গাংনীতে অতর্কিত হামলায় আহত ললোর মৃত্যু : একজন গ্রেফতার

 

গাংনী প্রতিনিধি: প্রায় সাত ঘণ্টা মৃত্যুর সাথে লড়ে হেরে গেলেন মেহেরপুর গাংনী উপজেলার লক্ষ্মীনারায়ণপুর ধলা গ্রামের তামাক ব্যবসায়ী এনামুল হক ওরলে ললো (৪০)। শনিবার রাত দশটার দিকে নওপাড়া গ্রাম থেকে বাড়ি আসার পথে তিনি অতর্কিত হামলায় গুরুতর আহত হন। গতকাল রোববার ভোর ৫টার দিকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃস্বাস ত্যাগ করেন। এ ঘটনায় পরিবারের দায়ের করা মামলার এজাহারনামীয় আসামি নাহিদ হোসেনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। নিহত এনামুল হক ললো কাথুলী ইউনিয়নের লক্ষ্মীনারায়ণপুর ধলা গ্রামের মৃত আক্কাস আলীর ছেলে ও ৭ নং ওয়ার্ড সদস্য আজমাইন হোসেন টুটুলের ছোট ভাই।

নিহতের পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, অতর্কিত হামলা চালিয়ে ধারালো অস্ত্র দিয়ে ললোকে উপর্যুপরি কোপানো হয়। গভীর ক্ষত হয় মাথার পেছনে, পেট, পিঠ ও উরুতে। এতে প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছে। মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসকরা প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার পরামর্শ দেন। সেনুযায়ী রাজশাহী মেডিকেলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসা শুরুর কিছ্ক্ষুণ পর ভোরে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে এনামুল হক ললো। তার মৃত্যুতে বড় ভাই ও পরিবারের লোকজন শোকে মুহ্যমান। পরিবারের একমাত্র উর্পাজনকারী ব্যক্তিকে হারিয়ে দিশেহারা স্ত্রী ও দুই কন্যা। আত্মীয়স্বজনদের মাঝেও বিরাজ করছে শোকের ছায়া।

এদিকে ললোর ওপর হামলার ঘটনার পর থেকেই হামলাকারীদের চিহ্নিত করে গ্রেফতারে মাঠে নামে পুলিশ। একই গ্রামের বাসিন্দা সাবেক ইউপি সদস্য ও উপজেলা কৃষক লীগ সভাপতি আতিয়ার রহমানের লোকজন পরিকল্পিতভাবে হত্যার উদ্দেশ্যে হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ করেন নিহতের বড় ভাই আজমাইন হোসেন টুটুল। আতিয়ার রহমানকে প্রধান আসামি করে ঘটনার রাতেই নয়জনের নামে গাংনী থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন টুটুল। শনিবার দিনগত রাত দুইটার দিকে মামলাটি এজাহারভুক্ত (রেকর্ড) করে গাংনী থানা। এর পর থেকেই আতিয়ার রহমান পক্ষের পরিবারগুলো পুরুষশূন্য হড়ে পড়ে। গ্রেফতার এড়াতে তারা আত্মগোপন করেন।

গতকাল রোববার সন্ধ্যায় নিহতের মরদেহ নিজ বাড়িতে পৌঁছায়। এ সময় প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজনসহ আশপাশের গ্রামের মানুষ শেষ বিদায় দিতে ভিড় করেন। সন্ধ্যায় জানাযা শেষে গ্রাম্য কবরস্থানে দাফন সম্পন্ন হয়। মরদেহ রাজশাহী মেডিকেলে ময়নাতদন্ত করিয়েছে পুলিশ। ললোর মৃত্যুর আগে মামলা দায়ের হয়। তার মৃত্যুর পর ওই মামলায় হত্যাকাণ্ডের ধারা যুক্ত হচ্ছে। পুলিশের অভিযানে লক্ষ্মীনারায়ণপুর ধলা গ্রামের আব্দুল গফুরের ছেলে নাহিদ হোসেনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গতকাল রোববার বিকেলে গাংনী থানার এসআই মনিরুজ্জামান ও এসআই মাহতাব উদ্দীন সঙ্গীয় ফোর্স নিয়ে হিন্দা এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করেন। সে ললো হত্যা মামলার আট নম্বর আসামি। গাংনী থানার পরিদর্শক (ওসি-তদন্ত) কাফরুজ্জামান বলেন, নাহিদকে হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। হত্যা মামলার আসামি হিসেবে আজ সোমবার তাকে মেহেরপুর আদালতে সোপর্দ করা হবে।

নিহতের পারিবারিকসূত্রে জানা গেছে, তামাক ব্যবসায়ী এনামুল হক ললো ব্যবসায়ীক কাজে প্রতিদিন সন্ধ্যায় পার্শ্ববর্তী নওপাড়া গ্রামের ইয়ারুল ইসলামের বাড়িতে যেতেন। শনিবার রাতে ইয়ারুল ইসলামের ছেলের গায়ে হলুদ অনুষ্ঠান হচ্ছিলো। ওই অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে রাত দশটার দিকে মোটরসাইকেলযোগে বাড়ি ফিরছিলেন তিনি। ইয়ারুল ইসলামের ছেলে দিপ্ত বলেন, প্রতিদিন আমরা তাকে এগিয়ে দিয়েছি। কিন্তু অনুষ্ঠানের কারণে কেউ সাথে যেতে পারেননি। আমাদের বাড়ি থেকে রওনা দেয়ার কিছু সময় পরেই খবর পাই তার ওপর হামলা হয়েছে। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী কেউ নেই। তবে ললোকে উদ্ধারের পর হামলাকারীদের নাম বলে গেছেন বলে দাবি করেন দিপ্ত। একই দাবি করেছেন ললোর পরিবারের সদস্যরা।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আতিয়ার রহমানের পরিবারের সঙ্গে আজমাইন হোসেন টুটুল পরিবারের জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ রয়েছে। এছাড়াও রয়েছে রাজনৈতিক বিরোধ। এসব বিরোধের জের ধরে গত ৯ জুন রাতে দু পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে আতিয়ার রহমান ও তার বড় ভাই মহব্বত আলীসহ ৫ জন গুরুতর আহত হয়েছিলেন। গুরুতর আহত তিনজনকে কুষ্টিয়া, রাজশাহী ও ঢাকায় চিকিৎসা নেন। এ সংঘর্ষের ঘটনার জেরে ললোর ওপর হামলা হয়ে থাকতে পারে বলে অভিযোগ করেছেন নিহতের পরিবারের কয়েকজন। তবে অভিযোগ মিথ্যা দাবি করে সাবেক ইউপি সদস্য আতিয়ার রহমান বলেন, গেল ৯ জুনের হামলায় মৃত্যুর সাথে লড়ে বেঁচে গেছেন তার ভাইসহ তিনজন। এ ঘটনায় আজমাইন হোসেন ও ললোসহ কয়েকজনের নামে আমরা মামলা করেছি। এছাড়াও জমিজমা ও রাজনৈতিক বিরোধ দীর্ঘদিনের। এসব বিষয়ে তাকে ঘায়েল করতেই মিথ্যা মামলা দিয়েছে। ললোর বিরুদ্ধে এলাকায় বিভিন্ন অপকর্মের অভিযোগ রয়েছে। এতে ভুক্তভোগী কেউ তার উপর হামলা করতে পারে। শুধুমাত্র পূর্ববিরোধের কারণেই হত্যার দায় আমাদের উপর চাপানো হচ্ছে।

নিহতের পারিবারিক পরিচয়: লক্ষ্মীনারায়ণপুর ধলা গ্রামের আক্কাছ আলীর চার ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে নিহত এনামুল হক ললো মেঝ। বড় ছেলে আজমাইন হোসেন টুটুল। সেজ ছেলে আসাদুল হক লাল্টু কৃষিকাজ করেন। ছোট ছেলে সেন্টু মিয়া ২০০৯ সালে স্থানীয় মাইলমারী বিলে মাছ চাষ নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে সংঘর্ষে নিহত হয়। একমাত্র মেয়ে রেক্সনা বিয়ে করে সংসারী হয়েছেন মেহেরপুরের তেরোঘরিয়ায়। ২০/২২ বছর আগে একই গ্রামের ইব্রাহিম হোসেনের মেয়ে বিলকিছ আরার সাথে ললোর বিয়ে হয়। দাম্পত্য জীবনে তিনি দুই কন্যা সন্তানের জনক। বড় মেয়ে সোনিয়া এবার এইচএসসি পাস করেছে। ছোট মেয়ে রিমু তৃতীয় শ্রেণিতে লেখাপড়া করে।

Leave a comment

Your email address will not be published.