খালি ক্যাপসুলে আটা ও লবণ ভরে ওষুধ বানিয়ে কোটি টাকা কামাই

র‌্যাবের অভিযানে আবারও আটক নকল ওষুধ প্রস্তুতে কুখ্যাত নির্মাতা ও সবররাহকারী

 

স্টাফ রিপোর্টার: খালি ক্যাপসুলের ভেতর আটা ও লবণ। সেই ক্যাপসুল ফয়েল ও প্যাকেটে ভরে বাজারজাত করা হয়। সাধারণ ভোক্তার পক্ষে ধরার উপায় নেই। দেখতে নামি-দামি ক্যাপসুলের হুবহু। একবার-দু’বার নয়, বছরের পর বছর এভাবেই নকল ওষুধ তৈরি করে নকলবাজরা কামিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। যুক্তরাষ্ট্রের সেই সেন্ট্রাম, ভায়াগ্রা, ক্যালবিন্টা কি নেই তার ভাণ্ডারে? মূল্যবান সব ওষুধই তিনি তৈরি করেন বেশ দক্ষতার সাথে।

এমন ওষুধ যিনি তৈরি করেন, তিনি রাসেল, মনে করেন-এটা তেমন কোনো অপরাধ নয়। তার যুক্তি এতে ভেজাল কিছু নেই। আটা আর লবণ খেলে কি মানুষের কোনো ক্ষতি হয়? একে তো চুরি তার ওপর বাহাদুরি। গতকাল বুধবার র‌্যাবের সাঁড়াশি অভিযানে ধরা খেলেন এমনই এক কুখ্যাত ভেজাল ওষুধ নির্মাতা ও সরবরাহকারী। বারবার তিনি এ ধরনের অপরাধ করেন। বার বার দণ্ডপ্রাপ্ত হন। তবুও তিনি অনুতপ্ত হননি। সঙ্গতকারণেই গতকাল বুধবার তাকে ফের গ্রেফতার করা হয়েছে। রাসেলের ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ ও বেপরোয়া মনোভাব দেখে বিস্মিত খোদ র‌্যাব পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আনোয়ার পাশা। একবার সাজা খাটার পরও তিনি কি করে ফের এমন অপরাধ করতে পারলেন এমন প্রশ্ন র‌্যাব আদালতের। মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা কি কোনো অপরাধ নয়-এমন প্রশ্নের জবাবে অবশ্য নিশ্চুপ থাকেন রাসেল।

এদিন রাজধানীর মিটফোর্ড, বাবুবাজার ও ইসলামপুর এলাকায় র‌্যাব সাঁড়াশি অভিযান চালিয়েছে। এ সময় ৩টি ভেজাল ওষুধ তৈরির কারখানা ও একটি গোডাউন সিলগালা করেছেন র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত। এ সময়ই রাসেলকে হাতেনাতে আটক করা হয়। পরে তার কেরানীগঞ্জের বাসায়ও নকল ওষুধ তৈরির দুটি কারখানায় হানা দেয়া হয়।

কেরানীগঞ্জের ৬ নং ওয়ার্ডের বড় কুশিয়ারবাগের ৩ নং বাড়ির তৃতীয় তলায় রাসেলের বাড়ি। আমির মার্কেটেও তার তিনটি গোডাউন। সেখান থেকেও বিপুল পরিমাণ ওষুধ জব্দ করা হয়। এগুলো হচ্ছে এসিআই, বেক্সিমকো, স্কয়ার, এসকেএফসহ বিভিন্ন নামীদামী ব্র্যান্ডের এ্যান্টিবায়োটিক, শ্বাসকষ্ট, অ্যালার্জি, উঁচুমানের মিনারেল, ভিটামিন ও ক্যালসিয়ামের নকল ওষুধ, ওষুধ তৈরির যন্ত্রপাতি, উপকরণ, ফয়েল, মোড়ক ও লেবেল।

নকল ওষুধ তৈরির কারখানার মালিক রাসেলের অপরাধ গুরুতর হওয়ায় এবং দ্বিতীয় বারের মতো ধৃত হওয়ায় কঠোর দণ্ড প্রদানের লক্ষ্যে তার বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা দায়েরের নির্দেশ দেন মোবাইলকোর্ট। মোবাইলকোর্ট পরিচালনা করেন র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এএইচএম আনোয়ার পাশা। ভেজাল ওষুধ তৈরির অপরাধে তার বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইনে নিয়মিত মামলা দায়েরের নির্দেশ দেয়া হয়। যার সর্বোচ্চ দণ্ড মৃত্যুদণ্ড।

এ সময় রাসেল জানান, এসিআই কোম্পানির ফ্লুক্লসু (৫০০) নামের এ্যান্টিবায়োটিক ক্যাপসুল তিনি নিজ বাড়িতে এবং দোকানে বসেই তৈরি করেন। এ ওষুধের এ্যালুমিনিয়ামের ফয়েল এবং প্যাকেট প্রেস থেকে ছেপে নেয়া হয়। খালি ক্যাপসুল কিনে তার ভেতর আটা এবং লবণ মিশিয়ে ক্যাপসুলটি তৈরি করে। ছাপানো এ্যালুমিনিয়ামের ফয়েল টুকরা করে হিট দেয়ার মেশিন দিয়ে চারটি করে ক্যাপসুল প্যাক করে। এ রকম দশটি প্যাকেট একটি কাগজে বক্সে ভরে পাইকারি বিক্রি করেন। ফয়েল এবং কাগজের বাক্সটি সে এসিআই কোম্পানিকে হুবহু নকল করে ছেপে নিয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষের পক্ষে বোঝা সম্ভব নয় যে, এগুলো নকল এ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ। তবে পাতা ছিঁড়ে ক্যাপসুল বের করে দেখা যায় আসলটির গায়ে ছোট করে ওষুধের নাম এবং কোম্পানির নাম লেখা রয়েছে। কিন্তু নকল ক্যাপসুলের গায়ে কিছু লেখা থাকে না। এক বাক্স ওষুধের গায়ে খুচরা মূল্য লেখা আছে ৪২১ টাকা। এসিআই কোম্পানি ৩৫০ টাকায় পাইকারি বিক্রি করলেও রাসেল তার নকল ওষুধটি পাইকারি হিসেবে ২০০ টাকায় বিক্রি করে। ফলে কিছু অসাধু খুচরা বিক্রেতা বেশি লাভের জন্য জেনে শুনেই এই নকল ওষুধ এখান থেকে কিনে নিয়ে যায় বলে রাসেল দাবি করে। রাসেল জানান, তার বানানো এসিআই কোম্পানির এ্যান্টিবায়োটিক খেলে কারও কোন ক্ষতি হবে না। আবার লাভও হবে না। কারণ এতে শুধু আটা ও লবণ ছাড়া আর কোনো ক্ষতিকর কেমিক্যাল নেই। তাই তার দৃষ্টিতে এটা তেমন কোন অপরাধ নয়। তার তৈরি নকল ওষুধ খেয়ে রোগ ভালো না হওয়ায় আরও বেশি অসুস্থ হয়ে মানুষের ক্ষতি হওয়ার প্রশ্ন করলে তিনি আর জবাব দিতে পারেননি। একইভাবে তিনি শ্বাসকষ্টের ওষুধ ডার্মাসিন এবং এ্যালার্জির ওষুধ হিস্টাসিন নকল তৈরি করে ২০০ টাকার ওষুধ ১০০ টাকায় পাইকারি বিক্রি করেন।

এসকেএফ কোম্পানির ওস্টোক্যাল ডি, বেক্সিমকো কোম্পানির বেক্সট্রাম গোল্ড, স্কয়ার কোম্পানির নিউরো বি, কেলবোন্ডডি এবং ফিলওয়েল ওষুধের হুবহু নকল করছিলেন রাসেল। রাসেল স্বীকার করেন প্লাস্টিকের কারখানা থেকে তিনি এগুলোর কৌটা ও মুখ বানিয়েছেন। প্রেস থেকে হুবহু একই রকম স্টিকার ছেপে নেন। এ ওষুধগুলো বিভিন্ন ধরনের উচ্চমানের মিনারেল, ভিটামিন এবং ক্যালসিয়াম হলেও সে সব ওষুধের কৌটার ভেতর ২০ পয়সা দামের ক্যালসিয়াম ট্যাবলেট ভরে দেন। সিল করা ওষুধের কৌটা বাইরে থেকে দেখে আসল ওষুধ মনে হলেও ভেতরে সস্তা ক্যালসিয়াম থাকায় রোগী না বুঝে প্রতারিত হচ্ছে। দেড় থেকে দুশ টাকার ওষুধগুলো সে ৬০ থেকে ৭০ টাকায় পাইকারি বিক্রি করেন। একই কৌশলে তিনি আমেরিকার ওষুধ এ্যাঙ্কক্যাল, বডি ফিট, সেন্ট্রাম গোল্ড হুবহু নকল করছিলেন- যেগুলো বাজার থেকে চারশ থেকে সাড়ে চারশ টাকায় কিনে রোগী সাধারণ প্রতারিত হচ্ছে।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *