গাংনী মুন্দাইল খাল পুনর্খনন প্রকল্পে আবারো অনিয়ম- ক্ষতিপূরণের সরকারি টাকা সুবিধাবাদীদের পকেটে

মাজেদুল হক মানিক: মেহেরপুর গাংনী উপজেলায় মুন্দাইল খাল পুনর্খননে ব্যাপক অনিয়মের পর এবার ক্ষতিপূরণের টাকা লোপাটের অভিযোগ উঠেছে। আংশিক খনন করেই কাগজে-কলমে কাজ শেষ করা হয়েছে বলে এলাকাবাসী অভিযোগ করেছেন। অপরদিকে খাল পাড়ের প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের তালিকা তৈরি এবং ক্ষতিপূরণ প্রদানেও ব্যাপক অনিয়ম করা হয়েছে। প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের টাকা না দিয়ে সরকারি বরাদ্দের অর্থ সমিতির কয়েকজন পকেটস্থ করেছেন। বিষয়টি খতিয়ে দেখে দুর্নীতির সাথে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার দাবি করেছেন ভুক্তভোগীরা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মেহেরপুর এলজিইডি ‘পানি ব্যবস্থাপনা সমবায় সমিতি’র মাধ্যমে পানি নিষ্কাশন, পানি সংরক্ষণ, মাছ চাষ, কৃষি কাজে সেচ সুবিধাসহ নানা সুবিধা পেতে ২০১৬-১৭ অর্থ বছরে গাংনী উপজেলার মুন্দাইল খাল পুনর্খনন কাজ শুরু করে। ৫ দশমিক ৬ কিলোমিটার খনন কাজে ব্যয় বরাদ্দ ধরা হয়েছে ৪২ লাখ ১০ হাজার ৯৫৬ টাকা। খনন কাজে অর্থায়ন করছে ইফাদ। কাজ শুরুর কিছুদিন পরে অনিয়মের অভিযোগে খনন কাজ বন্ধ হয়ে যায়। বন্ধ হলেও খনন কাজে বরাদ্দের ৪২ শতাংশ টাকা তুলে নেয় ওই সমিতি।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, পুনর্খনন কাজ বন্ধ হওয়ার পর দৃশ্যত আর তেমন কোনো কাজ হয়নি। তবে এলজিইডি কর্তৃপক্ষের দাবি, বন্ধের পর নির্ধারিত নকশা মেনে এ বছরে খাল পুনর্খননের কাজ শেষ হয়েছে। এদিকে খাল পাড়ের ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের তালিকা তৈরি এবং ক্ষতিপূরণ প্রদান নিয়েও রয়েছে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ। খনন কাজ শুরুর সময় অনেকের গাছ-গাছালীসহ জিনিসপত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রথম পর্যায়ে এরকম ২শ’ জন ক্ষতিগ্রস্তের নামের তালিকা তৈরি করে প্রকল্প ম্যানেজার। এলজিইডি কর্তৃপক্ষ ওই তালিকা যাচাই-বাছাই করে ৬০ জনকে বাদ দিয়ে ১৪০ জনের নাম বহাল রাখে। এরপর নেদারল্যান্ডস ভিত্তিক সংস্থার নিয়োগকৃত এনজিও ‘খ্রিস্টান কমিশন ডেভেলপমেন্ট অব বাংলাদেশ’ (সিসিডিবি), ঢাকা’র এরিয়া ম্যানেজার পানি ব্যবস্থাপনা সমবায় সমিতির সদস্যদের নিয়ে ৩০ জন ক্ষতিগ্রস্তের তালিকা তৈরি করে। তাদের নামে ক্ষতিপূরণ হিসেবে মোট ৫ লাখ ৩৫ হাজার ১৮৪ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, এভাবে তিন দফা তালিকা তৈরির ঘটনাটিই প্রমাণ করে এ ক্ষেত্রে ব্যাপক অনিয়ম করা হয়েছে। আবার ওই ৩০ জন ক্ষতিগ্রস্তের কাছ থেকে অফিস খরচের নাম করে তাদের নামে বরাদ্দকৃত টাকার অর্ধেক কেটে নেয়া হয়েছে।

জুগিরগোফা গ্রামের ক্ষতিগ্রস্ত বুলবুল আহমেদ জানান, খাল পাড়ে তার আম, জাম, কাঁঠাল, নিম গাছ, কলাবাগান ছিলো। সবগুলোই কাটা পড়েছে। কিছু জমিও ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতিপূরণ হিসেবে তার নামে ৬৫ হাজার টাকার চেক ইস্যু করা হলেও প্রকল্প সভাপতি জুগিরগোফা গ্রামের হেদায়েত আলী বিশ্বাস (অ্যালবার্ট বিশ্বাস) তাকে ৩২ হাজার ৫শ টাকা দিয়েছেন।

একই গ্রামের আব্দুল করিমের নামে ১৪ হাজার টাকা থেকে ৭ হাজার এবং আব্দুস সাত্তার মিয়ার নামীয় ৪১ হাজার ২শ ৮৫ টাকা বরাদ্দ অর্ধেক কেটে নিয়েছেন অ্যালবার্ট বিশ্বাস। কেটে নেয়া টাকা ঢাকায় প্রকল্পের কাজে যাতায়াত, অফিসারদের ঘুষ, অফিস খরচসহ বিভিন্ন খাতে খরচ হবে বলে তাদেরকে জানানো হয়েছে।

প্রত্যেকের কাছ থেকে বরাদ্দের অর্ধেক টাকা কেটে নেয়া হলেও মাস্টার রোল সিটে পুরো টাকা পেয়েছে বলেই স্বাক্ষর করিয়ে নেয়া হয়েছে। জুগিরগোফা গ্রামের কিবরিয়া জানান, সরকার খাল কাটার জন্য যে উদ্যোগ নিয়েছে সেটি জনকল্যাণের জন্যই। কিন্তু খালটি যেভাবে কাটার কথা সেভাবে কাটা হয়নি। চরম অনয়িমের মধ্যদিয়ে যৎসামান্য মাটি কাটার কাজ করে খাল খননের কাজ দেখিয়েছে। খাল পাড়ের যে সকল গাছ ও ফসলের ক্ষতি হয়েছে তার মূল্য সরকার দিলেও ক্ষতিগ্রস্তরা তা ঠিকমত পায়নি। তিনি আরও জানান, জেলার বাইরের চুয়াডাঙ্গা জেলার আলমডাঙ্গা থানার হাটুভাঙা গ্রামের দুই ব্যক্তি ক্ষতিপূরণ হিসেবে টাকা তুলেছেন। এখানে তাদের কোনো জমি জায়গা নেই। অথচ কিভাবে তারা ক্ষতিগ্রস্তের তালিকাভুক্ত হয়ে ক্ষতিপূরণ পেলেন তা জানি না। এদের একজন অ্যালবার্ট মিয়ার ব্যক্তিগত একটি প্রকল্পের ম্যানেজার। এর মধ্যদিয়ে সহজেই বোঝা যায় ভুক্তভোগীদের টাকা না দিয়ে কিভাবে অর্থ লোপাট করা হয়েছে।

‘মুন্দাইল খাল পানি ব্যবস্থাপনা সমবায় সমিতি সভাপতি মোবাইলফোনে জানান, এখন অফিস আদালতে কি পরিমাণ দুর্নীতি চলে তা সব আপনাদের জানা। ঘুষ ছাড়া কাজ হয় না। এসব ঝামেলা এড়াতে তিনি ঢাকা থেকে তদন্তে আসা এরিয়া ম্যানেজারকে এই প্রজেক্ট বাতিল করার জন্য পরামর্শ দেন। কিন্ত তিনি বলেন, বিদেশি প্রজেক্টের টাকা ফেরত গেলে আপনার কী লাভ। তার চেয়ে বিদেশি টাকা দেশেই থাক, অনেকে উপকৃত হবে। তিনি আরও বলেন, ক্ষতিগ্রস্তদের অনেকেই নিরক্ষর। তাই তাদের অ্যাকাউন্ট পে চেক না দিয়ে এলজিইডি কর্তৃপক্ষের সাথে পরামর্শ করে ডিআরআর চেক প্রদান করা হয়।

এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী আজিম উদ্দীন সর্দ্দার জানান, যথাযথ নিয়ম মেনেই খাল খননের কাজ শেষ হয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত লোকদের ক্ষতিপরণের টাকার চেক প্রদান করা হয়েছে। তাদের টাকা কম পাওয়ার কথা সত্য নয়।

প্রসঙ্গত, মুন্দাইল খাল পুনর্খনন কাজে ব্যাপক অনিয়ম ও কাজ না করেই বিল উত্তোলনের খবর বিভিন্ন পত্রপত্রিকা ও টেলিভিশনে প্রচার হলে এলজিইউডি কাজ বন্ধ করে দিয়ে বিল আটকে দেয়। পরবর্তীতে খালের দু পাড়ের কিছু ঘাস পরিষ্কার করে খনন হয়েছে বলে দেখানোর চেষ্টা করে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি এবং এলজিইডিতে বিল উপস্থাপন করে। বিশেষ কায়দায় ওই বিল ছাড় করারও অপচেষ্টা অব্যহত রয়েছে। তাই দুর্নীতির বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য এলজিইডি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি কামনা করেছেন এলাকাবাসী।

 

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *