প্রকৃতি থেকে বিলুপ্তি হতে চলেছে খাটাশ

 

 

মহাসিন আলী: প্রকৃতি থেকে বিলুপ্তি হতে চলেছে খাটাশ বা গন্ধগোকুল নামের আরো একটি প্রাণী। খাটাশকে বাগদাশ, ভাম বা ভামবিড়াল বলে ডাকা হয়ে থাকে। গন্ধগোকুল একটি নিশাচর প্রাণী। খাটাশের বিভিন্ন প্রজাতির মধ্যে এরাই মানুষের বেশি কাছাকাছি থাকে। দিনের বেলা বড় কোনো গাছের ভূমি সমান্তরাল ডালে লম্বা হয়ে শুয়ে থাকে। তখন লেজ ঝুলে থাকে নিচের দিকে।

খাটাশ বা গন্ধগোকুলের মাথা ও শরীরের গঠন লম্বাটে। পা খাটো ও মোটা। শরীরের রঙ গাঢ় ধূসর। তাতে হলুদ ও বাদামি আঁচ থাকে। এদের সারা শরীরে কালো কালো পর্টি ও ডোরা পিঠে কালো লোমের একটি খাড়া শিরা থাকে। মাথাসহ এদের দৈহিক দৈর্ঘপ্রায় ৩ ফুট। লেজ প্রায় ২ফুট। পূর্ণ বয়স্ক একটি খাটাশ বা গন্ধগোকুলের ওজন ৯ কেজি থেকে ১০ কেজি পর্যন্ত হয়ে থাকে। এদের গন্ধগ্রন্থি আকারে অনেক বড় এবং এ থেকে এরা তীব্র দুর্গন্ধ ছড়ায়।

খাটাশ বা গন্ধগোকুলেরা একাকী হলেও প্রজননের সময় মূলত স্ত্রী-পুরুষ একত্রে থাকে। এরা সাধারণত বছরে দু বার বাচ্চা দেয়। এদের গর্ভধারণ কাল দু মাসের কিছু বেশি সময়। প্রতিবারে এরা ৩টি করে ছানা দেয়। আর জন্মের পর ছানার চোখ খোলে ১০-১২ দিনে। পুরোনো গাছের খোঁড়ল এদের বাচ্চা প্রসবের উপযুক্ত স্থান। কিন্তু খোঁড়লের অভাবে গাছের ডালের ফাঁকে, পরিত্যক্ত ঘর বা ইটের ভাটা, ধানের গোলা ও তাল গাছের আগায় এরা ছানা তোলে। মা খাটাশ গন্ধগোকুলের দেহের সাথে লেজ মিলিয়ে একটি বৃত্তের সৃষ্টি করে ছানারা কখনোই বৃত্তের বাইরে যায়না।এরা পাখি, ব্যাঙ, সাপ, ছোট ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণী ইঁদুর, খরগোশসহ পাখির ডিম, কাঁকড়া ইত্যাদি খেয়ে থাকে। তাছাড়া এরা বিভিন্ন গাছের ফল এবং মূলও খেয়ে থাকে।

প্রকৃতি থেকে এ খাটাশ বা গন্ধগোকুল হারিয়ে যেতে বসেছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে ঘর-বাড়ি তৈরি করতে এদের আবাস-ভূমি ধ্বংস হচ্ছে। এছাড়া হাঁস-মুরগি বাঁচানোর জন্য আমরা নির্বিচারে এদের হত্যা করি। এতে খাটাশ বা গন্ধগোকুল দিন দিন কমে যাচ্ছে।খুলনা সরকারি ব্রজলাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএল কলেজ) প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. এ.কে.এম নজরুল কবীর বলেন, মেছো বাঘ কখনোই বাগডাশা নয়। মেছো বাঘ হলো মেছো বিড়াল (Fishing Cat)|এর বৈজ্ঞানিক নাম (Fishing Cat)|তিনি আরো বলেন, প্রাণী মাত্রই ভীতু। মরা ও ফেলে দেয়া প্রাণির মাংস খেয়ে খাটাশ বা গন্ধগোকুল প্রকৃতির পরিচ্ছন্নতা রক্ষা করে। এছাড়া এরা ইঁদুর, কাঠ বিড়ালসহ ক্ষতিকর প্রাণী ধরে খায়। নিতান্ত খাদ্যাভাবে এরা লোকালয়ে গিয়ে হাঁস-মুরগি ধরে নিয়ে পালায়। অকারণে খাটাশ বা গন্ধগোকুল দেখলে নির্বিচারে আমরা তাদের মেরে ফেলি। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় এদের ভূমিকা কম নয়। তাই খাটাশ বা গন্ধগোকুল রক্ষা করা আমাদের কর্তব্য।

মেহেরপুর জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা শশাংক কুমার মণ্ডল জানান, প্রকৃতিতে প্রত্যেক প্রাণীর কম-বেশি অবদান আছে। খাটাশকে বাগদাশ, গন্ধগোকুল, ভাম বা ভামবিড়াল বলে অঞ্চলভিত্তিক যে নামে ডাকা হোক না কেনকোনো না কোনোভাবে এরা পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করছে। প্রকৃতির সৃষ্টি এ প্রাণী ধ্বংস করা হলে আমাদের পরিবেশের ওপর তার বড় ধরনের প্রভাব পড়বে। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষার্থে তিনি এ প্রাণী ধ্বংস থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *