বুদ্ধিজীবী হত্যাকারী মুঈন ও আশরাফের ফাঁসির আদেশ

স্টাফ রিপোর্টার: একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধকালে ঘর থেকে তুলে নিয়ে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানখ্যাত ১৮ জন বুদ্ধিজীবীকে হত্যার দায়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় পলাতক আলবদর নেতা মুঈনুদ্দীন ও আশরাফুজ্জামান খানের ফাঁসির আদেশ হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে আনা ১১টি অভিযোগই সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। প্রতিটি অভিযোগের জন্য তাদের দুজনের বিরুদ্ধে গতকাল রোববার ফাঁসির আদেশ দেন বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বে তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২।

এর আগে গতকাল রোববার বেলা ১১টার দিকে তিন বিচারক এজলাসে বসেন। রায় পড়া শুরুর সময় ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান বলেন, এটি ট্রাইব্যুনালের ষষ্ঠ রায়। মূল রায় ১৫৪ পৃষ্ঠার। তবে ট্রাইব্যুনাল পড়বে সংক্ষিপ্ত ৪০ পৃষ্ঠার রায়। তিনি আরও বলেন, যেহেতু আসামিপক্ষ পলাতক; তাই রাষ্ট্রপক্ষ শুধু রায়ের সার্টিফাইড কপিটি পাবে। আসামিপক্ষ আত্মপক্ষ সমর্থন না করা পর্যন্ত তাদের সার্টিফাইড কপি দেয়া হবে না।

রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে ট্রাইব্যুনাল এলাকায় নেয়া হয় কড়া নিরাপত্তাব্যবস্থা। চলতি বছরের ২৮ এপ্রিল রাষ্ট্রপক্ষ মুঈনুদ্দীন ও আশরাফের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে। পলাতক এ দুজনকে হাজির হওয়ার নির্দেশ দিয়ে ট্রাইব্যুনাল দুটি পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেন। এরপরও তারা হাজির না হওয়ায় তাদের পলাতক ঘোষণা করে বিচারিক কার্যক্রম শুরু করেন ট্রাইব্যুনাল। তাঁদের পক্ষে সুপ্রিমকোর্টের দুজন আইনজীবীকেও নিয়োগ দেয়া হয়। ২৫ জুন মুঈনুদ্দীন ও আশরাফের বিরুদ্ধে ১১টি অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরু করেন ট্রাইব্যুনাল। রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষ্য গ্রহণ ১৫ জুলাই শুরু হয়ে শেষ হয় ২২ সেপ্টেম্বর। আসামিপক্ষে কোনো সাক্ষী না থাকায় ২৩ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তি উপস্থাপন শুরু হয়।

মামলাটির কার্যক্রম শেষে গত ৩০ সেপ্টেম্বর রায়ের জন্য অপেক্ষাধীন (সিএভি) রাখেন ট্রাইব্যুনাল। এ মামলায় মুঈনুদ্দীন ও আশরাফুজ্জামানের বিরুদ্ধে ১৮ জন বুদ্ধিজীবীকে অপহরণের পর হত্যার অভিযোগ আনা হয়।

রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষ্য ও দাখিলকৃত নথি অনুসারে মুক্তিযুদ্ধকালে মুঈনুদ্দীন ছিলেন আলবদর বাহিনীর অপারেশন ইনচার্জ এবং আশরাফুজ্জামান ছিলেন চিফ এক্সিকিউটর। তাঁদের সার্বিক তত্ত্বাবধানে বুদ্ধিজীবীদের ধরে নিয়ে নির্যাতনের পরে হত্যা করা হয়। মুঈন বর্তমানে যুক্তরাজ্যে ও আশরাফ যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে বসবাস করছেন।

১১ অভিযোগ: মুঈন ও আশরাফের বিরুদ্ধে প্রথম থেকে পঞ্চম অভিযোগে রয়েছে, একাত্তরের ১০ ডিসেম্বর দিবাগত রাতে দৈনিক ইত্তেফাক-এর কার্যনির্বাহী সম্পাদক সিরাজুদ্দীন হোসেন, ১১ ডিসেম্বর ভোরে পাকিস্তান প্রেস ইন্টারন্যাশনালের (পিপিআই) প্রধান প্রতিবেদক সৈয়দ নাজমুল হক, দৈনিক পূর্বদেশ-এর প্রধান প্রতিবেদক এএনএম গোলাম মোস্তফা, ১২ ডিসেম্বর দুপুরে বিবিসির সাংবাদিক নিজাম উদ্দিন আহমেদ এবং ১৩ ডিসেম্বর শিলালিপির সম্পাদক সেলিনা পারভীনকে অপহরণ করা হয়। মুঈন ও আশরাফের নির্দেশে এবং তাদের অংশগ্রহণে আলবদরের সদস্যরা ওই বুদ্ধিজীবীদের অপহরণের পর হত্যা করে। তাদের মধ্যে সেলিনা পারভীন ছাড়া আর কারও লাশ পাওয়া যায়নি।

ষষ্ঠ অভিযোগ অনুসারে, একাত্তরের ১৪ ডিসেম্বর সকাল আটটা থেকে পৌনে ১০টার মধ্যে মুঈনুদ্দীন ও আশরাফুজ্জামানের নেতৃত্বে পাঁচ-ছয়জন আলবদর সদস্য অধ্যাপক গিয়াস উদ্দিন আহমেদ, অধ্যাপক সিরাজুল হক খান, আবুল খায়ের, ফয়জুল মহিউদ্দিন, অধ্যাপক রাশিদুল হাসান, অধ্যাপক আনোয়ার পাশা, অধ্যাপক সন্তোষ ভট্টাচার্য ও চিকিত্সক মো. মর্তুজাকে তাঁদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসভবন থেকে অপহরণ করে। ১৬ ডিসেম্বরের পর মিরপুর বধ্যভূমিতে তাদের ছয়জনের লাশ পাওয়া যায়। সিরাজুল হক খান ও ফয়জুল মহিউদ্দিনের লাশ পাওয়া যায়নি।

সপ্তম থেকে একাদশ অভিযোগে রয়েছে, একাত্তরের ১৪ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী ও দৈনিক সংবাদ-এর যুগ্ম সম্পাদক শহীদুল্লা কায়সারকে অপহরণ করা হয়। তাদের কারও লাশ পাওয়া যায়নি। এছাড়া ১৫ ডিসেম্বর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ক্লিনিক্যাল মেডিসিন ও কার্ডিওলজির অধ্যাপক মো. ফজলে রাব্বী এবং চক্ষুবিশেষজ্ঞ ডা. আলীম চৌধুরীকে অপহরণ করা হয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে তাদের লাশ পাওয়া যায়।

এ মামলার সাক্ষী যারা: এ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী হিসেবে যারা সাক্ষ্য দেন, তাদের মধ্যে আছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, রায়েরবাজার বধ্যভূমি থেকে একমাত্র জীবিত ফিরে আসা নির্যাতন-হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষদর্শী দেলোয়ার হোসেন, শহীদুল্লা কায়সারের স্ত্রী পান্না কায়সার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীর ভাতিজা ইফতেখার হায়দার চৌধুরী, মুনীর চৌধুরীর ছোট ছেলে আসিফ মুনীর, ফজলে রাব্বীর মেয়ে নুসরাত রাব্বী, আলীম চৌধুরীর মেয়ে ফারজানা চৌধুরী, গিয়াস উদ্দিনের বোন ফরিদা বানু, ভাগনি মাসুদা বানু, সিরাজুল হক খানের ছেলে এনামুল হক, আবুল খায়েরের ছোট ছেলে রাশিদুল ইসলাম, মো. মর্তুজার স্ত্রীর বড় ভাই ওমর হায়াত, সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেনের ছেলে তৌহিদ রেজা নূর, সৈয়দ নাজমুল হকের ছেলে সৈয়দ মর্তুজা নাজমুল ও ভাই গোলাম রহমান, আ ন ম গোলাম মোস্তফার ছেলে অনির্বাণ মোস্তফা, সেলিনা পারভীনের ছেলে সুমন জাহিদ।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *