তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে সাগরের দুটি ব্লক পেলো ভারতের ওএনজিসি

স্টাফ রিপোর্টার: অগভীর সমুদ্রের ৪ ও ৯ নম্বর ব্লকে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের কাজ পেয়েছে ভারতের কোম্পানি অয়েল অ্যান্ড ন্যাচারাল গ্যাস কর্পোরেশনের (ওএনজিসি)। এ লক্ষ্যে দেশটির রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানটির সাথে সোমবার চুক্তি সই হয়েছে। এর মধ্যে দিয়ে কোনো ভারতীয় প্রতিষ্ঠান প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে তেল, গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের সুযোগ পেলো। রাজধানীর পেট্রোসেন্টারে  বাংলাদেশ সরকার, পেট্রোবাংলা এবং ওএনজিসি-বিদেশ, অয়েল ইনডিয়া ও বাপেক্সের মধ্যে এ দুটি অনুসন্ধান, উৎপাদন ও বণ্টন চুক্তি (পিএসসি) হয়। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি বিষয়ক উপদেষ্টা তৌফিক-ই ইলাহী চৌধুরী, বিদ্যুত জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু এবং ভারতীয় হাই কমিশনার পঙ্কজ শরণ চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। মডেল পিএসপি ২০১২ এর আওতায় ২০১২ সালের ডিসেম্বরে অগভীর সমুদ্রে ৯টি ও গভীর সমুদ্রে ৩টি ব্লকের জন্য দরপত্র ডাকে পেট্রোবাংলা। অগভীর সমুদ্রে আরো দুটি ব্লকে যুক্তরাষ্ট্রের কনকো ফিলিপস (ব্লক ৭) এবং স্যান্টোস-ক্রিস এনার্জির (ব্লক ১১) সাথে চলতি মাসেই চুক্তি হবে বলে পেট্রোবাংলা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। ৪ ও ৯ নম্বর ব্লকে অনুসন্ধান ও উত্তোলনে ওএনজিসির সাথে যৌথভাবে (ক্যারিড ইন্টারেস্ট) থাকছে দেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্স। তেল-গ্যাস উত্তোলন হলে খরচ দিয়ে ১০ শতাংশের অংশীদার হবে বাপেক্স। আর উত্তোলন না হলে বাপেক্সকে কোনো খরচ দিতে হবে না বলে অনুষ্ঠানে জানানো হয়। ভারতের সাথে এ চুক্তিকে সাধুবাদ জানিয়ে অর্থমন্ত্রী মুহিত বলেন, উত্তরাধিকার সূত্রেই আমরা জ্বালানি সঙ্কটে আছি। সেটা মেটাতে আরো জ্বালানি আমাদের প্রয়োজন। বাংলাদেশের সার উৎপাদন শতভাগ গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল, এছাড়া বিদ্যুত উৎপাদন ৭০ শতাংশের বেশি গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। এছাড়া অন্যান্য শিল্প কারখানা ও আবাসিক মিলিয়ে মোট প্রায় ২৫ লাখ গ্রাহকের নিয়মিত গ্যাস সরবরাহ করতে গিয়ে সরকারকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। ২৫টি গ্যাস ক্ষেত্র থেকে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা হচ্ছে, তারপরও বর্তমানের গ্রাহকদের মধ্যেই ৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। বাংলাদেশ থেকে এখন পর্যন্ত ১১ দশমিক ৭২ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা হয়েছে, এখনো ১৫ দশমিক ৩২ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের প্রমাণিত মজুদ রয়েছে বলে পেট্রোবাংলা থেকে জানানো হচ্ছে।  এ অবস্থায় ঘাটতি পূরণ করে নতুন গ্রাহকদের গ্যাস দিতে সরকারের পক্ষ থেকে নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার এবং তরল প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির ওপর জোর দেয়া হচ্ছে।

২০১২ সালের সেপ্টেম্বরে উৎপাদন বণ্টন চুক্তি (পিএসপি) ২০১২ প্রণয়নের পর ভারতের সাথে বিরোধপূর্ণ ব্লকগুলো বাদ রেখে  ডিসেম্বরে গভীর ও অগভীর সমুদ্রের ১২টি ব্লকে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য দরপত্র ডাকে পেট্রোবাংলা। এর মধ্যে অগভীর সমুদ্রের এসএস-০২ থেকে এসএস-০৪ ও এসএস-০৬ থেকে এসএস-১১ ব্লকের জন্য দু দফার দরপত্র ডাকা হয়। তারপরও চারটি ব্লকের জন্য তিনটি কোম্পানি দরপ্রস্তাব জমা দেয়। কিন্তু গভীর সমুদ্রের ডিএস-১২, ডিএস-১৬ ও ডিএস-২১ ব্লকের জন্য তেল-গ্যাস অনুসন্ধানকারী কোনো আন্তর্জাতিক কোম্পানির প্রস্তাব না পেয়ে গতবছর ফেব্রুয়ারিতে টেন্ডার প্রক্রিয়া স্থগিত করে পেট্রোবাংলা। ঠিকাদারদের দাবি অনুযায়ী শর্ত শিথিলের জন্য পিএসসি সংশোধন করা হয়। এ তিন ব্লকের জন্য বর্তমানে দরপত্র মূল্যায়ন চলছে। তিনটি ব্লকেই একমাত্র দরদাতা কনকো ফিলিপস। এছাড়া গভীর সমুদ্রের ব্লক ডিএস ১০ ও ডিএস ১১ থেকে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের জন্য ২০১১ সালে কনকো ফিলিপসের সাথে চুক্তি করে সরকার। বর্তমানে চারটি গ্যাসক্ষেত্র থেকে বিদেশি শেভরন ও তাল্লো দেশের মোট গ্যাসের ৫৪ শতাংশ সরবরাহ করছে।

ওএনজিসির চুক্তি: অগভীর সমুদ্রের ব্লক ৪ এর আয়তন ৭ হাজার ২৬৯ বর্গকিলোমিটার এবং ব্লক ৯ এর আয়তন ৭ হাজার ২৬ কিলোমিটার। দুটি ব্লকের জন্যই অন্তত একটি করে কূপে ওএনজিসিকে ২২০০ ও ১৮৫০ কিলোমিটার লাইন টু ডি সিসমিক সার্ভে করতে হবে। শর্ত অনুযায়ী, তেল-গ্যাস অনুসন্ধান কাজে অন্তত ৫০ শতাংশ এবং উত্তোলন কাজে অন্তত ৯০ শতাংশ বাংলাদেশিকে যুক্ত করতে হবে। তেল-গ্যাস পাওয়া গেলে মোট গ্যাসের ৫৫ শতাংশ (কস্ট রিকভারি) পাবে ওএনজিসি। বাকি অংশের মধ্যে তেল ও কনডেনসেটের ৭০ থেকে ৯০ শতাংশে এবং গ্যাসের ক্ষেত্রে ৬০ থেকে ৮৫ শতাংশ পাবে পেট্রোবাংলা। অনুসন্ধানকারী প্রতিষ্ঠান উত্তোলিত গ্যাস প্রথমে পেট্রোবাংলার কাছে বিক্রির জন্য প্রস্তাব দেবে, পেট্রোবাংলা প্রত্যাখ্যান করলে দেশের মধ্যেই তৃতীয় পক্ষের কাছে বিক্রি করতে হবে। উত্তোলিত তেল-গাসের দাম নির্ধারিত হয়েছে হাই সালফার ফুয়েল অয়েল সিঙ্গাপুর ভিত্তিতে প্রতি টন ১০০ ডলার থেকে ২০০ ডলারের মধ্যে। ব্লক ৪ এ ৮ বছরের (৫+৩) চুক্তি মেয়াদের জন্য ওএনজিসিকে গ্যারান্টি অর্থ রাখতে হবে ৫৮ দশমিক ৪ মিলিয়ন ডলার (৩৮.৪+২০ মিলিয়ন) এবং ব্লক ৯ এর এ অর্থের পরিমাণ ৮৬ দশমিক ৪ মিলিয়ন ডলার (৬৪.৮+২১.৬ মিলিয়ন)। এ দুটি ক্ষেত্রে অনুসন্ধানের কাজ পাওয়া ওএনজিসি ফোর্বসের তালিকায় ২০১২ সালে ২০০০ বড় কোম্পানির তালিকায় সপ্তদশ স্থানে ছিলো। ওএনজিসি নিজ দেশের বাইরে ১৫ দেশে কাজ করছে। কোম্পানিটি প্রতিদিন ১২ লাখ ৪০ হাজার ব্যারেল তেল উৎপাদন করে।

Leave a comment

Your email address will not be published.