রসিকিউটর বনাম সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর রায় প্রচারের জন্য দিন ধার্য ছিলো গত মঙ্গলবার। কিন্তু রায় ঘোষণার পরপরই আসামি সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পরিবারের সদস্যগণ বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় প্রতিক্রিয়া ব্যক্তকালে জানান যে, ওই মামলার রায়ের কপি তারা ইন্টারনেটেরে মাধ্যমে পূর্বেই প্রাপ্ত হয়েছেন। আসামি সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর স্ত্রী ফারহাত কাদের চৌধুরী ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় প্রতিক্রিয়া ব্যক্তকালে আদালত থেকে রায়ের কপি সরবারাহ করার পূর্বেই একটি ডকুমেন্ট ক্যামেরার সামনে প্রদর্শন করে বলেন, এই সেই ইন্টারনেট হতে প্রাপ্ত রায়ের কপি। যা তারা রায় ঘোষেণার পূর্বেই প্রাপ্ত হয়েছেন এবং সেটি নিয়েই তারা আদালতকক্ষে প্রবেশ করেছেন। তিনি আরও বলেন যে, আদালত হতে প্রচারিত রায় এবং ইন্টারনেট হতে প্রাপ্ত রায়ের মধ্যে মিল রয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল হতে প্রচারিত সব রায় ট্রাইব্যুনালেই প্রস্তুত করা হয়। রায় ঘোষণার পূর্বে রায়ের কোনো অংশের কপি অন্য কোনোভাবে প্রকাশের সুযোগ নেই। কিন্তু তার পরও কথিত খসড়া রায়ের অংশ কীভাবে ইন্টারনেটে প্রচারিত হলো বা কীভাবে ট্রাইব্যুনাল হতে খসড়া রায়ের অংশবিশেষ ফাঁস (লিকড) হলো, তা উদ্বেগের বিষয়। বিষয়টি ট্রাইব্যুনালের নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতার প্রতি হুমকিস্বরূপ। উল্লেখ্য যে, www.tribunalleaks.be ওয়েবসাইটে কথিত খসড়া রায়ের অংশ আপলোডেড দেখা যায়। এমতাবস্থায় বিষয়টি তদন্তপূর্বক আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার অনুরোধ করা হলো। কথিত রায় ফাঁস: একাত্তর সালে গণহত্যা ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ করার দায়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সংসদ সদস্য সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরীকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীরের নেতৃত্বে তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল গত মঙ্গলবার এ রায় দেন। চূড়ান্ত আদেশে ট্রাইব্যুনাল বলেন, মানবসভ্যতার সম্মিলিত বিবেককে কাঁপিয়ে দেয়ার মতো ঘৃণ্যতম অপরাধ করেছেন আসামি। এ জন্য তাকে ফাঁসির দড়িতে ঝুলতে হবে। রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, আদালতে তার আচরণ ভালো ব্যবহারের পরিচয় বহন করে না। সাকা চৌধুরীর পরিবার মঙ্গলবার অভিযোগ করেছে, রায়ের আগেই রায়ের কপি ইন্টারনেটে পাওয়া গেছে। সামাজিক প্রচারমাধ্যম ফেসবুক, ব্লগ ও কয়েকটি অনলাইন পত্রিকায় এটি প্রকাশ করা হয়েছে। তবে আইন প্রতিমন্ত্রী কামরুল ইসলাম, অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম ও আইনসচিব আবু সালেহ শেখ মো. জহিরুল হক মঙ্গলবার দাবি করেন, মন্ত্রণালয় থেকে রায় ফাঁস হওয়ার কোনো সুযোগ নেই, ফাঁস হওয়ার প্রশ্নই আসে না। তার পরও মন্ত্রণালয় বিষয়টি অনুসন্ধান করতে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনকে (বিটিআরসি) নির্দেশ দিয়েছে। মঙ্গলবার রায় ঘোষণার আগের রাতে বেশ কয়েকটি ব্লগ ও কয়েকটি অনলাইনের সংবাদে বলা হয়, আইনসচিবের অফিসের একটি কম্পিউটার থেকে তৈরি করা একটি রায় পাওয়া গেছে। সেখানে রায়ের কপিটিও দেয়া হয়েছে। আইনসচিব বলেন, প্রথমত, মামলার রায় হয় সংশ্লিষ্ট আদালত থেকে। মন্ত্রণালয় থেকে রায় লেখা হয় না। কাজেই এখানে রায় আসার কোনো সুযোগ নেই। ইন্টারনেটে যেটা দেখা যাচ্ছে, সেটি বেলজিয়ামভিত্তিক একটি ব্লগ প্রকাশ করেছে।’ অনলাইন সংবাদে বলা হয়েছে, আইন মন্ত্রণালয়ের ষষ্ঠ তলার একটি কম্পিউটারের ডি-ড্রাইভে আলমের ফোল্ডার থেকে রায়ের কপিটি পাওয়া গেছে। আইনসচিব বলেছেন, এ নামে কার্যালয়ে কোনো কম্পিউটার অপারেটর বা কর্মচারী নেই। বেলজিয়ামভিত্তিক ট্রাইব্যুনাল-লিকস নামের ওয়েবসাইটে যে কথিত রায়ের কপি দেয়া হয়েছে, সেটি ১৬৫ পৃষ্ঠার। আর মঙ্গলবার ট্রাইব্যুনালের দেয়া পূর্ণাঙ্গ রায়টি ১৭২ পৃষ্ঠার। দুটো রায় মিলিয়ে দেখা গেছে, ওয়েবসাইটে পাওয়া রায়ে দোষী সাব্যস্তকরণ ও সাজার বিষয়ে কোনো কথা নেই। কিন্তু মূল রায়ে অভিযোগ ধরে ধরে প্রমাণ, দোষী সাব্যস্তকরণ ও সাজার উল্লেখ রয়েছে।  মূল রায়ের প্রথম অংশে রয়েছে বিচারকের নাম, প্রসিকিউটরদের নাম, আসামিপক্ষের আইনজীবীদের নাম, ভূমিকা, কার্যবিবরণী, ঐতিহাসিক পটভূমি, ১৯৭৩ সালের ট্রাইব্যুনাল আইনের নানা বিষয়ের সংজ্ঞা, বিভিন্ন বিদেশি আইনের প্রসঙ্গ, ত্রিপক্ষীয় চুক্তি এবং ১৯৫ জন পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীর ক্ষমা, যে কারণে এ বিচার হতে দেরি ইত্যাদি। ওয়েবসাইটে প্রকাশিত কথিত রায়ে এসব থাকলেও হুবহু মিল নেই, অনুচ্ছেদগুলো এলোমেলো।  সাকা চৌধুরীর বিরুদ্ধে মোট ২৩টি অভিযোগ আনা হয়েছিলো। নয়টি প্রমাণিত হয়েছে। আটটি থেকে তিনি খালাস পেয়েছেন। ছয়টিতে রাষ্ট্রপক্ষ সাক্ষী হাজির করেনি। ফাঁস হওয়া রায়ের সংবাদে নয়টি অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার কথা রয়েছে। মূল রায়ে আদালতে সাকার ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের কথা উঠে এসেছে। ফাঁস হওয়া রায়ে আংশিকভাবে এ বিষয়টি এসেছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here