ঝিনাইদহে বাস-মিনিবাস শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক খুন : অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট

0
32

লাশ নিয়ে মিছিলের সময় শ্রমিক ঐক্যপরিষদের হরতাল আহ্বান : খুনিদের গ্রেফতার না করা পর্যন্ত ধর্মঘট অব্যাহত রাখার ঘোষণা

 

ঝিনাইদহ প্রতিনিধি:ঝিনাইদহ জেলা বাস-মিনিবাস শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল গাফফার বিশ্বাসকে (৫০) কুপিয়ে খুন করেছে দুর্বৃত্তরা। গতকাল সোমবার ভোর ৪টার দিকে জেলা শহরের আরাপপুরের উকিলপাড়ায় এ নৃশংস ঘটনা ঘটে। খুনের প্রতিবাদে ঝিনাইদহ শহল উত্তাল হয়ে উঠেছে। পরিবহন শ্রমিকরা গতকাল থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য ধর্মঘট শুরু করে। ধর্মঘটের কারণে দূর-দূরান্তের যাত্রীদের অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হয়। পরে ঝিনাইদহে মঙ্গলবার হরতাল আহ্বান করা হয়। লাশ নিয়ে মিছিলে শ্রমিকনেতৃবৃন্দ হত্যাকরীদের ফাঁসির দাবি জানিয়ে মঙ্গলবার হরতাল আহ্বান করে।

Jhenidah Killed Photo_01

নিহত গাফফার কালীগঞ্জ উপজেলার নিয়ামতপুর গ্রামের মৃত বাবর আলী বিশ্বাসের ছেলে। তিনি ঝিনাইদহ জেলা বাস-মিনিবাস শ্রমিক লীগেরও সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। পরিবার নিয়ে তিনি ঝিনাইদহ শহরের আলহেরাপাড়ায় বসবাস করতেন। জেলা বাস-মিনিবাস শ্রমিক ইউনিয়নের কমিটি নিয়ে বিরোধের জের ধরে তাকে খুন করা হতে পারে বলে পুলিশের ধারণা।

নিহত শ্রমিক নেতার মেয়ে রূপনা খাতুন জানান, রোববার রাত ১০টার দিকে তিনি কয়েক জন শ্রমিকের সাথে বাসা থেকে বের হন। রাতে বাড়ি ফেরেন না। ভোরে তারা বাবার খুনের খবর পান।

ঝিনাইদহ সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শাহাবুদ্দিন আজাদ জানান, তাকে রাত ১২টার দিকে শহরের চুয়াডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ডে হাফিজ নামে এক শ্রমিকের সাথে একটি চায়ের দোকানে চা খেতে দেখা যায়। ভোর ৪টার দিকে আরাপপুর উকিলপাড়া মোড়ে তাকে কুপিয়ে মারাত্মক জখম করে ফেলে যায় দুর্বৃত্তরা। তখনও তিনি জীবিত ছিলেন। পথচারীদের সহায়তায় টহল পুলিশ তাকে উদ্ধার করে জেলা সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মোজাম্মেল হক তাকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। নিহতের লাশ ময়নাতদন্তের জন্য সদর হাসপাতালমর্গে পাঠানো হয়েছে। তবে এ ঘটনায় পুলিশ কাউকে আটক করতে পারেনি। ঘটনার তদন্ত চলছে।

নিহতের স্ত্রী রোকসানা খাতুন অভিযোগ করেন, ঝিনাইদহ পৌরমেয়র জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্মসম্পাদক সাইদুল করিম মিন্টুর সাথে ঠিকাদারি কাজের বিরোধ নিয়ে তাকে খুন করা হয়েছে। পৌর বাসটার্মিনালের কাজের জন্য তার স্বামী মেয়রের নিকট ২৮ লাখ ৫৬ হাজার টাকা পাবেন। মেয়রের ভাড়াটিয়া সন্ত্রাসীরা তার স্বামীকে খুন করেছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা রিজু বল সাইদ, অলিয়ার ও বজলু তার স্বামীকে খুনের জন্য সন্ত্রাসীদের লেলিয়ে দিয়েছিলো। তাদের ভয়ে গাফফার শশ্মানঘাটে পালিয়ে থাকতেন। সেখানে থেকেও সন্ত্রাসীরা প্রতিমাসে ১৫ হাজার টাকা চাঁদা আদায় করতো।

ঝিনাইদহের সহকারী পুলিশ সুপার মো. নজরুল ইসলাম বলেন, বাস-মিনিবাস শ্রমিক ইউনিয়নের মধ্যে দ্বন্দ চলছে। এ কারণে এ হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে বলে ধারণা করা যাচ্ছে। আবার শ্রমিক ইউনিয়নের মধ্যে বিরোধের সুযোগে তৃতীয় পক্ষ ঘটনা ঘটাতে পারে বলেও তিনি ধারণা করেন। এ ঘটনায় সদর থানায় মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।

শ্রমিকদের একটিসূত্র জানায়, রোববার রাত ১০টার দিকে এক শ্রমিক গাফফারকে মোটরসাইকেলে করে আরাপপুর উকিলপাড়ায় নামিয়ে দিয়ে আসে। এরপর ভোরে তাকে কুপিয়ে খুন করা হয়। ঝিনাইদহ বাস-মিনিবাস শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক ছিলেন আবদুল গাফফার বিশ্বাস। নেতৃত্ব নিয়ে দ্বন্দের কারণে তিনি সাময়িকভাবে বহিষ্কৃত হন। রোববার প্রশাসনের সহায়তায় দু পক্ষের মধ্যে শ্রমিক সমঝোতার মাধ্যমে গাফফার গ্রুপ ইউনিয়ন অফিসের কর্তৃত্ব ফিরে পান।

এদিকে এ নির্মম হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় শ্রমিক সংগঠনগুলোর মধ্যে চরম অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। শ্রমিক নেতা আব্দুল গাফফার বিশ্বাস খুনের প্রতিবাদে অনির্দিষ্টকালের পরিবহন ধর্মঘট পালন করছে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা। এতে করে ঝিনাইদহের সাথে সব রুটের যান চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে দূর-দূরান্তের যাত্রীরা ঝিনাইদহ শহরে আটকা পড়ে দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন।

আজ সোমবার সকাল ৯টা থেকে অনির্দিষ্টকালের পরিবহন ধর্মঘট ডেকে শ্রমিকরা রাস্তায় শুয়ে বিক্ষোভ শুরু করে। এসময় দুটি বাস ও চারটি ইজিবাইক ভাঙচুর করে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা। এদিকে হত্যাকারীদের গ্রেফতার না করা পর্যন্ত সব রুটে যান চলাচল বন্ধ থাকবে বলে বাস-মিনিবাস শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি উজ্জ্বল বিশ্বাস জানিয়েছেন। আব্দুল গাফফার বিশ্বাস খুনের জের ধরে ঝিনাইদহে বিবদমান বাস শ্রমিকদের দুটি গ্রুপের মধ্যে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে শহরে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

ঝিনাইদহ জেলা বাস-মিনিবাস শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মো. আব্দুল গাফফার বিশ্বাস হত্যাকারীদের গ্রেফতার দাবি করেছেন জেলা বাস-মিনিবাস মালিক সমিতির নেতৃবৃন্দ। এক প্রেসবিজ্ঞপ্তিতে সংগঠনের নেতৃবৃন্দ বলেন, এ ঘটনায় আমরা গভীরভাবে শোকাহত। জেলা বাস-মিনিবাস মালিক সমিতির পক্ষ থেকে এ হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন,সংগঠনের সভাপতি মো. রোকনুজ্জামান রানু, সাধারণ সম্পাদক সাইদুল করিম মিন্টু, সিনিয়র সহসভাপতি মো. আব্দুল বাকী, সহসভাপতি মো. আনিচুর রহমান, জগদীশ চন্দ্র সাহা মন্টু, মো. আব্দুল আলীম, মো. শামছুর রহমান রেন্টু লস্কর, যুগ্মসাধারণ সম্পাদক মো. আলমগীর কবির, সহসাধারণ সম্পাদক খন্দকার মো. সানোয়ার হোসেন, কোষাধ্যক্ষ মো. ইকরাম হোসেন কিকু, সাংগঠনিক সম্পাদক শান্তি কুমার দে দাস, সড়ক সম্পাদক মো. ওহিদুল আলম খাঁন খোকন, ভ্রমণ ও কল্যাণ সম্পাদক মহিউদ্দীন বকুল, দফতর সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম, ধর্ম সম্পাদক সোহরাব হোসেন, নির্বাহী সদস্য তাহাজ উদ্দীন, আলীউল হক মণ্ডল ও মিজানুর রহমান।

এদিকে হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে মঙ্গলবার জেলায় সকাল-সন্ধ্যা হরতালের ডাক দিয়েছে জেলা শ্রমিক ঐক্য পরিষদ। সোমবার দুপুর আড়াইটার দিকে শহরের চুয়াডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ডে জেলা বাস-মিনিবাস শ্রমিক ইউনিয়ন কার্যালয়ের সামনে নিহত শ্রমিক নেতার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে তার লাশ নিয়ে শহরে বিক্ষোভ মিছিল বের করে শ্রমিকরা। মিছিলটি শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে পোস্টঅফিস মোড়ে গিয়ে শেষ হয়। মিছিলে শ শ নেতাকর্মী গাফফার হত্যাকারীদের ফাঁসির দাবিতে স্লোগান দেন। পরে পায়রা চত্বরে এক সমাবেশে জেলা শ্রমিক ঐক্য পরিষদের সভাপতি হবিবুর রহমান হবু ও শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি উজ্জ্বল বিশ্বাস বক্তব্য রাখেন।

সমাবেশে বক্তারা বলেন, আবদুল গাফফার বিশ্বাসের খুনিরা গ্রেফতার না হওয়া পর্যন্ত ঝিনাইদহের ওপর দিয়ে কোনো যানবাহর চলাচল করতে দেয়া হবে। এছাড়া আগামীকাল মঙ্গলবার সকাল-সন্ধ্যা সর্বাত্মক হরতাল পালনের জন্য সব শ্রেণিপেশার মানুষের প্রতি আহ্বান জানান।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here