চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুরে জাতীয় আইনগত সহায়তা দিবস উদযাপিত

 

 

গরিবের মামলার ভারবহন করে সরকার

রফিকুল ইসলাম/ইসলাম রকিব:‘গরিবের মামলার ভার,বহন করে সরকার’এ প্রতিপাদ্য বিষয়কে সামনে রেখে চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুরে আইনগত সহায়তা কমিটির আয়োজনে জাতীয় আইনগত সহায়তা দিবস-২০১৪ উদযাপিত হয়েছে।

এ দিবস উপলক্ষে গতকাল সোমবার সকাল ৯টায় চুয়াডাঙ্গা কোর্ট চত্বর থেকে বর্ণাঢ্য র‌্যালি বের হয়ে শহর প্রদক্ষিণ করে পুনরায় চুয়াডাঙ্গা আইনজীবী সমিতি মিলনায়তনে এসে শেষ হয়। সেখানে জাক-জমকপূর্ণ পরিবেশে কমিটির চেয়ারম্যান বিজ্ঞ সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ বিপ্লব গোস্বামীর সভাপতিত্বে আলোচনাসভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসক মো. দেলোয়ার হোসাইন। বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন চুয়াডাঙ্গা পুলিশ সুপার রশীদুল হাসান। এছাড়া প্রতিপাদ্য বিষয়ের আলোকে বক্তব্য রাখেন আইনগত সহায়তা দিবস উদযাপন কমিটির সভাপতি বিজ্ঞ অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ (প্রথম আদালত) মো. নাজির আহমেদ,অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ (দ্বিতীয় আদালত) গোলক চন্দ্র বিশ্বাস, চুয়াডাঙ্গা পৌর মেয়র রিয়াজুল ইসলাম জোয়ার্দ্দার টোটন,যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ (প্রথম আদালত) মো. ইয়ারব হোসেন, যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ (দ্বিতীয় আদালত) মো. আব্দুর রহিম, বিজ্ঞ চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মমতাজ পারভীন, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আনজুমান আরা,সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট শেখ মোহা. আমীনুল ইসলাম, সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. তৈয়ব আলী, সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. আব্দুল হালিম, সহকারী জজ মো. সাজেদুর রহমান, জেল সুপার আনোয়ারুজ্জামান, জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাড. এমএম শাহজাহান মুকুল,সাধারণ সম্পাদক অ্যাড. সাঈদ মাহমুদ শামীম রেজা ডালিম, বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা জেলা কমিটির সভাপতি অ্যাড. সেলিম উদ্দীন খান, চুয়াডাঙ্গা ওয়েভ ফাউন্ডেশনের সহকারী কো-অর্ডিনেটর নুঝাত পারভীন ও জেলা ব্র্যাক প্রতিনিধি জাহাঙ্গীর আলম। আলোচনা অনুষ্ঠানের শুরুতে আইনগত সহায়তা গ্রহণকারী রুবা খাতুন নামের এক নারী তার আইন সহায়তা পাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরলেও এ বছর কতোগুলো মানুষ সরকারিভাবে আইন সহায়তা লাভ করেছেন তা জানা যায়নি।

আলোচনা অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসক মো. দেলোয়ার হোসাইন বলেন,সরকার দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আইনি সহায়তা দেয়ার জন্য সব সময় প্রস্তুত আছে। কিন্তু যারা প্রকৃত আইনি সহায়তা পাওয়ার যোগ্য তাদের দোরগোড়ায় এ সুবিধার কথা পৌঁছে দিতে না পারলে তার সফল বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। সরকারের একার পক্ষে সঠিকভাবে এ কার্যক্রমকে সফল করা কঠিন। তৃণমূল পর্যায়ে বিচারপ্রার্থী মানুষের কাছে আইনগত সহায়তার এ বারতা পৌঁছে দিতে হবে। সেইসাথে আইনজীবীদের প্রতি আমি আহ্বান রাখবো, আইনগত সহায়তার নামে শুধু ওকালতি ফি মওকুফ করাটাই যথেষ্ট নয়,তাদেরকে আন্তরিকভাবে আইনি সহায়তার ব্যাপারে সচেষ্ট থাকতে হবে। কখন কোথায় কীভাবে আইনি সহায়তা পাওয়া যায় তা জানানোর পাশাপাশি প্রচার-প্রচারণা ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে সভা- কমিউনিটি পদ্ধতির মাধ্যমে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে জানান দিতে হবে।

বিশেষ অতিথির গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্যে চুয়াডাঙ্গা পুলিশ সুপার রশীদুল হাসান বলেন,শুধু অর্থ দিয়ে পুরোপুরি আইনি সহায়তা নিশ্চিত করা যায় না। এর জন্য প্রয়োজন মানসিকভাবে নিজেকে সমাজের একজন নীতিবান ও আদর্শ পরায়ণ ব্যক্তি হিসেবে বিচারপ্রার্থী জনগণের পাশে দাঁড়িয়ে আইনি সহায়তা পাওয়ার সু-ব্যবস্থা করতে হবে।তিনি আরো বলেন,আইনি সহায়তার ক্ষেত্রে পুলিশের কার্যক্রম পরিচালিত হয় ফৌজদারি নিয়মে। কিন্তু আমাদের নিকট যেসবমামলা আসে তার অধিকাংশই পারিবারিক ও জমিজমা সংক্রান্ত। ফৌজদারি নিয়মে এর সমাধান দিতে গেলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভিক্টিমকে আরো বিপদে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তার পরও যতোটা সম্ভব তাদেরকে এলাকায় গিয়ে কাউন্সিলিঙের মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের পরামর্শ দেয়া হয়ে থাকে। হয়তো প্রকৃতপক্ষে সরকারিভাবে যে আইনি সহায়তা দেয়া হয়ে থাকে সে বিষয়ে অজানা থাকার কারণে ভুক্তভোগী জনগণ পুলিশের নিকট ছুটে আসে। তিনি সমাজের মানুষ হিসেবে অন্তত প্রতিমাসে একজন করে ভিক্টিমকে ফ্রি আইনি সহায়তা প্রদানের জন্য আইনজীবীদের প্রতি আহ্বান জানান। শুধু অর্থ দিয়ে নয়,আইনি সহায়তা দেয়ার জন্য মানসিকভাবেও আইনজীবীদের প্রস্তুত থাকতে হবে।

আলোচনা অনুষ্ঠানের সভাপতি বিজ্ঞ সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ বিপ্লব গোস্বামী বলেন, জেলা আইনগত সহায়তা কমিটির সভাপতি হিসেবে আমার জবাবদিহিতা সর্বাগ্রে বলে আমি মনে করি। আইনগত সহায়তা নিশ্চিত করার সিংহভাগ দায়িত্ব আমার ওপরই বর্তায়। আমি আজ সকলের সামনে খোলা মন নিয়ে বলছি, আইনগত সহায়তার জন্য দুস্থ,অসহায়,দরিদ্র,দুস্থ মুক্তিযোদ্ধাসহ সমাজের অবহেলিত জনগণের জন্য আমার দুয়ার খোলা থাকবে। প্রকৃত ভুক্তভোগীদের আইনি সহায়তা দানে কেই বাধা দিলে বা বাধা দিতে চাইলে আমি তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবো। গায়ের জোরে বা অর্থ দিয়ে প্রকৃত আইনি সহায়তা করা যায় না। এ জন্য প্রয়োজন মাইন্ড সেটাপ। আর শুধু এ দিবসে আমরা দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে যেন আইনি সহায়তা দেয়ার কথা উল্লেখ না করে সারা বছরই যেন এ জনগোষ্ঠীর পাশে থাকতে পারি সে মন-মানসিকতা তৈরি করতে হবে।

আলোচনা অনুষ্ঠানের শেষ দিকে চুয়াডাঙ্গা ভি.জে স্কুল মাঠ(চাঁদমারী) রক্ষা কমিটির অন্যতম সদস্য ভি.জে স্কুলের সাবেক প্রধান শিক্ষক আব্দুল মোত্তালিব সভাপতির অনুমতি নিয়ে মাঠ রক্ষার বিষয়ে দু-দফা মামলা-মকদ্দামা হলেও মাঠ রক্ষার জন্য সরকারি বা বেসরকারি কোনো মহল জোরালো ভূমিকা রাখেনি বলে ক্ষোভ প্রকাশ করে বক্তব্য রাখেন।

সভাপতির সমাপনী বক্তব্যের পূর্বে কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ অ্যাড. আফরোজা আক্তারকে শ্রেষ্ঠ প্যানেল আইনজীবীর পুরস্কার হাতে তুলে দেয়া হয়। পুরস্কার তুলে দেন প্রধান অতিথি জেলা প্রশাসক মো. দেলোয়ার হোসাইন ও সভাপতি সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ বিপ্লব গোস্বামী। অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন সহকারী জজ সাজেদুর রহমান। শেষে স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচির উদ্বোধন করেন অতিথিগণ। জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাড. সাঈদ মাহমুদ শামীম রেজা ডালিম প্রথম রক্তদান করেন।

মেহেরপুর অফিস জানিয়েছে, জাতীয় আইনগত সহায়তা দিবস উপলক্ষে মেহেরপুরে র‌্যালি করেছে জেলা আইনগত সহায়তা কমিটি। মেহেরপুর দারিদ্র্য বিমোচন সংস্থা,মানব উন্নয়ন কেন্দ্র ও খান ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় গতকাল সোমবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে শহীদ ড. সামসুজ্জোহা পার্ক থেকে র‌্যালিটি শুরু হয়ে জেলা শহরের প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে জেলা জজ আদালত চত্বরে গিয়ে শেষ হয়। র‌্যালির নেতৃত্বে ছিলেন মেহেরপুর সাব জজ-১ আব্দুল হামিদ। র‌্যালিতে অন্যান্যের মধ্যে সিনিয়র জুড়িসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মহিবুল ইসলাম,সিনিয়র যুগ্ম জজ মো. সাইফুজ্জামান,জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মতিউর রহমান,জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার ফারুক ইকবাল,অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোস্তাফিজুর রহমান,সহকারী পুলিশ সুপার আব্দুল জলিল,জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাড. জাহাঙ্গীর হোসেন,সাধারণ সম্পাদক অ্যাড. কামরুল হাসান,সাবেক সভাপতি অ্যাড. পল্লব ভট্টাচার্য,প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশগ্রহণ করেন।

বিকেলে মেহেরপুর জেলা জজ আদালত মিলনায়তনে আইনগত সহায়তা দিবসের আলোচনাসভায় সভাপতিত্ব করেন জেলা আইনগত সহায়তা কমিটির সভাপতি জেলা ও দায়রা জজ ডিএম নূর মোহাম্মদ মোড়ল।উপস্থিত ছিলেন সিনিয়র জুড়িসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মহিবুল ইসলাম,সিনিয়র যুগ্ম জজ মো. সাইফুজ্জামান,জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাড. জাহাঙ্গীর হোসেন, সাধারণ সম্পাদক অ্যাড. কামরুল হাসান,অ্যাড. কাজী শহিদুল ইসলাম,অ্যাড. মেহেরুন নেছা মনি প্রমুখ।

Leave a comment

Your email address will not be published.