মুজিবনগরের শিমনপুরের অস্তিত্ব এখন লোকমুখে

চুরি-ডাকাতি আর মহিলাদের সম্ভ্রমহানি হতে নিষ্কৃতি পেতে গ্রাম ছাড়া!

 

মহাসিন আলী/শেখ শফি: মেহেরপুরের মুজিবনগর উপজেলার বাগোয়ান ইউনিয়ন থেকে একটি গ্রাম হারিয়ে গেছে। এক সময় ওই গ্রামে প্রায় এক হাজার লোকের বসবাস থাকলেও বর্তমানে সেখানে কোনো লোক বসবাস করেন না। চুরি-ডাকাতি আর মহিলাদের সম্ভ্রমহানি হতে নিষ্কৃতি পেতে তারা সেখান থেকে উঠে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছেন। গ্রামটি এখন মানুষ শূন্য। সেখানে এখন শুধু ফসলের আবাদ হচ্ছে। গ্রামটির নাম শিমনপুর। যেখানে বাসিন্দাদের সবাই ছিলেন সংখ্যালঘু খ্রিস্টান ও হিন্দু সম্প্রদায়।

মেহেরপুর জেলা শহর থেকে ২০ কি. মি. দক্ষিণে বাগোয়ান-আনন্দবাস সড়কের পশ্চিম পাশে ভারত সীমান্তবর্তী গ্রাম ছিলো শিমনপুর। গ্রামের প্রায় সবগুলো পরিবার ছিলো খ্রিস্টান। কোনো মুসলমান পরিবার সেখানে ছিলো না। গ্রামবাসীর আয়ের উৎস ছিলো কৃষি কাজ। ওই গ্রামের মানুষ বেগুন চাষ বেশি করতেন। শিমনপুরের বেগুন তখনকার দিনে এলাকায় চাহিদা মিটিয়ে পার্শ্ববর্তী কুষ্টিয়া-চুয়াডাঙ্গাসহ বিভিন্ন জেলায় রফতানি হতো। দেশ স্বাধীনের পরপরই স্থানীয় ডাকাতসহ ভারতীয় ডাকাতরা ঘনঘন ওই গ্রামে ডাকাত করতো। শুধু ডাকাতিই নয়; ডাকাতদল খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মেয়ে ও বউদের শ্লীলতাহানি করতো। অব্যাহত ডাকাতি ও মা-বোনদের সম্ভ্রমহানির কারণে আশির দশকের শেষের দিকে ওই গ্রামের মানুষ গ্রাম ছেড়ে আশে-পাশের বিভিন্ন গ্রামে আশ্রয় নেন।

সরেজমিনে শিমনপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে কোনো লোকজনের বসবাস নেই। উঁচু জায়গায় রয়েছে কয়েকটি তালগাছ। মেহেরপুর থেকে আনন্দবাস পর্যন্ত রাস্তা পাকা হয়েছে। শিমনপুরের রাস্তাটি কেবল কাঁচা রয়ে গেছে। ওই গ্রামের পথ ধরে লাঙল কাঁধে কৃষক সামছুল হক মাঠ থেকে ফিরছিলেন। তার সাথে কথা হয়। তিনি জানান, ওইখানে শিমনপুর গ্রাম ছিলো। গ্রামের লোকগুলোর প্রায় সবাই খ্রিস্টান ছিলো। তারা বড় ভালো লোক ছিলো। কিন্তু দুর্ভাগ্য তাদের। ঘনঘন ডাকাতি আর মা-বোনের সম্ভ্রানহানি সহ্য করতে না পেয়ে তাদের সকলেই জায়গা জমি বিক্রি করে গ্রাম ছেড়ে অন্য গ্রামে বাস করছে।

ওই গ্রামে বাস করতেন খোকন সরকার ও তার পরিবার। বর্তমানে তারা বাস করেন মুজিবনগর কমপ্লেক্সের প্রধান গেটের কাছাকাছি ভবরপাড়া গ্রামে। খোকন সরকার মারা যান ২০০১ সালে। তার স্ত্রী ছায়া রাণী (৬৫)। তিনি জানানেল, ৫/৬ পুরুষ ধরে শিমুনপুর গ্রামে আমার স্বামী ও তাদের পূর্ব পুরুষরা বসবাস করতেন। গ্রামে প্রায় ৫০টি খ্রিস্টান পরিবার বাস করতেন। ওই গ্রামে ছিলো না কোনো মুসলমান পরিবার। তবে মাত্র ২টি হিন্দু পরিবার তাদের সাথে মিলে-মিশে থাকতেন। চাষাবাদ ছিলো তাদের আয়ের প্রধান উৎস। দেশ স্বাধীনের পরে ওই গ্রামে চোর-ডাকাতের অত্যাচার বেড়ে যায়। স্থানীয় বাগোয়ান গ্রামের চিহ্নিত কিছু ডাকাত ও ভারতীয় ডাকাতরা তাদের গ্রামের ডাকাতি করতো। ডাকাতি করেই তারা ক্ষ্যান্ত ছিলো না। তারা যুবতী মেয়ে ও বউদের তুলে নিয়ে যেতো। ২/৩ ঘণ্টা পরে তাদের সর্বস্ব লুটে নিয়ে ফেরত পাঠাতো। তিনি ঘৃণাভরে বললেন, এমনও ঘটেছে গ্রামের ৮/১০জন বৌ-ঝি দল বেধে বোগোয়ান গ্রামের কোনা পুকুর থেকে গোসল সেরে ফিরছেন। এমন সময় পথে ২/৩ জন অসৎ প্রকৃতির যুবক তাদের মধ্যে থেকে একজন যুবতী মেয়ে কিংবা একজন অল্পবয়সী বউকে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে তুলে নিয়ে গেছে। কয়েক ঘণ্টা পরে হতভাগা মেয়ে কিংবা বউটি তার সর্বস্ব হারিয়ে ফিরে এসেছে। এছাড়া জোর করে তাদের ক্ষেতের ফসল কেটে নিয়ে যেত দুষ্কৃতকারীরা। তারা খুলে নিয়ে গেছে গোয়ালের গরু। সব মিলিয়ে অত্যাচার নির্যাতন সইতে না পেরে ১৯৭৯ সালের দিকে মাত্র ২/৩ দিনের মধ্যে ঘর-বাড়ি ভেঙে নিয়ে যে যার মতো শিমনপুর গ্রাম ত্যাগ করেন। তাৎক্ষণিকভাবে শিমনপুর গ্রামের লোকজন ভবরপাড়া, বাগোয়ান, বল্লভপুর, নাজিরাকোন ও আনন্দবাস গ্রামসহ বিভিন্ন গ্রামে আশ্রয় নেন। অনেক কষ্ট করে বসতের জায়গা কিনে বর্তমানে ওই সব গ্রামে তারা স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। শিমনপুর গ্রামে ২টি গির্জাঘর ছিলো। একটি চার্চ অব বাংলাদেশ ও অন্যটি রোমান ক্যাথলিক। গির্জাঘরের জমি লিজ দেয়া আছে।

বাগোয়ান গ্রামের বাসিন্দা স্থানীয় রাজনীতিবিদ গোলাম মহি হিরু বলেন, বাগোয়ান গ্রামবাসীর সাথে শিমনপুর গ্রামবাসীর কোনো বিরোধ ছিলো না। দু গ্রামের মানুষ এখনও কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একই মাঠে আবাদ করেন।

বাগোয়ান ইউনিয়নের তহশিলদার মো. আব্দুর রহিম জানান, আমি নতুন মানুষ। তাই শিমনপুর গ্রাম সম্বন্ধে আমার কোনো ধারণা নেই। একই কথা জানান, মুজিবনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অরুন কুমার মণ্ডল।

১৯৭৩ থেকে ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত বাগোয়ান ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ছিলেন মেহেরপুর-১ আসনের সাবেক এমপি জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আলহাজ মো. জয়নাল আবেদীন। তিনি জানান, ওই সময় শিমনপুর গ্রামে ৪০ থেকে ৫০ ঘর লোকের বসবাস ছিলো। তখন মুজিবনগর উপজেলা হয়নি। জেলা শহরের সাথে শিমনপুরসহ ওই এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো ছিলো না। শিমনপুর ভারত সীমান্তবর্তী গ্রাম। সীমান্তে কাঁটা তারের বেড়া ছিলো না তখন। তাই শুধু শিমনপুর নয়। স্থানীয় ও ভারতীয় চোর-ডাকাতরা এলাকার বিভিন্ন গ্রামে চুরি-ডাকাতি করতো।

বাগোয়ান ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান জেলা আওয়ামী লীগের বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক আইয়ূব হোসেন জানান, এখন এলাকার পরিবেশ ভালো। মুজিবনগর উপজেলা হয়েছে। জেলা শহরের সাথেও যোগাযোগ ভালো। মুজিবনগর থানা থেকে শিমনপুর গ্রামের দূরত্ব মাত্র এক কিলোমিটার। এছাড়া মুজিবনগর কমপ্লেক্স পাহারায় আনসার সদস্য রয়েছে। আশে-পাশে পুলিশ ক্যাম্প হয়েছে। সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া হয়েছে। এখন এলাকায় সমস্যা নেই। শিমনপুর গ্রামের লোকজনকে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেয়া হবে। তারা গ্রামে ফিরে আসতে চাইলে তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা যাবে।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *