ফিরে দেখা: জাতীয় সংসদ নির্বাচনী এলকা-৭৪ মেহেরপুর-২ এ আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী জিল্লুর রহমান মাত্র ১৭ হাজার ৯৬৫ ভোট পেয়ে প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন

মাজেদুল হক মানিক/তাছির আহমেদ: জাতীয় সংসদ নির্বাচনী এলাকা-৭৪ মেহেরপুর-২ গঠিত হয়েছে গাংনী উপজেলার ৯টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভার সমন্বয়ে। আসন্ন দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ নির্বাচনী এলাকায় মোট ভোটার সংখ্যা ২ লাখ ৮ হাজার ২৩৬। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ২ হাজার ১১৫, আর মহিলা ভোটার ১ লাখ ৬ হাজার ১২১ জন। ভোট প্রদানের জন্য মোট ৮০টি ভোটকেন্দ্রে ৪৩৪টি বুথ স্থাপন করা হবে।

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সংসদীয় এ আসনে ৩ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। প্রতীক বরাদ্দ হয়েছে নৌকা, ফুটবল ও বাইসাইকেল। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থীর প্রতীক নৌকা। নৌকা প্রতীক নিয়ে লড়ছেন গাংনী বাজারপাড়ার মৃত মুজাহার আলীর ছেলে এমএ খালেক। তিনি গাংনী শহরের স্থায়ী বাসিন্দা। আওয়ামী লীগ গাংনী উপজেলা সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তিনি দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করে আসছেন। স্বতন্ত্রপ্রার্থী মকবুল হোসেন প্রতীক বরাদ্দ পেয়েছেন ফুটবল। তিনি গাংনী উপজেলার মিনাপাড়া গ্রামের মো. আবুল হোসেনের ছেলে। তবে দীর্ঘদিন তিনি গাংনী উত্তরপাড়ায় ভাড়া বাড়িতে বসবাস করছেন। বাইসাইকেল প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন জেপি (মঞ্জু) মনোনীত প্রার্থী গাংনী বিশ্বাসপাড়ার মৃত আব্দুর রাজ্জাকের ছেলে আব্দুল হালিম।

গুটিগুটি পায়ে নির্বাচনের তারিখ ভোটারদের দোড়গোড়ায় তবুও তেমন কোনো নির্বাচনী উত্তাপ নেই এ এলাকায়। তবে দু জন প্রার্থী থাকায় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের মাঝে নির্বাচনী আমেজ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। গত নির্বাচনে, ভোটারদের মাঝে যে ব্যাপক সরগরম দেখা গেছে এবারের নির্বাচনে তেমনটি নেই। অধিকাংশ ভোটারের মাঝে গত নির্বাচনের মতো আনন্দ উল্লাসও নেই। সাধারণ ভোটারদেরকে নিয়ে রশি টানাটানির খেলাও সমর্থকদের মধ্যে খুব একটা দেখা যাচ্ছে না। তবে আ.লীগের সক্রিয় কর্মীদের কাছে টানার জোর চেষ্টা করে যাচ্ছেন দু প্রার্থী ও তাদের কর্মীরা। ভোট গ্রহণের দিন আসতে বাকি আছে আর মাত্র ৭ দিন। আগামী ৫ জানুয়ারি রোববার সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে চলবে ভোটগ্রহণ। তিনজন প্রার্থী থাকলেও মুলত প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে নৌকা ও ফুটবলের মধ্যে। তবে মুল প্রতিদ্বন্দ্বী দু প্রার্থী ও তাদের কর্মীরা নিজ নিজ প্রার্থী বিপুল ভোটে জয়ী হবেন বলে আশাবাদী।

নির্বাচন অফিসসুত্রে জানা গেছে, এ নির্বাচনী এলাকায় ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোট ১ লাখ ৮৪ হাজার ১০২ জন ভোটারের মধ্যে ভোট প্রদান করেন ১ লাখ ৭৩ হাজার ৫৭৭ জন ভোটার। বিএনপির প্রার্থী আমজাদ হোসেন প্রায় আড়াই হাজার ভোটের ব্যবধানে জয়লাভ করেন। আমজাদ হোসেনের প্রাপ্ত ভোট ছিলো ৮৬ হাজার ৭৬৮। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আ.লীগ প্রার্থী মকবুল হোসেন পেয়েছিলেন ৮৪ হাজার ২৭৯ ভোট। আর বিকল্পধারার প্রার্থী আমির উদ্দিন পেয়েছিলেন ৩৪৫ ভোট। বাতিল হয় ১ হাজার ৫২৬ এবং না ভোট পড়েছিলো ৬৫৯। তবে এবারের নির্বাচনে না ভোটের সুযোগ নেই।

অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২০০১ সালের ১ অক্টোবর। এ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী আব্দুল গনি বিশাল ভোটের ব্যবধানে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আ.লীগ প্রার্থী মকবুল হোসেনকে পরাজিত করেন। সর্বমোট ১ লাখ ৭৭ হাজার ৫৪৯ ভোটারের মধ্যে ভোট প্রদান করেন ১ লাখ ৫৬ হাজার ৩৯৬ জন, আর বাতিল হয় ৯২৬টি। বিজয়ী আব্দুল গনির প্রাপ্ত ভোট ছিলো ৮৬ হাজার ৭৫০। পরাজিত মকবুল হোসেনের প্রাপ্তভোট ছিলো ৬৩ হাজার ৩৩২। জাতীয় পার্টির (জাপা) মহসীন আলী ৩ হাজার ১২২, আর জাপা (মঞ্জু) আব্দুল হালিম পেয়েছিলেন ২০২ ভোট।

১৯৯৬ সালের ১২ জুন অনুষ্ঠিত হয় সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এ নির্বাচনে ৬ প্রার্থীর মধ্যে স্বতন্ত্রপ্রার্থী হিসেবে মকবুল হোসেন ৪৫ হাজার ৮২০ ভোট পেয়ে জয়লাভ করেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি প্রার্থী আব্দুল গনির প্রাপ্তভোট ছিলো ৩৩ হাজার ৮৬১। জামায়াতের প্রার্থী আব্দুল কাদের ২২ হাজার ৫৯০ ভোটে তৃতীয় হন। এছাড়াও ফ্রিডম পার্টির বজলুল হুদা ৯ হাজার ৯৮৭, জাতীয় পার্টির (জাপা) মহসীন আলী ৩ হাজার ৪৩১ ও আ.লীগ প্রার্থী হিসাব উদ্দিন মাত্র ১ হাজার ৭৭১ ভোট পান।

পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯১ সালের ২৭ জানুয়ারি। এ নির্বাচনেও ৬ জন প্রার্থী ছিলেন। তারমধ্যে বিএনপি প্রার্থী আব্দুল গনি ২৯ হাজার ৬৪৯ ভোট পেয়ে জয়লাভ করেন। তার নিকটতম প্রতীদ্বন্দ্বী আ.লীগের হিসাব উদ্দিন ২৮ হাজার ৪৭৪ ভোট পান। জামায়াতের প্রার্থী আব্দুল কাদের ২২ হাজার ১শ, ইউনাইটেড লীগ থেকে জামাল উদ্দিন ৯ হাজার ৭৭০, জাতীয় পার্টির (জাপা) জালাল উদ্দিন ৩ হাজার ২৫৫ ও জাকের পার্টির আফজাল হক ৮১১ ভোট পেয়েছিলেন।

১৯৮৬ সালের ৭ মে অনুষ্ঠিত হয় তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এ নির্বাচনে আ.লীগ প্রার্থী নূরুল হক ২৩ হাজার ৮২৮ ভোট পেয়ে জয়লাভ করেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জাতীয় পার্টির (জাপা) জালাল উদ্দিনের প্রাপ্ত ভোট ১৫ হাজার ৩৫৩। তৃতীয় স্থানে থাকা বিএনপি প্রার্থীর প্রাপ্ত ভোটের তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। এমএল অ্যান্ড আইডিএল থেকে দাউদ হোসেন ৫ হাজার ৭৪৬ এবং খেলাফত থেকে নুরুল ইসলাম ২ হাজার ৮৩ ভোট পান।

দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭৯ সালের ১৮ ফ্রেব্রুয়ারি। এ নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী জিল্লুর রহমান ১৭ হাজার ৯৬৫ ভোট পেয়ে এ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এ নির্বাচনে ভোটার সংখ্যা ছিলো ৭৪ হাজার ৯৫৬। এরমধ্যে ভোট প্রদান করেন ৪৬ হাজার ২২৮ জন। বাতিল হয় ১ হাজার ২২। বিজয়ী জিল্লুর রহমানের নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন এমএল অ্যান্ড আইডিএলের প্রার্থী দাউদ হোসেন। তার প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা ১০ হাজার ১৯৭। আ.লীগ (মিজান) প্রার্থী জালাল উদ্দিন ৭ হাজার ৪৪০ ভোট পেয়ে তৃতীয় আর আ.লীগ (মালেক) প্রার্থী ইনামুল হক ৫ হাজার ৩০৯ ভোট পেয়ে চতুর্থ হন।

বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বপ্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ। এ নির্বাচনী এলাকা তখন মেহেরপুর-১ আসনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলো। মেহেরপুর-১ আসন ১৯৭৯ সালে বিভক্ত হয়ে গঠিত হয় নির্বাচনী এলাকা-৭৪ মেহেরপুর-২। তাই এ নির্বাচনী এলাকা ১৯৭৯ সালে ১৮ ফ্রেব্র“য়ারি প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যোগ দেয়। সে হিসেবে এ আসনের প্রথম সংসদ সদস্য হিসেবে বিবেচিত হন বিএনপি প্রার্থী জিল্লুর রহমান। প্রসঙ্গত, ১৯৮৮ সালের ৩ মার্চ অনুষ্ঠিতব্য চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্র“য়ারি অনুষ্ঠিতব্য ৬ষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি।

 

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *