চুয়াডাঙ্গায় ডায়রিয়ার প্রাদুর্ভাব পরিস্থিতি অপরিবর্তিত : ৭২ ঘণ্টায় আক্রান্ত ৩২৮

 

রোগী সামলাতে চিকিৎসক সেবিকাদের নাভিশ্বাস : রোগীর লোকজনের হুড়োহুড়িতে বিশৃঙ্খলা

স্টাফ রিপোর্টার: চুয়াডাঙ্গায় ডায়রিয়া প্রাদুর্ভাব পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। গতকালও ১শ ৩০ জন ডায়রিয়া আক্রান্ত রোগী সদর হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এ দিয়ে ৭২ ঘণ্টায় ডায়রিয়া আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩শ ২৮ জন। গত দুদিনে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর মধ্যে ১৮ জন মহিলা ও ১৫ জন পুরুষ রোগী চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরেছেন। গতরাত ২টায় ডায়রিয়া আক্রান্ত নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। কর্তব্যরত চিকিৎসক বলেছেন, রোগী বেড়েই চলেছে।

গতকাল সোমবার চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে ডায়রিয়া আক্রান্ত ভর্তি রোগীর মধ্যে বাগানপাড়ার ৪২ জন, মসজিদপাড়ার ২৩ জন, জিনতলাপড়ার ১৮ জন, মাঝেরপাড়র ১৭ জন ও চুয়াডাঙ্গা পৌরসভার অন্যান্য এলাকার ২১ জন রোগী রয়েছে। ১৪ জন রোগী চুয়াডাঙ্গা জেলার বিভিন্ন গ্রামের।

ডায়রিয়া আক্রান্ত হয়ে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে ভর্তি রোগীর অধিকাংশই চুয়াডাঙ্গা পৌর এলাকার বাগানপাড়া, মসজিদপাড়া ও মাঝেরপাড়ার। উপচেপড়া রোগী সামলাতে সেবিকা ও চিকিৎসকদেরই শুধু হিমসিম খেতে হচ্ছে না, রোগীর লোকজনের হুড়োহুড়িতে রোগীদের জন্য জীবনরক্ষাকারী কলেরা স্যালাইনসহ ওষুধপথ্য প্রদানেও চরম বিশৃঙ্খলা ফুটে উঠছে। স্যালাইন কেউ পাচ্ছে কেউ পাচ্ছে না। গতকাল অনেকেরই বাইরে থেকে স্যালাইনসহ ডায়রিয়া রোগের ওষুধ কিনতে হয়েছে। অথচ নিখরচায় সরবরাহের জন্য কলেরা স্যালাইনসহ প্রয়োজনীয় ওষুধপথ্য হাসপাতালেই রয়েছে পর্যাপ্ত। মাত্রাতিরিক্ত রোগী ও রোগীর লোকজনের অস্বাভাবিক ভিড় এবং হুড়োহুড়ির কারণেই বিশৃঙ্খলা ফুটে উঠছে। কেউ চিকিৎসা পাচ্ছে কেউ পাচ্ছে না। পরিস্থিতি সামলাতে গতকাল ৮জন সেবিকা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে সদর হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। ৪ জন স্বেচ্চাসেবকও দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া হাসপাতালের সকল বিভাগের সকল সেবিকা ও চিকিৎসককে ডায়রিয়া রোগীদের চিকিৎসা প্রদানে বাড়তি দায়িত্ব পালনের অনুরোধ জানানো হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখতে গতকাল থেকে হাসপাতালে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। পরিস্থিতি অপরিবর্তিত থাকলে আজ সোমবার মেডিকেল দল গঠন করে রোগীদের চিকিৎসা প্রদান করা হবে। সংশ্লিষ্ট এলাকাতেও মেডিকেল দল প্রেরণের প্রাথমিক প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। গতকাল থেকে পৌরসভার পক্ষ থেকে ইসলামপাড়া, বাগানপাড়া, মাঝেরপাড়া ও মসজিদপাড়ার প্রায় প্রতিটি বাড়িতে পানীয় পানি বিশুদ্ধ করার জন্য পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট সরবরাহ করা হয়েছে। এছাড়াও চুয়াডাঙ্গা পৌর এলাকায় ডায়রিয়া সম্পর্কিত পৌরসভা বিবৃতি দিয়ে পৌর নাগরিকদের বাড়তি সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বান জানানো হয়েছে।

চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে ৭২ ঘণ্টায় ডায়রিয়া আক্রান্ত ৩১৮ রোগী ভর্তি অতীতের সকল রেকর্ড ভেঙেছে। কেন ডায়রিয়ার ভয়াবহ প্রকোপ? চুয়াডাঙ্গা স্বাস্থ্য বিভাগ সংশ্লিষ্ট এলাকার পানি সংগ্রহ করে মহামারী রোগ প্রতিরোধ কেন্দ্রে প্রেরণ করা হয়েছে। রিপোর্ট পেতে তিনদিন সময় লাগতে পারে। এলাকায় রাসায়নিক কোনো কারখানার বজ্র্য থেকে ডায়রিয়ার জীবাণু ছড়াচ্ছে কি-না তাও ক্ষতিয়ে দেখা হচ্ছে। এছাড়া ঈদের পূর্ব দিন ও ঈদের দিন যেখানে সেখানে পশু জবাইয়ের কুপ্রভাব কি-না তা নিয়েও দুশ্চিন্তায় পড়েছেন স্বাস্থ্য সচেতন অনেকে। যদিও সংশ্লিষ্ট এলাকার সাধারণ মানুষের অভিযোগ, পৌর সরবরাহকৃত পানির মাধ্যমেই ডায়রিয়ার প্রকোপ ছড়িয়েছে।

অপরদিকে চুয়াডাঙ্গা পৌরসভা পৌর এলাকায় ডায়রিয়া সম্পর্কিত বিবৃতি দিয়েছে। পৌরমেয়র রিয়াজুল ইসলাম জোয়ার্দ্দার স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, চুয়াডাঙ্গা পৌর এলাকার মসজিদপাড়া, জিনতলাপাড়া, মাঝেরপাড়া এলাকায় ডায়রিয়া আক্রান্ত রোগী চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। যেহেতু ডায়রিয়া একটি পানি ও খাবারবাহিত রোগ সেহেতু জনমনে পৌরসভা কর্তৃক সবরাহকৃত পানি নিয়ে বিভ্রান্তকর অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে পৌরসভা কর্তৃক সবরাহকৃত পানি ৯টি উৎপাদক নূলকূপের মাধ্যমে সরবরাহ করা হয়। যা একে অন্যের সাথে জালের মতো সম্পর্কযুক্ত। ফলে সকল এলাকায় পানির চাপ সমান থাকে। পৌরসভার পানির মাধ্যমে ডায়রিয়া জীবাণু বিস্তার ঘটলে কোনো একটি এলাকায় বিস্তার না ঘটে সকল এলাকায় এর প্রাদুর্ভাব দেখা দিতো। কিন্তু তেমনটি ঘটেনি। ডায়রিয়া বিস্তার পানি ছাড়াও অন্য উপায়ে ঘটতে পারে। যেমন খাদ্যে বিষক্রিয়া, বাসি ও পচা খাবার গ্রহণ ইত্যাদি। পৌর কর্তৃপক্ষ বিশ্বাস করে সংক্রমিত এলাকায় পানির মাধ্যমে নয়, বরং অন্য কোনো উপায়ে ডায়রিয়া বিস্তার ঘটতে পারে। তদুপরি পৌর কর্তৃপক্ষ বাড়তি সতর্কতা হিসেবে ইতোমধ্যেই সবরাহকৃত সমস্ত পানির ট্যাঙ্ক ও লাইন জীবাণুনাশক দিয়ে জীবাণুমুক্ত সম্পন্ন করেছে। আক্রান্ত এলাকায় স্যালাইন ও পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট সরবরাহ করার কাজ অব্যাহত রয়েছে। ফলে বিভ্রান্ত না হওয়ার জন্য অনুরোধ জানানো যাচ্ছে। এছাড়া পরামর্শ দিয়ে বলা হয়েছে, পানি ফুটিয়ে বা পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট দিয়ে পানি বিশুদ্ধ করে পান করুন। বাসিপচা খাবার খাওয়া থেকে বিরত থাকুন, খাওয়ার আগে ও মলত্যাগের পরে দু হাত সাবান বা ছাই দিয়ে ভালো করে ধুয়ে নিন। আপনার নিজ নিজ পানির রিজার্ভ ট্যাঙ্ক নিয়মিত পরিষ্কার করুন। পানির লাইন লিকেজ থাকলে সাথে সাথে পৌর কর্তৃপক্ষকে অবহিত করুন, খাবার সর্বদা ঢেকে রাখুন এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বাড়ির আঙিনা পরিষ্কার রাখুন।

ডায়রিয়া রোগীদের চিকিৎসা পরিস্থিতি দেখতে গতকাল সকাল ১০টার দিকে চুয়াডাঙ্গা-১ আসনের সংসদ সদস্য জাতীয় সংসদের হুইপ বীর মুক্তিযোদ্ধা সোলায়মান হক জোয়ার্দ্দার ছেলুন, চুয়াডাঙ্গা পৌর মেয়র রিয়াজুল ইসলাম জোয়ার্দ্দার টোটন হাসপাতাল পরিদর্শন করেন। হুইপ চিকিৎসকদের সাথে কথা বলেন। সঠিকভাবে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়ে বলেন, একজন রোগীও যেনো চিকিৎসা বঞ্চিত না হয় সেদিকে নজর রাখুন। পৌর মেয়রও অভিন্ন আহ্বান জানান। তিনি বেশ কয়েকজন রোগীর সাথেও কথা বলে চিকিৎসা সম্পর্কে তথ্য নেন। দুপুর ১টার দিকে চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসক মো. দেলোয়ার হোসাইন হাসপাতাল পরিদর্শন করেন। তিনি চিকিৎসকদের সাথে কথা বলার পাশাপাশি ডায়রিয়া প্রাদুর্ভাবের কারণ শনাক্ত করারও অনুরোধ জানিয়ে সুচিকিৎসা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে জেলা প্রশাসনের সর্বাত্মক সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দেন। এ সময় চিকিৎসকদের তরফে জানানো হয়, চিকিৎসার সবই হাসপাতালে রয়েছে। শুধু সংকট লোকবল। দেড়টার দিকে হাসপাতাল পরিদর্শন করেন পুলিশ সুপার রশীদুল হাসান। সাথে ছিলেন সহকারী পুলিশ সুপার কামরুজ্জামান। পুলিশ সুপার হাসপাতালের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে সিভিল সার্জনসহ চিকিৎসকদের সাথে পর্যালোচনা করেন। পরে তিনি হাসপাতালে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেন।

চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীর মধ্যে বাগানপাড়ার সজল চৌধুরীর স্ত্রী বাবলী খাতুনের (৩০) অবস্থা গতকাল সন্ধ্যায় সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে। সিভিল সার্জনসহ সকল চিকিৎসক বাবলীকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। অবস্থা আশঙ্কাজনক হয়ে পড়ায় তাকে রাজশাহী মেডিকেল অথবা ঢাকায় নেয়ার পরামর্শ দেয়া হয়। অবশ্য রাতে বাবলীর শারীরিক অবস্থা উন্নতির দিকে গেলে তাকে হাসপাতালেই রাখা হয়। মাত্রাতিরিক্ত স্যালাইনের কারণেই এমনটি হয়ে থাকতে পারে বলেও মন্তব্য করেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক চিকিৎসক। বাবলীকে গতকাল সকালেই হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ২৫টির অধিক স্যালাইন দেয়া হয়েছে বলে জানা যায়। জিনতলাপাড়ার হাবিবুর রহমানের মেয়ে রুমারও শরীরে অতিরিক্ত স্যালাইন পুশ করার বিষয়টি জেনেছেন চিকিৎসকেরা। কেন এমন হচ্ছে? মাত্রাতিরিক্ত রোগীর চাপে নার্স, স্টাফ নার্সদের ওপর অনেকেই ভরসা করছেন না, রোগীর লোকজনদের অনেকেই নিজে জোর করে স্যালাইন নিয়ে রোগীর শরীরে নিজেরাই পুশ করছেন। আবার অনেকে দীর্ঘ সময় ধরে সেবিকার কাছে ধর্ণা দিয়েও একটি স্যালাইন না পেয়ে বাইরে থেকে কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। অনেকেই গতকাল খাবার স্যালাইন ও কলেরা স্যালাইন বাইরে থেকে কিনে রোগীকে দিয়েছেন। এ সুযোগে ৫ টাকার ওর সেলাইনের দাম হাসপাতাল এলাকায় ৮ টাকা হয়ে গেছে।

চুয়াডাঙ্গা মসজিদপাড়ার হাবিবুর রহমান সাদিদ নিজ উদ্যোগে ডায়রিয়া আক্রান্ত এলাকায় বিশুদ্ধ পানীয় পানি সরবরাহ করছেন। বাগানপাড়া, মসজিদপাড়া ও মাঝেরপাড়ায় গতকাল তিনি তিনশ লিটার পানীয় পানি সরবরাহ করেছেন। একই সাথে তিনি হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের জন্য ১শ লিটার বিশুদ্ধ পানীয় পানি প্রদান করেছেন। ওই পানিতে স্যালাইন গুলিয়ে রোগীদের মাঝে বিতরণ করা হচ্ছে। হাবিবুর রহমান সাদিদ বলেছেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট এলাকায় বিনামূল্যে অমিয় পানি সরবরাহ করা হবে।

Leave a comment

Your email address will not be published.