নজরুল স্মৃতিবিজরিত কার্পাসডাঙ্গার আটচালা ঘরটি সংরক্ষণের দাবি চুয়াডাঙ্গাবাসীর

 এখানেই বসে গাইতেন শ্যামাসঙ্গীত :লিখেছেন মৃত্যুক্ষুধা

রাজীব হাসান কচি:আজ রোববার কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১১৫তম জন্মবার্ষিকী। দিনটি উপলক্ষে উপজেলা প্রশাসন থেকে দুদিনব্যাপি নানা কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়েছে। একই সাথে তার স্মৃতি বিজরিত কার্পাসডাঙ্গার আটচালা সেই ঘরটি সংরক্ষণের জন্য সরকারের কাছে আবেদন করা হয়েছে। কবি কাজী নজরুল ইসলামের নানা স্মৃতি জড়িয়ে আছে কার্পাসডাঙ্গা গ্রামে। পদ্মগোখড়োর মতো বিখ্যাত গল্প ও কলসিডুবে যায় কবিতা লিখেছেন কবি কার্পাসডাঙ্গায়। কার্পাসডাঙ্গার ভৈরব নদের তীরে কবি বসে কবিতা লিখেছেন। থাকতেন যে বাড়িতে, সেটি এখনও আছে। নজরুলের স্মৃতি ধরে রাখতে এখানে এক সময় নজরুল মেলা হতো। কিন্তু সেটি এখন আর হয় না। সরকারের পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে তা বন্ধ হয়ে গেছে। তবুও কার্পাসডাঙ্গার মানুষ তাকে স্মরণ করে এখনও। চুয়াডাঙ্গা শহর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে দর্শনা-মুজিবনগর সড়কের পাশে কার্পাসডাঙ্গার অবস্থান। পাশেই রয়েছে ভৈরব নদ। ব্রিটিশ আমলে এখানে একটি বড় নীলকুঠি ছিলো। সেটি এখনও দাঁড়িয়ে আছে নদের পাশে। কার্পাসডাঙ্গা এলাকায় এক সময় অনেক জমিতে তুলাচাষ হতো। বহু আগে থেকেই কার্পাসডাঙ্গা ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য নাম করে। ফলে ইংরেজরা সেখানে নীলকুঠি গড়ে তোলে। কার্পাসডাঙ্গায় জেমস হিল নামের এক ইংরেজ জমিদার নীলচাষিদের ওপর অত্যাচার শুরু করেন। এতে মর্মাহত হন কার্পাসডাঙ্গার রেভারেন্ড স্কোয়ার এক পাদ্রী। তিনি ১৮৪০ সালে সেখানে অত্যাচারিত, নির্যাতিত ও ক্ষুধার্ত মানুষের এক সমাবেশ ডাকেন। জানা যায়, হাচার্ডশল নামের এক ফাদারও নীলচাষের বিরোধিতা করতেন। নীলকুঠির প্রধান আর্চ হিল একদিন তাকে কুঠিতে আমন্ত্রণ করে নিয়ে যান এবং কুঠিয়ালের গুলিতে নিহত হন।

১৯২০ সালে কার্পাসডাঙ্গায় ফাদার বারেতা এক কৃষক সমাবেশের আয়োজন করেন। ফলে আস্তে আস্তে সেখানে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বেড়ে যেতে থাকে। তাই নীলকুঠি সেখান থেকে সরিয়ে মেহেরপুরের কাজলীনদীর তীরে আমঝুপিতে স্থানন্তর করা হয়। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের আগ পর্যন্ত কার্পাসডাঙ্গা ছিলো নদীয়া জেলার অন্তর্ভুক্ত। ব্যবসা-বাণিজ্য ছিলো সেখানকার মানুষের নদীয়া জেলার কৃষ্ণনগরের সাথে। অগ্নিযুগের বিপ্লবী হেমন্ত কুমার সরকারের আমন্ত্রণে নজরুল ইসলাম ১৯২৬ সালের জানুয়ারি মাসে কোলকাতা থেকে পরিবার-পরিজন নিয়ে কৃষ্ণনগরে আসেন। সেখানে থাকা অবস্থায় তিনি কয়েকবার কার্পাসডাঙ্গায় আসেন। তবে নজরুল গবেষকরা বলেন, সেই সময় ভারতবর্ষে চলছিলো ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন। নজরুল ইসলাম কমিউনিস্ট নেতা মোজাফফর আহমেদের সাথে গঠন করেন শ্রমিক প্রজা কৃষক পার্টি। কার্পাসডাঙ্গায় তখন চলছিলো কৃষক আন্দোলন। মূলত সে কারণে তিনি কার্পাসডাঙ্গায় আসেন এবং স্বদেশি আন্দোলনের নেতাদের সাথে কয়েকবার করে বৈঠক করেন।

