রাতারাতি পাল্টে গেছে সদর হাসপাতালের চেহারা

হঠাত করেই খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. মামুন পারভেজের চুয়াডাঙ্গায় আগমন

 

স্টাফ রিপোর্টার: স্বাস্থ্য পরিচালকের আগমনের কথা শুনে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার হিড়িক পড়ে যায় গতকাল বুধবার সন্ধ্যায়। তড়িঘড়ি করে চিকিৎসকেরা চিকিৎসায় তৎপর হয়ে ওঠেন।  সেবিকারা যেমন সেবা কাজে তৎপর হন তেমনই ঝাড়ুদাররা ওয়ার্ড পরিষ্কার, সুইপাররা বাথরুম পরিষ্কার, ইলেক্ট্রিশিয়ান এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করে কোথায় বাল্ব নষ্ট, কোন ফ্যান ঘুরছে না তা দেখে প্রতিকারে তোড়জোড় শুরু করেন। হঠাৎ এমন সাজ সাজ রব দেখে রোগীসহ তাদের স্বজনেরা প্রশ্ন ছুড়ে দেয় কী কারণে এতোসব আয়োজন? উত্তর দেয়ার সময় নেই ঝাড়ুদার, সুইপার বা ইলেক্ট্রিশিয়ানদের। এমন এক প্রশ্নের জবাবে হাসপাতালেরই আয়া সাহিদা বেগম কয়েকজনকে বলেন, বাপ আসছে তাই এতোসব আয়োজন।

জানা গেছে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের খুলনা বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. মামুন পারভেজ আকস্মিকভাবে যশোর, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া ও মেহেরপুরে অফিসিয়াল সফর শেষ করে গতকাল সন্ধ্যায় চুয়াডাঙ্গার আগমন করছেন। এ খবর পেয়ে চুয়াডাঙ্গা সিভিল সার্জন ডা. খন্দকার মিজানুর রহমানের নির্দেশে সন্ধ্যা থেকে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে কর্মরত সবাই নিজ নিজ দায়িত্বের প্রতি সজাগ হয়ে ওঠেন। হাসপাতালের স্টাফদের কার্যক্রম দেখে অনেকেই মন্তব্য করে বলেন, প্রতিদিনই যদি পরিচালক চুয়াডাঙ্গায় আসতেন তাহলে হয়তো চুয়াডাঙ্গার স্বাস্থ্যসেবার মান এতো পিছিয়ে থাকতো না। হাসপাতালে চিকিৎসকেরা রোগী না দেখে মেডিকেল রিপ্রেজেনটেটিভদের সাথে খোশগল্পে মেতে থাকতেন না, হাসপাতাল অপরিষ্কার থাকতো না, অন্ধকারাচ্ছন্ন থাকতো না, বাথরুমে যেতে রোগীরা ভয় পেতো না।

অভিযোগ রয়েছে, চুয়াডাঙ্গা সিভিল সার্জন তার পছন্দের মানুষ ছাড়া অন্যের ফোন রিসিভ করেন না। যার ফলে সিভিল সার্জনের সাথে সাংবাদিকসহ অনেকেই স্বাস্থ্য বিষয়ক বিভিন্ন তথ্য আদান-প্রদান করতে পারেন না। বিধান থাকলেও কোনো চিকিৎসকই হাসপাতালে অ্যাপ্রোন পরিধান করেন না। সকাল ৮টা থেকে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত বহির্বিভাগে রোগী দেখার কথা থাকলেও চিকিৎসকেরা হাসপাতালে আসেন সকাল ১০টা থেকে ১১টার মধ্যে। আবার সাড়ে ১২টা থেকে ১টার মধ্যে তারা চেম্বার ত্যাগ করেন। মাঝে মাঝে ডাক্তার না এলেও তার চেম্বার খোলা থাকে, দেখে মনে হয় চিকিৎসক ভেতরে আছেন কিন্তু রোগী নেই। হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের মধ্যে সঠিকভাবে খাবার পরিবেশন হয় না। খাবারের মান এবং পরিমাণ নিয়ে প্রশ্ন আছে মেলা। এছাড়া হাসপাতালের রোগীদের খাবার বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে। খাবার বাইরে নিয়ে যাওয়ার সময় একাধিকবার স্থানীয় যুবকদের হাতে ধরা পড়ে হাতাহাতির ঘটনাও ঘটেছে ইতঃপূর্বে। গর্ভবতীদের ২৪ ঘণ্টা জরুরি অপারেশনের কথা থাকলেও তা হয় না। অপারেশন না করে গর্ভবতীদের ফুঁসলিয়ে দালালচক্রের মাধ্যমে বাইরে নিয়ে গিয়ে বিভিন্ন ক্লিনিকে সিজারিয়ান অপারেশন করানো হয়। এছাড়া গাইনি ওয়ার্ডে সন্তান নরমাল ডেলিভারি হলেও সেবিকা এবং আয়ারা বকশিসের নামে জোরপুর্বক টাকা আদায় করেন। টাকা আদায় নিয়ে ইতঃপূর্বে আয়াদের সাথে রোগীর লোকজনের মধ্যে কয়েকদফা বাগবিতণ্ডা এবং হাতাহাতির ঘটনাও ঘটে। যা দৈনিক মাথাভাঙ্গাসহ কয়েকটি মিডিয়ায় ফলাও করে প্রকাশ করা হয়। সার্জারি ওয়ার্ডে অপারেশনের পর রোগীদের ক্ষতস্থান প্রতিদিন ড্রেসিং বাবদ ১শ থেকে ২শ টাকা আদায় করেন ওয়ার্ডবয়রা। প্রতিটি ওয়ার্ডেই স্থানীয় উচ্ছৃঙ্খল যুবকদের আনাগোনা রয়েছে। বখাটে যুবকদের উত্ত্যক্ততার কারণে সেবিকারা নিরাপত্তার দাবিতে কর্মবিরতিও পালন করেন বেশ কিছুদিন আগে। প্রতিবছরই লাখ লাখ টাকার মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিনষ্ট করা হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন সেবিকা অভিযোগ করেন, চিকিৎসকেরা মেডিকেল রিপ্রেজেনটেটিভদের কাছ থেকে উৎকোচ নিয়ে সরকারি সাপ্লাইকৃত ওষুধ বাদ দিয়ে বিভিন্ন কোম্পানির ওষুধ লেখেন। যার ফলে বাইরে থেকে ওষুধ কিনতে হয় রোগীদের। এ জন্যই প্রতিবছর হাসপাতালের সরকারি ওষুধের মেয়াদ পার হয়ে যায়। পড়ে থাকে স্টোরে। হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) যদি এসব বিষয়ে সুনজর দিতেন তাতে হাসপাতালের অনিয়মগুলো দূর হতো বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। তার দায়িত্বে অবহেলার বিষয়ে একাধিকবার সিভিল সার্জনের কাছে অলিখিত অভিযোগও দেয়া হয়েছে। তবুও নীরব দর্শকের ভূমিকায় কর্তৃপক্ষ। এদিকে অপারেশন থিয়েটারে সকল সরঞ্জাম থাকলেও রোগির লোকজন দিয়ে বাড়তি ওষুধপথ্য বাইরে থেকে কিনিয়ে আনান অপারেশন থিয়েটারে দায়িত্বপ্রাপ্তরা। পরে তা ফার্মেসিতে গোপনে বিক্রি করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। জরুরি বিভাগে কর্তব্যরত চিকিৎসকদের পেছনে সবসময় ৫/৭ জন মেডিকেল রিপ্রেজেনটেটিভ দাঁড়িয়ে থাকেন। দেখে মনে হয় চিকিৎসকদের নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত তারা। রোগী দেখা বাদে তাদের সাথে চিকিৎসকদের খোশগল্পে মেতে থাকতে দেখা যায় মাঝে মাঝেই। এছাড়া জরুরি বিভাগে কর্মরত কর্মচারীদের বিরুদ্ধে রোগীদের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগও রয়েছে। ওষুধসহ সরঞ্জাম কিনে দেয়ার কথা বলে রোগীদের নিকট থেকে অর্থ যেমন হাতিয়ে নেয়া হয়; তেমনই বিষপান করা রোগীদের ওয়াশ করার জন্য মাত্রাতিরিক্ত অর্থ দাবি করা হয়। গতকাল বিকাল ৫টার দিকে আলমডাঙ্গা উপজেলার বড়গাংনী গ্রামের ইলিয়াস আলীর ছেলে নাজমুল দুর্ঘটনায় আহত হয়ে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসেন। এসময় জরুরি বিভাগে থাকা কর্মচারী গাড়াবাড়িয়া গ্রামের চঞ্চল আহতের নিকট চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনার কথা বলে একশ টাকা দাবি করেন। এ নিয়ে বাগবিতণ্ডাও হয়। চঞ্চলের মতোই মাখালডাঙ্গার মিলন, গাইদঘাটের শাহীনসহ সকল কর্মচারীই ডিউটিকালীন রোগীদের নিকট থেকে বিভিন্নভাবে অর্থ হাতিয়ে নেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে হাসপাতাল চত্বরের সুইপারপট্টিতে প্রকাশ্যে মদ বিক্রির অভিযোগ রয়েছে।

খুলনা বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. মামুন পারভেজ গতরাতে মোবাইলফোনে দৈনিক মাথাভাঙ্গাকে জানান, অফিসিয়াল সফরে গত সোমবার তিনি বিভিন্ন হাসপাতাল পরিদর্শনে বের হন। যশোর, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর হাসপাতাল সফর শেষ করে গতকাল রাতে তিনি চুয়াডাঙ্গায় পৌঁছান। চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের এসব অভিযোগ শুনে তিনি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন বলে জানান। আজ সকালে তিনি চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতাল পরিদর্শনে যাবেন। এরপর খুলনার উদ্দেশে রওনা দেবেন।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *