চুয়াডাঙ্গার কালুপোল ঐতিহাসিক রাজার ভিটার নিদর্শন আবিষ্কারের কাজ চলছে দ্রুতগতিতে

 

বেরিয়ে আসছে প্রাক মুসলিম সুলতানি আমলের হরেক রকম নিদর্শন

নজরুল ইসলাম: বাংলাদেশ অত্যান্ত গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্যের অধিকারী। আড়াই হাজার বছরের অধিক সময়ে এদেশে বিভিন্ন জনগোষ্ঠী, শাসক শ্রেণি গড়ে তোলে অসংখ্য ইমারত, নগর, প্রাসাদ, দুর্গ, মন্দির, মসজিদ, বিহার স্তূপ ও সমাধি সৌধ। আর এ সমস্ত ইমারতগুলো গড়ে ওঠে নদীর অববাহিকায়। এসব ঐতিহ্যের অধিকাংশই কালের গর্ভে বিলীন হলেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সংস্কৃতি চিহ্ন এদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে আজো টিকে আছে যা প্রত্নতাত্ত্বিক  নিদর্শন হিসেবে সমধিক পরিচিত। এসব প্রত্ননিদর্শনের অনুসন্ধান, খনন, সংরক্ষণ, প্রদর্শন এবং গবেষণার মাধ্যমে ইতিহাস পুনরুদ্ধারের কাজে প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতর কাজ করে যাচ্ছেন। তারই ধারাবাহিকতায় চুয়াডাঙ্গা সদরের কালুপোল গ্রামের শেষ প্রান্তে চিত্রানদীর তীরে গুপ্ত হওয়া গন্ধপ রাজার রাজ প্রাসাদ (ভিটা) আবিষ্কারের কাজ চলছে দ্রুত গতিতে। যা এলাকার মানুষের কাজে রাজার ভিটা নামে পরিচিত। রাজার ভিটা আবিষ্কার হলে চুয়াডাঙ্গা জেলার মানচিত্রে নতুন নিদর্শনের স্বীকৃতিস্বরূপ একটি ঐতিহাসিক নাম সংযুক্ত হবে। সংরক্ষণ করা গেলে একদিন পর্যটনকেন্দ্র হিসাবে সমাদৃত হবে এ রাজার ভিটা। তাই কালুপোল রাজার ভিটাটি পূরাকৃত্তি ঘোষণা হোক এটাই জেলাবাসীর প্রাণের দাবি।

প্রাপ্ত তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, সেন আমলে বাংলায় সংস্কৃত সাহিত্যের বিকাশ ঘটে। সেন রাজাদের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় এবং কিছুটা তাদের দ্বারা সৃষ্ট আবহের কারণে সংস্কৃত ভাষায় সাহিত্যচর্চার সুস্পষ্ট বিকাশ লক্ষ্য করা যায়। এ কথা অবশ্যই স্বীকার্য যে, বারো শতকের সেন শাসনাধীন বাংলায় সংস্কৃত সাহিত্যের অভূতপূর্ব উন্নতি সাধিত হয়। এ যুগে শৈল্পিক কৃতিত্বের অপর ক্ষেত্র হচ্ছে ভাস্কর্য। সেনযুগে বাংলার ভাস্কর্য শিল্পের চরম উন্নতি ঘটে। বাংলার ভাস্কর্যের আঞ্চলিক বৈশিষ্ট ও স্বতন্ত্র ধারাও এ যুগে সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে।  সুলতানি শাসন তেরো শতকের সূচনালগ্নে (১২০৪-০৫) বাংলায় মুসলিম শাসনের সূত্রপাত হয়। তবে এর অনেক আগে থেকেই বাংলার সাথে আরব মুসলমানদের যোগাযোগ ছিলো। অবশ্য সে যোগাযোগের স্বরূপ ছিলো বাণিজ্যিক ও ধর্মীয় এবং তা উপকূলীয় অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ ছিলো। অধিকাংশ ইমারতগুলো গড়ে ওঠে নদীর অববাহিকায়। সে দিক বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় ভৈরব-কপোতাক্ষ নদ, বাংলাদেশ-ভারতের একটি আন্তঃসীমান্ত নদী। নদীটি ভারতের মুর্শিদাবাদ এবং বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মেহেরপুর ও চুয়াডাঙ্গা জেলার একটি নদী। পরবর্তীতে ভৈরব মেহেরপুরের পশ্চিম পাশ দিয়ে সুবলপুর গ্রামের কাছে মাথাভাঙ্গার সাথে মিলিত হয়েছে।

দর্শনা রেলস্টেশনের দক্ষিণ-পূর্ব কোণ থেকে ভৈরব নদী মাথাভাঙ্গা নদী থেকে বিচ্যুত হয়ে যশোরে প্রবেশ করে কোটচাঁদপুর পর্যন্ত পূর্ব দিকে প্রবাহিত হয়ে পরে দক্ষিণমুখী হয়েছে। ভৈরব একটি তীর্থ নদী হিসেবেও পরিচিত। বাংলাদেশে এক নামে একাধিক নদী থাকলেও ভৈরব নামে অপর কোন নদী নাই। ভৈরব নদীর রয়েছে একাদিক শাখা নদী। চিত্রানদী তারি একটি অংশ। সেন বংশের অবশানের পরই সুলতানি আমলের সূত্রপাত হয়। প্রত্নতাত্ত্বিক অধিদফতরের আঞ্চলিক কাস্টোডিয়ান গোলাম ফেরদৌস জানান, রাজার ভিটার উপরি ভাগে যে নমুনা পাওয়া গেছে তা সুলতানি আমলের। সে সময়কার নির্মাতারা নির্মাণকাজে যে ধরনের উপকরণ ব্যবহার করতেন যেমন ইট, সুরকি তারি নমুনা। গবেষণা হয়ে থাকে বিচ্ছিন্ন নানা উপকরণের উপর ভিত্তি করে। স্থানীয় গবেষণায় যেটা পাওয়া গেছে রাজা গন্ধব রায় চতুর দশ শতকের দিকে এখানে বসবাস করতেন। আর একটি বিষয় হলো খাজা মইনদ্দীন চিশতি ভৈরবের তীর ধরে খুলনা বাগেরহাটে যেতেন। সে সময় তার কিছু অনুসারী ছিলো। তাদের মধ্যে খাজা মালিক উল গাউস (রা.) অন্যতম। তার সাথে বিরোধের জের ধরেই রাজা গন্ধব রায়ের পতন হলে তিনি প্রাসাদ ছেড়ে চলে যান। জনশ্রুতি রয়েছে রাজা গন্ধপ রায় বিভিন্ন ধরনের গৃহপালিত পশু পুশতেন। তার পতনের পরপরই এ জায়গা থেকে পশুগুলো নদী পার হয়ে গোষ্ঠবিহার গ্রামে আশ্রয় নেয়। অপরদিকে মালিক উল গাউছ যেখানে সমাহিত আছেন সেখান কার নমুনায় একই ধরনের ইট সুরকি ব্যবহার হয়েছে। রাজার ভিটার নমুনার সাথে বাগের হাটের ষাটগম্বুজ মসজিদ, বারোবাজারের বার মসজিদ, রাজার ভিটার এবং চারুলিয়ার মেহমান শাহের মাজারে ব্যবহৃত উপকরণ একই ধরনের। এ থেকে ধারণা করা হচ্ছে এটা সুলতানি আমলের। ভৈরব এবং খানজাহানের সূত্র ধরেই যতো প্রাগৌতিহাসিক নিদর্শন গড়ে উঠেছে সেটা অস্বীকার করার কোন সুযোগ নেই। আর প্রাক মুসলিম আমলে হিন্দুরা যে সমস্থ প্রাসাদ ব্যবহার করতেন পরবর্তিতে সে সমস্থ জায়গায় মুসলমানেরা অবস্থান নিয়ে তাদের সংস্কৃতি অনুযায়ি উপকরণ ব্যবহার করতেন। যার কারণে রাজায় ভিটায় ব্যবহৃত উপকরণে হিন্দু ও মুসলিম উপকরণের নমুনা পাওয়া গেছে। চুয়াডাঙ্গা জেলায় নদী পথ পরিবর্তীত হবার কারণে পূরাকৃতি ধ্বংস হয়ে গেছে। কালুপোল রাজার ভিটাটির খনণটি হচ্ছে পরীক্ষা মূলোক খণন।  পূরার্তীতি ঘোষণা করতে পারলে আগামী বছর থেকে মূল কাজ শুরু হবে। তাই জেলাবাসীর প্রাণের দাবি কালুপোল রাজার ভিটাটি যেন পূরার্কীতি এলাকা ঘোষণা করা হোক। তিতুদহ ইউপি চেয়ারম্যান আকতার হোসেন বলেন, রাজার ভিটাটিকে এলাকাবাসী খুব সম্মানের সাথে দেখেন। তাই রাজার ভিটা, উজির মাঠ এবং মালিক উল গাউছের মাজার একই সূত্রে গাঁথা আছে বলে আমাদের ধারণা।

উল্লেখ্য, ইতিহাস সমৃদ্ধ চুয়াডাঙ্গা জেলায় ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে প্রত্নতত্ত্ব ও ঐতিহাসিক নিদর্শন আবিষ্কারে জরিপ শুরু হয়। এ জরিপে চুয়াডাঙ্গা জেলার ৯৪টি জায়গায় অনুসন্ধান চালানো হয়। এর মধ্যে ৩টি স্থানকে চিহ্নিত করা হয়। দামুড়হুদার চারুলিয়া, জীবননগরের দৌলতগঞ্জ এবং চুয়াডাঙ্গা সদরের কালুপোল রাজার ভিটা। ১ একর ৮ শতক জমির ওপর এ ভিটা অবস্থিত। খুলনা প্রত্নতাত্ত্বিক অধিদফতরের আঞ্চলিক পরিচালক আফরোজা খান মিতার নেতৃত্বে সহকারী পরিচালক একেএম সাইদুর রহমান, কাস্টোডিয়ান মহিদুল ইসলাম, কাস্টোডিয়ান গোলাম ফেরদৌস, সহকারী কাস্টোডিয়ান মোখলেচুর রহমান, সিনিয়র ড্রাফটসম্যান জাহান্নার আলী সার্ফস ম্যান রিপন মিয়া এবং অফিস সহকারী কলিম উদ্দীনসহ ১২ জন অনুসন্ধান আবিষ্কারে ৯ এপ্রিল থেকে মাটি খননের কাজ শুরু করেছেন। এরই মধ্যে বেশকিছু নমুনা আবিষ্কার হয়েছে। যার মধ্যে আছে- ধুপচি, লোহার তৈরি বল্মম, মাটির হাড়ি, সারা, কড়ি, পশুর হাড়, মাটির তৈরি পুতুল, প্রদীপ, সানকিসহ অনেক কিছু।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *