বিরোধীদলের সংসদ অধিবেশনে যোগদান : নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা পয়েন্ট অব অর্ডারে উত্থাপন

0
35

স্টাফ রিপোর্টার: বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮ দল গতকাল বুধবার জাতীয় সংসদ অধিবেশনে যোগদান করে বিএনপি চেয়ারপারসন সংসদে বিরোধী দলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রস্তাবিত নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা উত্থাপন করেন। পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার এ প্রস্তাব উত্থাপনের পর প্রথমে আওয়ামী লীগের তোফায়েল আহমেদ বক্তব্য রাখেন।

তোফায়েল আহমেদের বক্তব্যের পর জমিরউদ্দিন সরকার খুব সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন। এরপর বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এম.কে আনোয়ার দীর্ঘ বক্তব্য রাখেন। আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম বক্তব্য রাখতে শুরু করলে প্রতিবাদে বিরোধীদলীয় সদস্যরা একযোগে ওয়াক আউট করেন।

বাজেট অধিবেশনের পর গতকাল বুধবার মাগরিবের নামাজের বিরতির পর বিরোধী দল অধিবেশনে যোগদান করে। সন্ধ্যা ৭টায় মন্ত্রীদের জন্য নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর পর্ব শেষ হলে এক মিনিট পর ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার স্পিকারের নিকট থেকে পয়েন্ট অব অর্ডারে ফ্লোর নিয়ে বক্তব্য রাখেন। তিনি বলেন, আমি বিরোধীদলীয় নেতার প্রস্তাবিত নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা সংক্ষিপ্ত আকারে পাঠ করে চিঠিটি প্রধানমন্ত্রী ও আপনার কাছে (স্পিকার) পৌঁছে দেবো।

জমির উদ্দিন সরকার বিরোধীদলীয় নেতা ও বিরোধীদলের সংসদ সদস্য এবং নিজের পক্ষ থেকে স্পিকারসহ সকল সংসদ সদস্যদের ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আগামী সংসদ নির্বাচন করতে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার দরকার। এ ব্যবস্থা যতো দ্রুততার সাথে হবে দেশের জন্য ততোই মঙ্গল। ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হয়েছিলো। এতে একবার বিএনপি এবং একবার আওয়ামী লীগ জয়লাভ করে।

তিনি বলেন, ওই দুটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ২০ জন উপদেষ্টাদের মধ্য থেকে পাঁচ জন করে ১০ জন উপদেষ্টা নিয়ে নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করা হবে। একজন সম্মানিত নাগরিক এ সরকারের প্রধান হবেন। আমি আমার নেত্রীর পক্ষ থেকে এ নিয়ে দ্রুত সরকারের তরফ থেকে আলোচনা শুরু জন্য আহ্বান জানাচ্ছি। জমিরউদ্দিন সরকার বলেন, এরআগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার ভাষণে নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে যে প্রস্তাব দিয়েছেন তাতে তিনি বিষয়গুলো স্পষ্ট করেননি। তাই আমাদের নেত্রীর দেয়া বক্তব্য অনুযায়ী সংসদে যেভাবে নারী সংসদ সদস্য ও স্পিকার নির্বাচিত হয় সেভাবে উপদেষ্টাদের নির্বাচিত করে আনতে পারেন। এজন্য সংবিধান সংশোধন করা যেতে পারে।

জবাব দিতে গিয়ে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য তোফায়েল আহমেদ ১৯৯৬ সালের নির্বাচনের পর বিরোধী দলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়ার উদ্ধৃতি তুলে ধরেন। তিনি ওই সময় দৈনিক দিনকাল ও দৈনিক জনকণ্ঠ পত্রিকার রিপোর্ট তুলে ধরে বলেন, ওই নির্বাচনে বিএনপি পরাজয়ের পর সংবাদ সম্মেলন করেছেন। সম্মেলনে খালেদা জিয়া নির্বাচনে পুকুর চুরি হয়েছে, ব্যালট বাক্স ছিনতাই করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছিলেন। তিনি ওই তত্ত্বাবধায়ক সরকারও মেনে নিতে পারেননি। ওই তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে দলীয় সরকার হিসাবে আখ্যায়িত করেছিলেন। তাহলে ওই সরকারের ভেতর থেকে ৫ জন উপদেষ্টা কীভাবে বের করা হবে?

তোফায়েল আহমেদ বলেন, দু মেয়াদে ২০ জন উপদেষ্টা ছিলেন না। ছিলেন ১৮ জন। এছাড়া এর মধ্যে দুজন উপদেষ্টা না হবার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। কেউ মৃত্যুবরণ করেছেন। আমরা ১০ জন লোক কোথায় খুঁজে পাবো। বিএনপি সতর্কতার সাথে প্রস্তাবটি উত্থাপন করলে ভালো হতো বলে তিনি মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, পৃথিবীর সব দেশে ক্ষমতাসীন দল অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্ব পালন করে। এ ক্ষেত্রে তিনি অস্ট্রেলিয়া ও ভারতের নির্বাচনকালীন সরকারের চিত্র তুলে ধরেন। ২০০১ সালে নির্বাচনের পূর্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধানের সাথে ২০ মিনিট একান্তে বৈঠক শেষে খালেদা জিয়া বলেছিলেন, আমরা টু থার্ড মেজরিটি নিয়ে জিতবো। খালেদা জিয়া কীভাবে বুঝলেন তার দল বিজয়ী হবে। ফলাফল তাই হয়েছিলো। আমরা ওই দুই সময়ের উপদেষ্টাদের নিয়ে কীভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করবো?

বিএনপির প্রস্তাব প্রসঙ্গে তোফায়েল আহমেদ আরো বলেন, বিএনপি সব মানতে রাজি আছে শুধু প্রধানমন্ত্রীকে (শেখ হাসিনা) মানতে রাজি নয়। এই উক্তির সময় বিএনপি সংসদ সদস্যরা টেবিল চাপড়ে সমর্থন জানান। তোফায়েল আহমেদের বক্তব্যের সময় প্রধানমন্ত্রী সংসদে প্রবেশ করেন। তোফায়েল আহমেদের বক্তব্যের পর ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার দাঁড়িয়ে বলেন, আমরা প্রস্তাব রেখেছি প্রধানমন্ত্রীর কাছে। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীই আলোচনা করবেন। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনের পর বিএনপি নেতার সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সেগুলো পাস্ট এ্যান্ড ক্লোসড বিষয়। ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের বক্তব্যের পর মাইক দেয়া হয় বিএনপির সংসদ সদস্য এমকে আনোয়ারকে। তিনি বলেন, দেশে সাংবিধানিক সঙ্কট চলছে। এ সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে সংবিধান সংশোধনের কোন পরিকল্পনা ছিলো না।

তিনি বলেন, সংবিধান সংশোধনের জন্য গঠিত কমিটির সদস্যদের প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বহাল থাকবে। তবে এর মেয়াদ নির্দিষ্ট করে দেয়ার বিষয় তিনি ওই কমিটির কাছে মত দিয়েছিলেন। এম কে আনোয়ার বলেন, সংবিধান সংশোধনের ফলেই দেশে সঙ্কট তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, দেশের মানুষের মতামত প্রধানমন্ত্রীর অজানা নয়। ইটালি, পাকিস্তানসহ কয়েকটি দেশের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ওই সব দেশে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এম কে আনোয়ার বলেন, দেশের এ সঙ্কট নিয়ে সংসদের বাইরে আলোচনা করে সংসদে এসে সিদ্ধান্ত নিতে পারি। তার বক্তব্যের সময় আওয়ামী লীগের সিনিয়র কয়েকজন মন্ত্রীর অঙ্গভঙ্গির সমালোচনা করে তিনি বলেন, সিনিয়র মন্ত্রীদের এভাবে অঙ্গভঙ্গি করা ঠিক নয়। আমি কখনো তা করি না। এর পরে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম বলেন, আওয়ামী লীগ সংবিধান সংশোধন করেনি। সংশোধন করতে বাধ্য হয়েছে। কারণ আদালত সংবিধানের ৫ম সংশোধনী বাতিল করে দেয়ার পর আদালতের রায় বাস্তবায়নের জন্য সংবিধানের সংশোধনের বিকল্প ছিলো না। তিনি বলেন, জিয়াউর রহমান অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল, সামরিক ফরমান জারি জায়েজ করার জন্য ৫ম সংশোধনী হয়েছিলো। আদালত সেই সংশোধনী বাতিল করে।

তার এ বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানান বিএনপির সংসদ সদস্যরা। তারা স্পিকারের কাছে বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে ওয়াকআউট করেন। এ সময় ফজলুল করিম সেলিম বলেন, আপনাদের জন্ম ক্যান্টনমেন্টে, আপনাদের আমাদের ভাষা ভালো লাগবে না। এ বিষয়ে দফতরবিহীন মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বক্তব্য রাখেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here