কার্পাসডাঙ্গায় নজরুল ইসলাম তার স্ত্রী প্রমীলা এবং পুত্র বুলবুলকে নিয়ে ওঠেন হর্ষপ্রিয় বিশ্বাসের বাড়িতে। খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী হর্ষপ্রিয় সে সময় নদীয়া জেলার কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। এছাড়া নজরুল ইসলাম আরও একবার কার্পাসডাঙ্গায়আসেন। কার্পাসডাঙ্গা মিশনের প্রধান সে সময় ছিলেন দ্বাবিকানাথ সরকার। তার ছেলে মহিম সরকারের মেয়ে আতা রাণী এবং শিউলী ছিলেন নজরুলের গানের ছাত্রী। তাদের কোলকাতায় বাড়ি ছিলো আর্মহাস্ট স্ট্রিটে। নজরুল ইসলামও বাস করতেন কোলকাতায় তার বাড়ির পাশে। এদের আমন্ত্রণে নজরুল কার্পাসডাঙ্গায় এসেছেন এবং থেকেছেন প্রমীলা ও বুলবুলকে নিয়ে। যে বাড়িতে নজরুল থেকেছেন সেই বাড়ি এখনও আছে। ওই বাড়িতে এখন বসবাস করেন প্রদ্যুত বাবু। নজরুল যখন কার্পাসডাঙ্গায় আসেন, সেই সময়ের এখন অনেক মানুষ বেঁচেনেই। কয়েক বছর আগেও বেঁচে ছিলেন। তাদের কাছ থেকে বর্তমান প্রজন্মেরমানুষ জেনেছেন কার্পাসডাঙ্গায় নজরুল সম্পর্কে। গ্রামের মিশনপাড়ায় কবির পত্নীপ্রমীলা কাজী কানামাছি ও তাস খেলতেন। ছেলে বুলবুলকে নদের ঘাটে গোসল করিয়েছেন। যুবক নজরুল মিশনঘাটে বসে কবিতা ও গান লিখতেন। ভৈরবের তীরে নিশ্চিন্তপুর মৌজায় যামিনী বাবুদের বৈঠকখানা ছিলো।সেখানে ছিলো ফুলের বাগান। সেখানে বসে কবি ভৈরবী ও শ্যামাসঙ্গীত গেয়ে অনেক রাত কাটিয়েছেন। ভৈরব নদের যে ঘাটে বসে তিনি কবিতা লিখতেন সেখানে এবং আশপাশে একাধিক স্মৃতিফলক নির্মাণ করা হয়েছে।

১৯৩০ সালে মৃত্যুক্ষুধাউপন্যাস প্রকাশিত হয়।এতে অশিক্ষিত দরিদ্র মুসলমান ও খ্রিস্টান সমাজের চিত্র ফুটে উঠেছে। ধারণা করা হয়, এ উপন্যাসের পটভূমি ছিলো কার্পাসডাঙ্গা। প্রসঙ্গত,কার্পাসডাঙ্গায় সে সময় মুসলমান ও খ্রিস্টান ধর্মের মানুষের বাস ছিলো বেশি। এখনও সেখানে অনেক খ্রিস্টান পরিবার বাস করে। কার্পাসডাঙ্গায় নজরুলের স্মৃতি ধরে রাখতে ১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে সেখানে প্রথম নজরুল মেলা বসে। গঠন করা হয় নজরুল স্মৃতি সংসদ। ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত মোট আটবার মেলা অনুষ্ঠিত হয়। মেলার আয়োজকদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন এম ইব্রাহিম। কিন্তু তিনি অসুস্থ হয়ে বিছানাগত হলে মেলাটি বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে তিনি মারা যান। তৎকালীন সময়ে সরকারিভাবে মেলায় সাহায্য সহযোগিতা করা হয়নি। তবে ওই মেলায় পশ্চিমবঙ্গের অনেক সাহিত্যিক অংশ নেন। নজরুল স্মৃতি সংসদ কার্পাসডাঙ্গায় নীলকুঠি সাহেবদের পরিত্যক্ত বাড়িতে নজরুল পর্যটন কেন্দ্রগড়ে তোলার জন্য ১৯৯৩ সালে সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতরে এক প্রকল্প দাখিল করে। নীলকুঠি ভবন সংস্কারের জন্য সরকারের উচ্চ পর্যায়ে একবার জরিপ হয়। ১৯৯৬ সালে সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় থেকে কিছু টাকা বরাদ্দ দেয়া হলেও তা আর বাস্তবায়িত হয়নি। কার্পাসডাঙ্গাচুয়াডাঙ্গার মানুষ চায় আবার মেলাটি চালু হোক।

বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের স্মৃতি বিজরিত স্থানগুলো সংরক্ষণসহ নজরুল কমপ্লেক্স স্থাপন হবে এমনটি দাবি চুয়াডাঙ্গাবাসীর।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *