চুয়াডাঙ্গা বিএনপি নেতাদের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে মারামারি : অহিদুলসহ কমপক্ষে আহত ৬

 

ভেস্তে গেছে বৈঠক : আহ্বায়ক কমিটি গঠন অনিশ্চয়তার মধ্যে : লাঞ্ছিত হওয়ার প্রতিশোধ চুয়াডাঙ্গায় নেয়ার ঘোষণা

স্টাফ রিপোর্টার: চুয়াডাঙ্গা বিএনপির নেতৃবৃন্দর সাথে কেন্দ্রীয় নেতাদের বৈঠক হয়নি। মারামারি ধস্তাধস্তিতে ভেস্তে গেছে। কবে নাগাদ আহ্বায়ক কমিটি গঠন ও প্রকাশ করা হবে তা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। এ তথ্য জানিয়ে সংশ্লিষ্টরা বলেছে, গতকাল সোমবার পৌনে ১১টার দিকে ঢাকা নয়াপল্টনস্থ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে মহাসচিবের সম্মেলন কক্ষে মারপিটে আহত হয়েছেন চুয়াডাঙ্গা বিএনপির একাংশের সভাপতি কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য অহিদুল ইসলাম বিশ্বাসহ তার পক্ষের কয়েকজন নেতা।

চুয়াডাঙ্গা জেলা বিএনপির মেয়াদ পূর্ণ হয়েছে। উপজেলা নির্বাচনে চুয়াডাঙ্গার ভরাডুবির পর পরই বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া জেলা উপজেলা কমিটি ঢেলে সাজানোর বিশেষ উদ্যোগ নেন। তারই অংশ হিসেবে গতকাল সোমবার সকল ১০টায় চুয়াডাঙ্গা জেলা বিএনপি নেতৃবৃন্দের সাথে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবসহ কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের বৈঠক আহ্বান করা হয়। এ বৈঠকের পর চেয়ারপারসনের গুলশানস্থ কার্যালয়ে দ্বিতীয় দফা বৈঠকে আহ্বায়ক কমিটি গঠন ও প্রকাশের কথা ছিলো। চুয়াডাঙ্গা বিএনপি দীর্ঘদিন ধরে বহুভাগে বিভক্ত হওয়ার কারণে নেতাকর্মী সমর্থকদের মধ্যে যখন হতাশায় চরমে তখন সংগঠনকে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগে নতুন করে আশায় বুক বাঁধেন তারা। এরই মাঝে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে মারামারি হট্টগোল হাতাহাতির খবর চুয়াডাঙ্গায় পৌঁছুনো মাত্রই বিরূপ সমালোচনার ঝড় ওঠে। নিভে যায় কর্মী-সমর্থকদের আশার আলো।

ঘটনার সময় উপস্থিত একাধিক নেতাকর্মীর বরাত দিয়ে আমাদের ঢাকাস্থ প্রতিনিধি জানিয়েছেন, সকাল ৯টা বাজতে না বাজতে চুয়াডাঙ্গার নেতৃবৃন্দের অনেকেই ঢাকা নয়াপল্টন্থ কার্যালয়ের সামনে হাজির হতে থাকেন। ১০টার দিকে চুয়াডাঙ্গা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক চেয়ারপারসনের অন্যতম উপদেষ্টা সাবেক সংসদ সদস্য শামসুজ্জামান দুদু কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে কৃষকদলের ৪র্থ তলার নিজ কার্যালয়ে গিয়ে বসেন। সেখানে অনেকেই হাজির হন। অপরদিকে চুয়াডাঙ্গা জেলা বিএনপির পাল্টা কমিটি একাংশের সভাপতি কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মুহা. অহিদুল ইসলাম বিশ্বাস, নতিপোতা ইউপি চেয়ারম্যান মনিরুজ্জামান, জীবননগর পৌর মেয়র হাজি নওয়াব আলী, ভাংবাড়িয়া ইউপি চেয়ারম্যান সানোয়ার হোসেনে লাড্ডুসহ অনেকেই বৈঠক স্থলে প্রবেশ করেন। তারা একদিকে বসলেও অপরদিকে বসেন জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ওয়াহেদুজ্জামান বুলা, দফতর সম্পাদক অ্যাড. আ.স.ম আব্দুর রউফ, জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক সরদার আলী হোসেনসহ অনেকে। মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মধ্যে জেলা বিএনপির অর্থবিষয়ক সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলমও যেমন বৈঠকে তার কয়েকজন অনুসারী নিয়ে হাজির হন, তেমনই বিএনপি নেতা লে. কর্নেল (অব.) সৈয়দ কামরুজ্জামানও বৈঠকস্থলে উপস্থিত হন। কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য তেমন কেউ সেখানে তখনো হাজির হননি। তবে খুলনা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ঝিনাইদহের সাবেক সংসদ সদস্য মশিউর রহমান, সালাউদ্দীনসহ কয়েকজন সবে হাজির হন। এরই মাঝে চুয়াডাঙ্গা নেতৃবৃন্দের মধ্যে একে অপরপক্ষকে আক্রমণ করে টুকটাক বক্তব্য দিতে শুরু করেন। একপর্যায়ে যুবদল নেতা শরিফুজ্জামান শরিফ বক্তব্য দিতে গিয়ে শামসুজ্জামান দুদু ও তার ভাই ওয়াহিদুজ্জামান বুলাকে কটাক্ষ করে আক্রমণাত্মক বক্তব্য শুরু করেন। একপর্যায়ে অহিদুল ইসলাম বিশ্বাস দাঁড়িয়ে তার বক্তব্যকে সমর্থন করতে গেলে উত্তেজনা চরমে রূপ নেয়। সম্মেলনে কক্ষভর্তি নেতাকর্মীদের মধ্যে ধস্তাধস্তি হাতহাতি হতে থাকে। চেয়ার তুলে অহিদুল ইসলাম বিশ্বাসকে আঘাতের পর আঘাত করা হয়। টেনেহেঁচড়ে তার পাশে থাকা নেতাদের পাঞ্জাবি জামা ছিঁড়ে দেয়া হয়। পরিস্থিতি বেসামাল হয়ে ওঠে। সিঁড়ির মধ্য নতিপোতা ইউপি চেয়ারম্যান যুবদল নেতা মনিরুজ্জামানকে জামা ছিঁড়ে লাঞ্ছিত করা হয়। একপর্যায়ে অহিদুল ইসলাম বিশ্বাস ও তার সাথে থাকা নেতৃবৃন্দ কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে বের হন। তারা চুয়াডাঙ্গায় ফিরে এর বদলা নেয়া হবে বলে চিৎকার দিয়ে জানান। দৃশ্য দেখে পথচারীদের চোখ ছানাবড়া হয়। দুপুরের দিকে কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে জানানো হয়, বৈঠক স্থগিত। পরবর্তীতে বৈঠকের দিন নির্ধারণ করা হবে। ২৫ এপ্রিল বৈঠকের দিন প্রাথমিকভাবে জানানো হতে পারে।

কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে নেতৃবৃন্দের মারামারির বিষয়ে চুয়াডাঙ্গা জেলা বিএনপির সভাপতি সাবেক সংসদ সদস্য হাজি মো. মোজাম্মেল হক ও সাধালণ সম্পাদক সাবেক সংসদ সদস্য শামসুজ্জামান দুদু কোনো মন্তব্য করেননি। তবে অহিদুল ইসলাম বিশ্বাস ঘটনাকে সাজানো বলে মন্তব্য করে বলেছেন, কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এমন নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টি ভাবাই যায় না। ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি। বিষয়টি বিস্তারিতভাবে কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দকে জানানো হবে।

উল্লেখ্য, চুয়াডাঙ্গা জেলা বিএনপি বহুভাগে বিভক্ত। জেলা বিএনপির সভাপতি হাজি মো. মোজাম্মেল হক চুয়াডাঙ্গা-২ আসনে একাধীকবার সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচত হয়েছেন। তিনি জনবিচ্ছিন্ন নেতা হিসেবে দলীয় নেতাকর্মীদের মাঝ থেকে অভিযোগ উত্থাপনের এক পর্যায়ে মনোনয়ন থেকেও বঞ্চিত হন। চুয়াডাঙ্গা-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য কেন্দ্রীয় নেতা শামসুজ্জামান দুদু পরবর্তীতে কয়েক দফা মনোনয়ন বঞ্চিত হলে সর্বশেষ কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া চুয়াডাঙ্গা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব নেন। এ কমিটি চোরাই বলে অভিযোগ তুলে পাল্টা কমিটি গঠন করেন কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মুহা. অহিদুল ইসলাম বিশ্বাস। তিনি জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক প্রয়াত সংসদ সদস্য শহিদুল ইসলাম বিশ্বাসের সহোদর। ২০০৮ সালের নির্বাচনে চুয়াডাঙ্গা-১ আসনে বিএনপি মনোনিত প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। পরাজিত হন। পরবর্তীতে দলের নেতৃত্ব নিয়ে সংগ্রাম অব্যাহত রেখেছেন। এরই মাঝে চুয়াডাঙ্গা-১ আসনে মনোনয়ন প্রত্যাশীদের তালিকায় উঠে আসেন জেলা বিএনপির অর্থবিষয়ক সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম। তিনি দলের মধ্যে তৃতীয় ধারা গড়ে তোলেন। একপর্যায়ে তার সাথে থাকা জেলা বিএনপির বেশ কয়েকজন নেতা লে. কর্নেল (অব.) সৈয়দ কামরুজ্জামানের পাশে দাঁড়িয়ে তাকে লাইমলাইটে তোলার চেষ্টা করছেন। অপরদিকে চুয়াডাঙ্গা-২ আসনে কেন্দ্রীয় যুবদলের শিল্প ও বাণিজ্য বিষয়ক সম্পাদক তরুণ শিল্পপতি মাহমুদ হাসান খাঁন বাবু দলের নেতাকর্মীদের সাথে নিয়ে দলের কান্ডারি হয়ে উঠেছেন। হাজি মো. মোজাম্মেল হক শারীরিকভাবে অসুস্থতার কারণে কিছুটা পিছিয়ে পড়লেও তার ছোট ছেলেকে সামনে আনার প্রক্রিয়ায় মাঝে মাঝে জোর দেন। এছাড়া মুহা. অহিদুল ইসলাম বিশ্বাসের গঠিত কমিটির জেলা সহসভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে ইঞ্জিনিয়ার মোখলেসুর রহমান তরফদার টিপুও চুয়াডাঙ্গা-২ আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে শক্ত অবস্থান গড়ে তোলার চেষ্টায় রয়েছেন। অবশ্য ১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জোরদার আন্দোলনে মনোনয়ন প্রত্যাশী এসব নেতাদের তেমন কাউকেই মাঠে দেখা যায়নি। সাধারণ নেতাকর্মীদের মধ্যে বেড়েছে হতাশা। যদিও অনেকেই বলেছেন, বহুভাগে বিক্ত এবং মনোনয়ন প্রত্যাশীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া মাঝে মাঝে টাকার খেলা শুরু হয়। সেদিক থেকে তৃণমূল পর্যায়ে নেতাদের অনেকে সুবিধাই পাচ্ছেন। সর্ব শেষ উপজেলা নির্বাচনে ৪টি উপজেলার একটিও রক্ষা করতে পারেনি বিএনপি। দামুড়হুদা উপজেলা নির্বাচনে একাধীক প্রার্থীর প্রচারণার সুযোগ নিয়েছে তাদেরই শরীক জামায়াতে ইসলামী। ‌জীবননগর, চুয়াডাঙ্গা সদর ও আলমডাঙ্গা উপজেলা নির্বাচনে ক্ষমতাসীনদল শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট ডাকাতি করেছে বলে অভিযোগ। এসব চিত্র অবলকনেই হতো বিএনপির চেয়ারপারসনের টনক নড়েছে। নটক নড়লেও তিনি তার দলের নেতাদের কাণ্ড দেখে এখন কি করবেন? চুয়াডাঙ্গার সাধারণ কর্মী-সমর্থকরা মূলত তা দেখার জন্যই গুনছেন অপেক্ষার প্রহর।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *