মুজিবনগরে জামায়াত-শিবিরের সাথে পুলিশের সংঘর্ষে জামায়াতকর্মী নিহত : ৬ পুলিশসহ আহত ১৩

মুজিবনগর প্রতিনিধি/মেহেরপুর অফিস: জামায়াত-শিবিরের ডাকা হরতালের দ্বিতীয় দিনে গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে মেহেরপুরের ৪টি স্থানে সড়ক অবরোধ করে জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা। মুজিবনগর উপজেলার গৌরীনগর এলাকায় জামায়াত-শিবিরের সাথে পুলিশের সংঘর্ষে রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। এ সময় পুলিশের গুলিতে জামায়াতকর্মী দেলোয়ার হোসেন (৩৮) নিহত হয়েছেন। মুজিবনগর থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রবিউল হোসেনসহ পুলিশের ৬ জন আহত এবং গুলিবিদ্ধ হয়েছেন জামায়াত-শিবিরের ৮ কর্মী।

একই সময়ে মেহেরপুর-মুজিবনগর সড়কে সদর উপজেলার বন্দর নামক স্থানে পুলিশের সাথে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া বাধে। এ সময় পুলিশ বহনকাজে ব্যবহৃত ব্যক্তি মালিকানা একটি পিকআপ ভ্যানে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয় অবরোধকারীরা।

সংঘর্ষে আহত ওসি রবিউল হোসেন, উপপরিদর্শক (এসআই) আব্দুল মান্নান, কনস্টেবল আব্দুল হালিম, খাইরুল ইসলাম, মাজহারুল ইসলাম ও মিরুল আলমকে মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। আশঙ্কাজনক অবস্থায় উপপরিদর্শক আব্দুল মান্নানকে যশোর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সি.এম.এইচ) প্রেরণ করা হয়। বাকিদের মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। আহতদের মাথায় ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে ধারালো অস্ত্রের আঘাতে গুরুতর ক্ষত হয়েছে বলে জানিয়েছেন মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডাক্তার অলোক কুমার। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে সকাল ১০টা থেকে ৩ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়। কুষ্টিয়া ৩২ বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) উপঅধিনায়ক মেজর তাকের মাহমুদ সরকারের নেতৃত্বে বিজিবি সদস্যরা পুলিশের কাজে সহযোগিতা করছেন বলে জানান মেহেরপুর জেলা প্রশাসক মাহমুদ হোসেন।

মেহেরপুর পুলিশ সুপার একেএম নাহিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, হরতালের শুরুতেরই গৌরিনগর এলাকায় গাছের গুঁড়ি ফেলে যান চলাচল বন্ধ করে দেয়। ওসি রবিউল হোসেনসহ পুলিশ সদস্যরা দায়িরাপুর গ্রাম এলাকা থেকে ফিরে ঘটনাস্থলে পৌছান। অবরোধ তুলতে গেলে জামায়াত-শিরিব নেতাকর্মীরা পুলিশের ওপর হামলা চালায়। তাদের ছত্রভঙ্গ করতে কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোড়া হয়। এক পর্যায়ে চারদিক থেকে ঘিরে ধারালো অস্ত্র দিয়ে তারা পুলিশ সদস্যদের কুপিয়ে গুরুতর জখম করে।

স্থানীয়সূত্রে জানা গেছে, গৌরিনগর এলাকায় ফাঁকা জায়গায় অবরোধ হওয়ায় যানবাহন ও মানুষ চলাচল একেবারেই ছিলো না। পুলিশের একটি গাড়িতে কয়েকজন সহকর্মীর সাথে ওসি রবিউল হোসেন ঘটনাস্থলে যায়। সংঘর্ষের পর পুলিশে সদস্যরা রাস্তায় পড়ে থাকলেও তাদের দেখার কেউ ছিলো না। গুলিবিদ্ধ নেতাকর্মীদের কাঁধে তুলে নিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে অবরোধকারীরা। পরে স্থানীয় একজন সাংবাদিক ঘটনার ছবি তুলতে এসে দেখেন পুলিশ সদস্যরা রক্তাত্ব অবস্থায় মাটিতে পড়ে আছেন। তিনি স্থানীয় লোকজন ডেকে তাদের তোলার চেষ্টা করেন। এ সময় পুলিশের পিকআপ ভ্যান আসে। আহত পুলিশ সদস্যদের তাতে তুলে দিলে মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। তখন মেহরেপুর শহরের উপকণ্ঠে বন্দর এলাকায় অবরোধ থাকায় তাদেরকে ফিরিয়ে মুজিবনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেয়া হয়। পরে পুলিশের ৬/৭টি গাড়ি বহর আহতদের মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে আসে। দশ মিনিটের মধ্যেই সংঘর্ষ শেষ হওয়ার পর উত্তেজনা ছড়ালেও পরিবেশ স্বাভাবিক হয়ে আসে। বর্তমানে সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে জানান মেহেরপুর পুলিশ সুপার।

এদিকে পুলিশের গুলিতে আহত জামায়াত-শিবিরের আক্তারুজ্জামান, রাফিউল ইসলাম, সুমন আলী, সুলতান আহম্মেদ, হাসিবুল, নোমান, ও মোজাম্মেল হোসেনকে বিভিন্ন স্থানে চিকিৎসা দেয়া হয়। আহতদের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন জামায়াত নেতৃবৃন্দ। জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারী তারিক মহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, দু দিনের হরতালে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করা হলেও পুলিশ বাধা দিয়েছে। গুরতর আহত হাসিবুল ইসলাম ও দেলোয়ার হোসেনকে কুষ্টিয়ার একটি হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। কুষ্টিয়া শহরে পৌছানোর আগ মুহূর্তে বেলা পৌনে ১১টার দিকে মারা যায় দেলোয়ার হোসেন। সে দারিয়াপুর গ্রামের সামসুদ্দোহার ছেলে এবং ওয়ার্ড জামায়াতের সভাপতি। বিকেল ৫টার দিকে জানাজা শেষে গ্রাম্য কবর স্থানে তার দাফন সম্পন্ন হয়েছে। পরিবারের আপত্তির কারণে লাশের ময়নাতদন্ত করতে পারেনি পুলিশ। নিহতের স্বজন, গ্রামবাসীছাড়াও নেতৃবৃন্দ জানাজায় অংশগ্রহণ করেন।

এদিকে গতকাল বিকেলে পুলিশের খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি মনিরুজ্জামান ও এডিশনাল ডিআইজি খন্দকার রফিকুল ইসলাম মেহেরপুরে যান। হাসপাতালে গিয়ে আহত পুলিশ সদস্যদের চিকিৎসার খোঁজ খবর নেন পুলিশের এ উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। পরে গৌরিনগরে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।

জামায়াতের হরতাল ও গতকালের সংঘর্ষের ঘটনায় জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীদের গ্রেফতারে পুলিশের ব্যাপক অভিযান চলে। বুধবার রাত থেকে গতকাল বিকেল পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে ৭ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এরা হলেন, নাজিরাকোন গ্রামের আব্দুল হান্নান (৪৫), পুরন্দরপুরের ফিরাতুল ইসলাম (৩০), রাজাপুরের আবুল কাশেম (৪২) ও হাবিবুর রহমান (৪২), বুড়িপোতা গ্রামের আব্দুস সামাদ (৩২), রাধাকান্তপুরের মুজিবুর রহমান (৪২) এবং মাসুদ রানা (৩৫)। এদেরকে বিভিন্ন মামলায় গ্রেফতার করা হয়েছে এবং আজ আদালতে সোপর্দ করা হবে বলে জানিয়েছেন সদর থানার ওসি।

এদিকে সংঘর্ষের ঘটনার পর থেকেই গোটা এলাকায় বিরাজ করছে আতঙ্ক। জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীদের পরিবারের পুরুষ সদস্যরা সম্ভাব্য গ্রেফতারের ভয়ে আত্মগোপন করেছেন। থমথমে পরিবেশ বিরাজ করছে। কর্মী নিহতের ঘটনায় নেতাকর্মীদের মাঝে ক্ষোভ বিরাজ করছে। জেলা আমিরসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের গ্রেফতার ও কর্মী নিহতের প্রতিবাদে জামায়াতের পক্ষ থেকে বিভিন্ন কর্মসূচি ঘোষনা করা হতে পারে বলে জানা গেছে। গতকালের সংঘর্ষের ঘটনায পুলিশের পক্ষ থেকে মুজিবনগর থানায় মামলার প্রস্তুতি চলছে।

নিহতের পারিবারিক পরিচয়: দায়িরাপুর গ্রামের সামুসুদ্দোহার ৪ ছেলে ও ১ মেয়ের মধ্যে নিহত দেলোয়ার হোসেন বড়। তিন ভাই সৌদি প্রবাসী। বছর খানেক আগে সৌদি থেকে বাড়ি ফেরেন তিনি। নতুন বাড়ি নির্মাণ শেষে তার বিয়ে করার কথা ছিলো বলে পারিবারিকসূত্রে জানা গেছে। পেশাগত জীবনে তিনি একজন চাষি। রাজনৈতিকভাবে জামায়াতের সক্রিয় রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। ওয়ার্ড জামায়াতের নেতা হলেও দল ও এলাকায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছিলেন তিনি। তার মৃত্যুতে পরিবারে শোকের ছায়া বিরাজ করছে।

 

pic-2

Leave a comment

Your email address will not be published.