ফরিদাকে গলাটিপে হত্যার একমাস পর ঘাতক প্রেমিক গ্রেফতার

চুয়াডাঙ্গা আবাসিক হোটেলে পাওয়া যুবতীর লাশের পরিচয় মিলেছে

স্টাফ রিপোর্টার: চুয়াডাঙ্গায় আবাসিক হোটেলে নারী হত্যা মামলার আসামি আনোয়ার ওরফে ফটিককে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। গত শুক্রবারে তাকে গাজীপুর থানা পুলিশের সহযোগিতায় চুয়াডাঙ্গা সদর থানা পুলিশ গ্রেফতার করে। গতকাল শনিবার রাতে ফটিককে সদর থানায় নেয়া হয়েছে। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে তিনি হত্যার কথা স্বীকার করেছেন।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা চুয়াডাঙ্গা সদর থানার ওসি (তদন্ত) আব্দুল খালেক জানান, নরসিংদী জেলার সদর থানার নজরপুর ইউনিয়নের বাহেরচর গ্রামের মৃত ধনু মিয়ার ছেলে আনোয়ার হোসেন ওরফে ফটিক (৩৪) দীর্ঘ প্রবাস জীবনযাপন করেছেন। দেশে এসে তার শ্বশুরাবাড়ি ঢাকা গাজীপুর জেলার শ্রীপুর থানার নয়নপুর দক্ষিণ ধনুয়া গ্রামে স্ত্রী সন্তানকে নিয়ে বসবাস করছিলেন। পাশাপাশি তিনি কার্গো গাড়ি চালাতেন। অপরদিকে ময়মনসিংহের আবু মিয়ার মেয়ে ফরিদা ইয়াসমিনের বিয়ে হয়েছিলো আলমগীর নামে এক মালয়েশিয়া প্রবাসীর সাথে। আনোয়ার ওরফে ফটিকের সাথে ফরিদা ইয়াসমিনের ছিলো দীর্ঘদিনের পরকীয়া সম্পর্ক। তারা মাঝে মাঝেই এলাকা ছেড়ে দেশের বিভিন্ন জেলার আবাসিক হোটেলে রাত্রিযাপন করতেন। এরই ধারাবাহিকতায় গত ২১ ফেব্রুয়ারি চুয়াডাঙ্গা জেলা শহরের ‘চুয়াডাঙ্গা আবাসিক হোটেল’ এ স্বামী-স্ত্রী পরিচয় দিয়ে রাত্রিযাপন করেন। কয়েকদিন সেখানে রাত্রিযাপনের পর ২৬ ফেব্রুয়ারি ফরিদাকে গলা টিপে হত্যা করে ফটিক পালিয়ে যান।
তিনি জানান, ফরিদার সাথে আমার প্রথম পরিচয় ২০০৯ সালে ময়মনসিংহের একটি রেস্টুরেন্টে। সেখান থেকেই আমরা মোবাইল নম্বর আদান প্রদান করি। তারপর থেকে আমাদের ভেতর প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এরই মাঝে আমি ভাগ্যের চাকা ঘুরাতে প্রবাসে চলে যাই। বিদেশ থেকে আসার কিছুদিন আগে ফরিদার বিয়ে হয় তারই খালাতো ভাই আলমগীরের সাথে। সেও মালয়েশিয়া প্রবাসী। আমি দেশে ফেরার পরপরই আমাদের আবার যোগাযোগ হয়। তার স্বামী মালয়েশিয়া প্রবাসী হওয়ায় আমাদের প্রেমজ সম্পর্ক আরও গাঢ় হয়। এরই মাঝে ফরিদা গাজীপুরে একটি মহিলা মেসে থাকা শুরু করেন। আমি শুরু করি ড্রাইভারি। আমার স্ত্রী একটি গার্মেন্টেসে প্রশাসনিক বিভাগে চাকরি করেন। ফরিদা গাজীপুর থাকায়, আর আমি ড্রাইভারি করার কারণে এলাকা ছেড়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় আবাসিক হোটেলে থাকা সুবিধা হতো। আমরা প্রায়ই বিভিন্ন জেলার আবাসিক হোটেলে রাত্রিযাপন করতাম। এরই মাঝে ফরিদা আমাকে বিয়ের জন্য চাপ দিতে থাকেন। সর্বশেষ আমরা ব্রাক্ষণবাড়িয়ায় আবাসিক হোটেলে রাত্রিযাপন করি এবং আমি তাকে বিয়ে করা সম্ভব না বলে বোঝাই। কিন্তু তারপরও সে শুনতে চাই না। তাই আবারও আমরা বাইরে আসি। উদ্দেশ্য ছিলো খুলনা যাওয়া। সেখানে যাই। সেখান থেকে চুয়াডাঙ্গার দর্শনায় যাই। দর্শনায় ভালো কোনো আবাসিক হোটেল না থাকায় ফরিদা এক নারীর কাছে জিজ্ঞেস করে কোথায় ভালো আবাসিক হোটেল আছে। সেই নারীর কথা শুনে চুয়াডাঙ্গাতে আসি। বেশ কয়েকটি হোটেল ঘুরে চুয়াডাঙ্গা আবাসিক হোটেলে স্বামী-স্ত্রী পরিচয় দিয়ে আমরা রুম ভাড়া নিই। ৩-৪ দিন অবস্থান করি আর ফরিদাকে বোঝাতে থাকি বিয়ে করা সম্ভব নয়, কারণ আমার স্ত্রী ও দুই মেয়ে আছে। এক পর্যায়ে ২৫ ফেব্রুয়ারি বিকেলে দুজনে মেলামেশা করি। এরপর আবারও ফরিদা বিয়ের জন্য চাপ দিলেও শুরু হয় কথা কাটাকাটি। শেষ পর্যন্ত মাগরিবের পর তাকে গলা টিপে হত্যা করি। এরপর বাইরে থেকে তালা দিয়ে আমি পালিয়ে যাই।
চুয়াডাঙ্গার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মো. কলিমুল্লাহ জানান, গত ২৬ ফেব্রুয়ারি আমরা খবর পাই জেলা শহরের চুয়াডাঙ্গা আবাসিক হোটেলে একটি কক্ষ তালাবদ্ধ আছে। তারপর ওই কক্ষের তালা ভেঙে দেখা যায় এক নারীর লাশ পড়ে আছে। লাশ উদ্ধার করে আমাদের জিম্মায় নিই। একই সাথে ওখানে ক্লু খোঁজার চেষ্টা করি। কোনো ক্লু খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিলো না। এক পর্যায়ে ওখানে একটি ভ্যানিটি ব্যাগ ছিলো। ওই ব্যাগের মধ্যে একটি বাংলালিংক সিমের স্টিকারে মোবাইল নম্বর লেখা ছিলো। সেই নম্বর ধরেই আমরা সামনের দিকে অগ্রসর হতে থাকি। সিমটা আবু মিয়া নামক এক ব্যক্তির নামে রেজিস্ট্রেশন করা। সেখানে ঠিকানা দেয়া আছে ময়মনসিংহের ফুলপুর গ্রামে। আবু মিয়া ফরিদার বাবা। সেখানে খোঁজ নিয়ে দেখা যায় তাদের একটি মেয়ে খুঁজে পাচ্ছে না। তারপর ফরিদার ছবি দেখালে তারা শনাক্ত করে ওটাই তাদের হারানো মেয়ে। আর ওই সিম কার্ড ব্যবহার করতো ফরিদা। তখন ওই সিম থেকে দেখা যায় দুটি নম্বরে বেশি কথা হয়েছে। সেই নম্বর ধরে তদন্তে অগ্রসর হতে থাকি। পরে দেখা যায় ওই নম্বর ব্যবহার হয়েছে চুয়াডাঙ্গার দর্শনা এবং বর্তমানে ঢাকা গাজীপুরের শ্রীপুর এলাকায়। তখন আমরা সোর্স নিয়োগ করলাম। একই সাথে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সার্চ দিয়ে দেখা যায় ওই নম্বর ব্যবহার ফেসবুক ও ইমোতে। ফেসবুক ও ইমো থেকে ব্যবহারকারীর ছবি সংগ্রহ করে হোটেল মালিক ও আশপাশের লোকজনকে দেখালে তারা শনাক্ত করে এই ছেলে ফরিদার সাথে চুয়াডাঙ্গা আবাসিক হোটেলে ছিলো। পরে ফরিদার প্রবাসী স্বামীকে আমরা ছবি দেখালে তিনি বলেন, এই ছেলের সাথে আমার স্ত্রীর অবৈধ সম্পর্ক রয়েছে বলে আমি শুনেছি। সেই হত্যা করেছে। তারপর আমরা আসামিকে খুঁজে বের করলাম। তার নাম জানলাম আনোয়ার। তাকে ধরার জন্য একটি নারী সোর্স নিয়োগ করি। ওই সোর্স আসামির শ্বশুরবাড়ি ভাড়া নিয়ে আমাদের তথ্য সরবরাহ করতেন। একপর্যায়ে গত শুক্রবার ঢাকা গাজীপুর পুলিশের সহযোগিতায় চুয়াডাঙ্গা সদর থানার ওসি (তদন্ত) আব্দুল খালেকের নেতৃত্বে পুলিশের একটি চৌকস দল অভিযান চালিয়ে তার শ্বশুরবাড়ি থেকে ফটিককে গ্রেফতার করে। তিনি স্বীকার করেন ফরিদাকে গলাটিপে হত্যা করেছি আমি।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *