ঝিনাইদহে বৃদ্ধ পুরোহিতকে গলা কেটে হত্যা, আইএসের দায় স্বীকার

স্টাফ রিপোর্টার: ঝিনাইদহ সদর উপজেলার নলডাঙ্গা ইউনিয়নের মহিষারভাগাড় এলাকায় সনাতন ধর্মাবলম্বী বৃদ্ধ এক পুরোহিতকে গলা কেটে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। মঙ্গলবার সকাল নয়টার পর এলাকার একটি মাঠ দিয়ে বাইসাইকেলে করে যাওয়ার সময় তাঁকে হত্যা করে মোটরসাইকেলে আসা তিন যুবক।

নিহত পুরোহিতের নাম আনন্দ গোপাল গাঙ্গুলি। তাঁর বয়স আনুমানিক ৬৯ বছর। তিনি সদর উপজেলার করাতিপাড়া গ্রামের মৃত সত্য গোপাল গাঙ্গুলির ছেলে। সকালে মাঠে কাজ করতে যাওয়ার সময় কৃষকেরা পুরোহিতের লাশ পড়ে থাকতে দেখে পুলিশে খবর দেন। সাম্প্রতিক সময়ের বিভিন্ন হত্যাকা-ের ধরনের সঙ্গে মিল থাকায় এ ঘটনার পেছনেও জঙ্গিদের হাত থাকতে পারে বলে সন্দেহ করছে পুলিশ।

এলাকাবাসী জানান, সকাল ৯টার পর করাতিপাড়ার বাড়ি থেকে সাইকেলে সিদ্বেশ্বরী কালী মন্দিরে যাওয়ার সময় মহিষাডাঙ্গা গ্রামে মহিষের ভাগাড় মাঠের ভেতরে আক্রান্ত হন তিনি। এই স্থানটি তার বাড়ি থেকে দুই কিলোমিটার দূরে। দেশের বিভিন্ন স্থানে একই কায়দায় হত্যাকা-ের প্রেক্ষাপটে পুরোহিত খুনের খবর পেয়ে পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা, জেলা প্রশাসক, ইউএনওসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে যান। মোটর সাইকেল আরোহী খুনিদের শনাক্ত করতে জেলার গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে চৌকি বসিয়ে গাড়ি তল্লাশি করা হচ্ছে।

ঝিনাইদহের সহকারী পুলিশ সুপার গোপীনাথ জানান, মোটর সাইকেলে করে আসা তিনজন পুরোহিতের উপর হামলা করে। তারা প্রথমে বাঁশ দিয়ে মাথায় আঘাত করে। জবাই করে হত্যার পর মোটর সাইকেলে করে চলে যায়। ঘটনা দেখে মনে হচ্ছে জঙ্গিরা এর সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আজবাহার আলী শেখ বলেন, নির্জন মাঠের মধ্যে পুরোহিতকে খুন করে পালিয়ে যায়। এসময় মাঠে কাজ করা কৃষকরা টের পেয়ে চিৎকার দিলে গ্রামবাসী ছুটে আসে। এরপর পুলিশকে খবর দেয়।

এলাকাবাসী আরো জানান, আনন্দ গোপাল এক সময় নলডাঙ্গা দুর্গা মন্দিরের পুরোহিত থাকলেও এখন নির্দিষ্ট কোনো মন্দিরে কাজ করতেন না। বিভিন্ন মন্দিরে ও বাড়িতে পূজারীর কাজ করতেন তিনি। নিরীহ ও সহজ-সরল ছিলেন। গ্রামের কারও সঙ্গে পুরোহিত বা তাঁর পরিবারের কোনো বিরোধ ছিল না। সকালে পুরোহিতের বাড়িতে গিয়ে তাঁর স্ত্রী শেফালী গাঙ্গুলিকে অঝোরে কাঁদতে দেখা যায়। কাঁদতে কাঁদতেই তিনি বলছিলেন, সকালে স্নান, খাওয়া-দাওয়া ও পূজা সেরে তিনি বাইরে গিয়েছিলেন।  আধাঘণ্টা পর শুনি তাকে কারা কুপিয়ে ফেলে রেখে গেছে। আমার স্বামী তো কোনো অন্যায় কাজ করেনি। তাকে কেন হত্যা করা হলো? কি অপরাধ ছিলো তার?

নিহত পুরোহিতের তিন মেয়ে ও দুই ছেলে। তিন মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। দুই ছেলের একজন স্থানীয় স্কুলের শিক্ষক ও আরেকজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। নিহতের ছোট ছেলে সিন্ধু গাঙ্গুলি বলেন, বাবা প্রতিদিন ভোরে ঘুম থেকে উঠে ফুল তুলে পূজা করতে যান। আজ সকালেও বেরিয়েছিলেন। কিছুক্ষণ পরই তার মৃত্যুর খবর পাই। বড় ছেলে তপন গাঙ্গুলির মেয়ে বৈশাখী গাঙ্গুলি জানান, ঠাকুরদা সকালে বাড়িতে পূজা করেন। পূজা শেষে সবাইকে প্রসাদ দিয়ে সকাল পৌনে নয়টার দিকে বাইসাইকেলে করে বের হন। এক ঘণ্টা পর খবর পান, মাঠের মধ্যে ঠাকুরদাকে কারা হত্যা করে ফেলে রেখে গেছে।

প্রতিবেশী স্কুলশিক্ষক নীলরতন রায় বলেন, পুরোহিত কাকা নিরীহ মানুষ। সহজ-সরল। পূজা করে বেড়ান। তাঁর কোনো শত্রু নেই। কারা, কেন মারল, তাঁরা বুঝতে পারছেন না। যে জায়গায় পুরোহিত কাকাকে হত্যা করা হয়েছে, সেখান দিয়ে তিনি প্রায়ই যাতায়াত করতেন। প্রতিবেশী আমোদ আলী জানান, আনন্দ গাঙ্গুলির মনে সব সময় আনন্দ থাকত। তাঁর মতো মানুষ হয় না। তিনি হিন্দু-মুসলমান সবার সঙ্গে সমানভাবে মিশতেন। বাচ্চাদের পেলে আদর করতেন।

লাশের সুরতহাল প্রস্তুতকারী এসআই মঞ্জুরুল ইসলাম জানান, পুরোহিত আনন্দ গোপাল গাঙ্গুলীর মাথা, ঘাড়, গলাসহ বিভিন্ন স্থানে ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন রয়েছে।

এর আগে এ বছরের জানুয়ারি মাসে ঝিনাইদহ সদর উপজেলার গান্না ইউনিয়নের কালুহাটি গ্রামে হোমিও চিকিৎসক ছামির আলীকে (৮০) ছুরিকাঘাত করে হত্যা করে কয়েকজন মুখোশধারী। দায় স্বীকার করে আইএস বলে, ইসলাম থেকে খ্রিষ্টধর্মে ধর্মান্তরিত হওয়ার কারণে তাঁকে হত্যা করা হয়েছে। গত ১৪ মার্চ ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলায় শিয়া সম্প্রদায়ের অনুসারী আব্দুর রাজ্জাক (৪৮) নামের এক হোমিও চিকিৎসককে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এই হত্যারও দায় স্বীকার করে আইএস।

গত দুই বছরে এভাবে একের পর এক হত্যাকা-ে জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ এসেছে, খুন হয়েছেন সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী লেখক, ব্লগার, প্রকাশক; ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও ভিন্ন মতাবলম্বীরও হামলার শিকার হয়েছেন। গত তিন দিনের মধ্যে আরও দুটি ঘটনা ঘটেছে, যেখানে জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার সন্দেহ করা হচ্ছে অথবা জঙ্গিদের দায় স্বীকারের খবর এসেছে।

গত রোববার সকালে চট্টগ্রামে ছেলেকে স্কুলবাসে তুলে দিতে গিয়ে রাস্তার মধ্যে আক্রান্ত হন জঙ্গিবিরোধী অভিযানে নেতৃত্বে দেওয়া পুলিশ কর্মকর্তা বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা আক্তার মিতু। মোটরসাইকেলে আসা তিনজন প্রথমে কুপিয়ে ও পরে গুলি করে মিতুর মৃত্যু নিশ্চিত করে চলে যায়। ওই ঘটনার তদন্তে প্রাথমিকভাবে জেএমবি জঙ্গিদের সন্দেহ করছে পুলিশ।

একই দিন সকালে নাটোরের বড়াইগ্রাম  উপজেলার বনপাড়া পৌর এলাকার খ্রিস্টানপাড়ায় নিজের দোকানে খুন হন ৬০ বছর বয়সী সুনীল গোমেজ। তার ভাই প্রশান্ত গোমেজ দিনাজপুরে একটি চার্চের ফাদার; ওই জেলায় সম্প্রতি এক খ্রিস্টান পাদ্রি আক্রান্ত হন। আইএস সুনীল হত্যার দায় স্বীকার করেছে বলে সাইট ইন্টেলিজেন্স গ্রুপের খবর। গত দুই বছরে দেশের বিভিন্ন স্থানে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর আরও কিছু ঘটনায় দেশি জঙ্গিগোষ্ঠীর জড়িত থাকার কথা বলে আসছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এর মধ্যে অধিকাংশ ঘটনাই ঘটেছে দেশের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলে।

গত ১৪ মে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির চাকপাড়া বৌদ্ধ বিহারের অধ্যক্ষ মং শৈ উ-কে গলা কেটে হত্যা করা হয়। ওই ঘটনাতেও আইএস এর দায় স্বীকারের খবর এসেছে। এর আগে গত ২১ ফেব্রুয়ারি সকালে পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জে করতোয়া নদীর পশ্চিম পাড়ের সন্তগৌরীয় মঠের অধ্যক্ষ যজ্ঞেশ্বর রায়কে (৫০) গলা কেটে হত্যা করা হয়। ওই ঘটনাতেও ব্যবহার করা হয় মোটরসাইকেল, অংশ নেয় তিনজন। কয়েকজনকে গ্রেপ্তারের পর পুলিশ জানিয়েছে, জেএমবির জঙ্গিরাই ওই হত্যাকা- ঘটায়।

২২ মার্চ সকালে কুড়িগ্রাম পৌরসভার গাড়িয়ালপাড়ার ধর্মান্তরিত মুক্তিযোদ্ধা হোসেন আলীকে তার বাড়ির কাছে গলা কেটে হত্যা করে মোটরসাইকেলে আসা তিনজন। ৩০ এপ্রিল টাঙ্গাইলের গোপালপুরে খুন হন নিখিল চন্দ্র জোয়ার্দার নামের এক দর্জি, যাকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে এক মামলায় তিন মাস কারাগারে কাটাতে হয়েছিল। সেখানেও হত্যাকা-ের ধরণ ছিল একই রকম।

গত বছর ১০ ডিসেম্বর রাতে দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলার জয়নন্দ গ্রামে ইসকন মন্দিরে ধর্মসভা চলাকালে গুলি ও বোমা বিস্ফোরণ ঘটায় দুর্বৃত্তরা। এতে দুইজন আহত হন। গুলি ও বোমা ছুড়ে পালানোর সময় স্থানীয় জনতা এক যুবককে ধাওয়া দিয়ে আটক করে পুলিশে দেয়। পরে তার স্বীকারোক্তিতে জঙ্গি সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায় বলে পুলিশ জানায়।

গত বছরের ১৮ নভেম্বর সকালে দিনাজপুর শহরে অজ্ঞাত বন্দুকধারীরা ইতালীয় নাগরিক পিয়েরো পারোলারিকে (৭৮) গুলি করে আহত করে। পিয়েরো পারোলারি দিনাজপুরের সুইহারি ক্যাথলিক চার্চের ফাদার। পেশায় চিকিৎসক এ ইতালীয় নাগরিক শহরের সেন্ট ভিনসেন্ট হাসপাতালে কর্মরত ছিলেন। গত বছরের ৫ অক্টোবর ধর্মীয় দীক্ষা নেওয়ার কথা বলে তিন যুবক ঈশ্বরদীর পৌর এলাকার স্কুলপাড়ায় লুক সরকারের ভাড়া বাসায় গিয়ে তাকে গলাকেটে হত্যার চেষ্টা চালায়। লুক সরকার পাবনার ঈশ্বরদীর ফেইথ বাইবেল চার্চ অব গডের যাজক ছিলেন। এছাড়া চলতি বছর ২১ মে কুষ্টিয়া সদর উপজেলায় ৫৫ বছর বয়সী বাউলভক্ত হোমিওপ্যাথ চিকিৎসক মীর সানোয়ার হোসেনকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। বাধা দিতে গিয়ে গুরুতর আহত হন সানোয়ারের বন্ধু ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সাইফুজ্জামান (৪৫)।

ওই ঘটনাতেও মটরসাইকেলে করে এসেছিল তিন হামলাকারী, পরে এসেছিল আইএসের দায় স্বীকারের খবর। আর ২৫ এপ্রিল ঢাকার কলাবাগানে খুন হন ইউএসএআইডি কর্মী জুলহাজ মান্নান ও তার বন্ধু নাট্যকর্মী মাহবুব রাব্বী তনয়। তারা দুজনই সমকামী অধিকারকর্মী ছিলেন। ওই ঘটনায় আল কায়েদার ভারতীয় উপমহাদেশ শাখা- একিউআইএস দায় স্বীকার করে বলে খবর দেয় সাইট ইনটেলিজেন্স গ্রুপ। এ ধরনের ঘটনায় প্রথম একিউআইএসের নামে গত বছর ফেব্রুয়ারিতে বিজ্ঞান লেখক ও ব্লগার অভিজিৎ রায় হত্যার দায় স্বীকারের খবর আসে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে এই দাবি নাকচ করে বরাবরই বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বাইরের কোনো জঙ্গি গোষ্ঠীর কোনো অস্তিত্ব নেই। ‘দেশে জন্ম নেওয়া জঙ্গিরা’ এ ধরনের ঘটনা ঘটিয়ে থাকতে পারে।

 

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *