কুষ্টিয়ায় উদ্ধার হওয়া লাশ জীবননগরের তরুণী শিউলীর

বাড়িতে নার্সের চাকরি করি বলে জানালেও পুলিশ পেয়েছে অন্য তথ্য
জীবননগর ব্যুরো: কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ মাঠ থেকে বুধবার সকালে উদ্ধার হওয়ার তরুণীর লাশটি জীবননগর পোস্ট অফিসপাড়ার শিউলী খাতুনের (২৫)। তার হতদরিদ্র মা ও পরিবারের সদস্যরা জানতো নাটোর সদর হাসপাতালে সে নার্সের চাকরি করে। গত বুধবার দুপুরে পুলিশ শিউলীর মা সুকিরন নেছাকে মেয়ে খুনের ঘটনা জানায়। লাশ শনাক্ত করা হলে রাতেই নিহত শিউলীর লাশ কুষ্টিয়া মর্গ থেকে বাড়িতে নিয়ে দাফন কাজ সম্পন্ন করা হয়। দিনমজুর পিতা তৈয়ব আলী ওরফে তেঁতুলের মৃত্যুর পর মা ও ২ ভাই-বোনের সংসার চালাতে হাল ধরেছিলো শিউলী। সংসারের একমাত্র উপর্জনক্ষম শিউলীর এ খুনের ঘটনায় হতদরিদ্র ও এতিম এ পরিবারটি শোকের ছায়া নেমে এসেছে। এদিকে নাটোর সদর হাসপাতালের নার্সের চাকরি করার কথা বললেও নিজের নাম ও ঠিকানা গোপন করে সাবিকুন নাহার সোনিয়া পরিচয় দিয়ে নিজেকে একজন কলেজছাত্রী ও বিবাহিত বলে বাসা নিয়ে বসবাস করায় বিষয়টি নিয়ে রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার দৈনিক মাথাভাঙ্গায় কুষ্টিয়া প্রতিনিধির বরাত দিয়ে ‘কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ মাঠ থেকে অজ্ঞাত তরুণীর লাশ উদ্ধার’ শিরোনামে এ সংক্রান্ত একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়।
শিউলির মা সুকিরন নেছা গতকাল বৃহস্পতিবার জানান, মঙ্গলবার সন্ধ্যার পর শিউলির সাথে মোবাইলফোনে তার শেষ কথা হয়। এ সময় সে নিজের ওষুধ ও ছোট মেয়ে সীমা বৃ মেলায় যাবে এর জন্য তার নিকট টাকা চাই। অল্প সময়ের মেেধ্য শিউলী নিজের মোবাইলফোন থেকে বিকাশের মাধ্যমে ১ হাজার ২০০ টাকা পাঠায়। পরবর্তীতে শিউলীর কাছে মোবাইল করলে সে যানবাহনের হর্নের শব্দ পেয়ে কোথায় যাচ্ছিস জানতে চাই। শিউলী জানায়, অফিসের কাজে লোকজনের সাথে সে বাইরে যাচ্ছে। পুনরায় মোবাইলফোন করে কোথায় যাচ্ছিস, জানতে মায়ের পিঁড়াপিঁড়ির এক সময় একজন শিউলীর মোবাইলফোনটি ছিনিয়ে নিয়ে তার মায়ের সাথে অসৌজন্যমূলক আচরণ করে এবং মোবাইলফোন বন্ধ করে দেয়। এরপর তিনি আর মোবাইলে যোগাযোগ করতে পারেনি বলে জানান। সুকিরন নেছা জানান, তার মেয়ে প্রথমে কুষ্টিয়া সদর হাসাপাতালে নার্সের চাকরি নেয় পরবর্তীতে সে নাটোর সদর হাসপাতালে বদলি হয়েছে বলে তাদের জানিয়েছে। তাকে দেখতে নাটোরে কোনো দিন তারা যাননি বলে জানান। তবে নাটোরেই সে থাকতো বলে তারা জানতো। কুষ্টিয়াতে কিভাবে তার লাশ এলো তা তারা বুঝতে পারছে না।
কুষ্টিয়া শহরের কলেজ মোড় এলাকায় গণপূর্ত অধিদফতরের কোয়ার্টারের বৃদ্ধা তাওহীদা বানু সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, নিজেকে কলেজছাত্রী ও বিবাহিত বলে সাবিকুন নাহার সোনিয়া নাম নিয়ে শিউলী তার বাসা ভাড়া নেয়। গত মঙ্গলবার রাতে অজ্ঞাত পরিচয় এক ব্যক্তি তার খোঁজে আসে। ওই ব্যক্তির হাতে একটা নতুন শাড়ি ছিলো। শিউলী ওই ব্যক্তিকে তার স্বামী বলে পরিচয় দেয়। কিছুক্ষণ পর শিউলি ঘরে তালা মেরে ওই ব্যক্তির সাথে বাইরে বের হয়ে যায়। এরপর সে আর রাতে বাসায় ফেরেনি।
তরুণী শিউলী কেন খুন হলো, এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে নানা তথ্য পাওয়া গেছে। সম্ভবত ২০১৩ সালে এসএসসি পাস করে শিউলী। এরপর সে চাকরির খোঁজে নামে। শাপলাকলিপড়ার এক ব্যক্তির মাধ্যমে সে চাকরির সন্ধান শুরু করে। মা সুকিরন নেছা মেয়ের চাকরির জন্য গরু বিক্রি করে টাকাও দিয়েছিলেন। শাপলাকলিপাড়ার কাকে টাকা দিয়েছিলেন, জিজ্ঞাসা করলে বলা হয় তিনি মারা গেছেন, তবে তার নামও বলা হচ্ছে না। তার হাত ধরেই নাকি শিউলীর কুষ্টিয়াতে যাওয়া। এরপর লেখাপড়া করে নার্সের চাকরি নেয় বলে জানায়। এরপর নাটোর সদর হাসপাতালাতে বদলি হয়ে সেখানে চাকরি করছে বলে সে তার পরিবারকে জানিয়েছে। এ সময় সে তার একমাত্র ভাই শিমুলের জন্য শাখারিয়া পিচমোড়ে একটি মোটরসাইকেল গ্যারেজ খুলে দিয়েছে সম্প্রতি। ছোট বোন সীমা তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে। তার খরচসহ সংসারের জন্য প্রতি সপ্তাহে বিকাশের মাধ্যমে সে টাকা পাঠাতো। মোটামুটি ভালোই চলছিলো শিউলীদের পরিবার। বুধবার কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ মাঠ থেকে লাশ উদ্ধারের পর পুলিশ তার ভাড়া বাসায় অভিযান চালিয়ে চমকে ওঠে। উদ্ধার করে বিভিন্ন কাগজপত্র। একটি খাতাতে সে তার একাধিক ছদ্মনাম ও মোবাইল সিমের নম্বর লিখে রেখেছে। দোলন ও রুমি জোয়ার্দ্দারসহ ছদ্মনামের তালিকায় রয়েছে প্রায় ২৫টির মতো নাম। পুলিশ এ সময় তার রুম থেকে জন্মনিবন্ধন ও ইসলামী ব্যাংকের চেক বই উদ্ধার করে তার পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হয়। উদ্ধার করে ৫ হাজার টাকা। পুলিশ জানিয়েছে, তার রুমে এইচএসসির দুটি বই ও দামি কিছু পোশাক দেখতে পাওয়া গেছে। নার্সিং বিষয়ে কিংবা অর্নাসের কোনো বই পাওয়া যায়নি। তবে কি শিউলী বাড়িতে বলা নার্সের চাকরির কথা ও বাড়িওয়ালাকে বলা কলেজছাত্রী সব পরিচয়ই মিথ্যা দিয়েছে। কেন দিয়েছে? তবে সে কি করতো? নার্সের চাকরি করলে প্রতি মাসের শেষে বাড়িতে টাকা পাঠানো কথা কিন্তু শিউলী প্রতি সপ্তাহে বাড়িতে টাকা পাঠাতো, কিভাবে? কারা তাকে খুন করলো? কেন খুন করলো? তবে কি বহু সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছিলো? এমন বহু প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে এলাকাবাসীর মনে। যা তদন্ত করলে পুলিশকে ঘাতকের কাছাকাছি পৌঁছে দেবে এমন আশাবাদ অনেকে ব্যক্ত করেছে।
এদিকে কুষ্টিয়া মডেল থানার ওসি নাসির উদ্দিন সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, দু থেকে আড়াই বছর আগে নিজের নাম সাবেকুন নাহার সোনিয়া এবং কলেজছাত্রী বলে পরিচয় দিয়ে তাওহীদা বানুর বাড়ি ভাড়া নিয়ে বসবাস করে আসছিলো সে। নিজেকে সে কলেজছাত্রী বলে পরিচয় দিলেও আদৌও সে কলেজছাত্রী ছিলো কি-না এ নিয়ে পুলিশ বিষয়টি নিশ্চিত হতে পারেনি। লাশের গলায় ও থুতনিতে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে বলে পুলিশ জানায়। ধারণা করা হচ্ছে অন্য কোনো স্থানে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে রাতের যেকোনো সময় লাশটি এখানে ফেলে রেখে যায় হত্যাকারীরা।

Leave a comment

Your email address will not be published.