কালীগঞ্জের বারোবাজার রেলক্রসিঙে দুর্ঘটনার কারণ তদন্তে বেরিয়ে আসছে নানা তথ্য

 

 

রেললাইন ঘেঁষে মাছবাজারঅবৈধ স্থাপনা :ট্রেনের আলো চোখে পড়ে না

ঝিনাইদহ অফিস:ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার বারোবাজার রেলক্রসিঙেগত শুক্রবার ভোরে ট্রেনেরধাক্কায় বরযাত্রীবাহী বাসের ১১ জন নিহত ও ৫০ জন আহত হওয়ার পর গঠিত তদন্তকমিটি কাজ শুরু করেছে। ঝিনাইদহ অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক নাসরিন জাহান, কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এরাদুল হক ও সহকারী পুলিশ সুপারজাহিদুল ইসলাম দুর্ঘটনার স্থান পরিদর্শন ও নিহতদের পরিবারবর্গ ও আহতদেরসাথে কথা বলেছেন। এদিকে রেলক্রসিঙে মর্মান্তিক এ দুর্ঘটনার নানা কারণ বেরহয়ে আসছে।

সরেজমিন বারোবাজারের স্থানীয় লোকজনের সাথে কথা বলে জানা গেছে, বাজারেরভেতর থেকে যাওয়া রেললাইন ঘেঁষে গড়ে উঠেছে মাছ বাজার ও অবৈধ স্থাপনা। এসবঅবৈধ স্থাপনার কারণে বাস-ট্রাক, মাইক্রোসহ অন্যান্য যানবাহন রেলক্রসিং পারহওয়ার সময় রাতে রেলের আলো দেখতে পারে না। দীর্ঘদিন ধরেই রেললাইনের দুপাশদখল করে এসব অবৈধ স্থাপনা গড়ে উঠেছে। এসব বিষয় প্রশাসনের লোকজন দেখেও নাদেখার ভান করে এড়িয়ে থাকেন। দুর্ঘটনার রাতে রেলের আলো দেখতে না পারার কারণেএ দুর্ঘটনাটি ঘটেছিলো বলে স্থানীয়দের দাবি। ঘটনার রাতে বরযাত্রীর বাসেঢোল-বাজনার কারণে ড্রাইভার ট্রেনের হর্ন শুনতে পারেননি। যার কারণে দুর্ঘটনাঘটেছে বলে এলাকাবাসী মনে করেন। স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে গঠিত এসব বিষয়তদন্ত কমিটি খতিয়ে দেখছেন। বর্তমানে দায়িত্বপ্রাপ্ত বারোবাজার রেলওয়েরস্টেশনমাস্টার আব্দুল বারীও দুর্ঘটনার নেপথ্যে এসব কারণের কথা স্বীকারকরেছেন।

এদিকে রেলওয়ের পক্ষ ও জেলা প্রশাসনের পক্ষথেকে গঠিত পৃথক তদন্তকমিটি কাজ শুরু করেছে। গতকাল রোববার তদন্ত কমিটির সদস্য কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহীকর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) দেবপ্রসাদ পাল দিনব্যাপি তদন্ত করেন।ট্রেনের সাথে সংঘর্ষে চূর্ণ-বিচূর্ণ বাসটি দেখার জন্য প্রতিদিন শত শতমানুষ জড়ো হচ্ছে। বিভিন্ন হাসপাতাল ও ক্লিনিকে আহতদের সুষ্ঠুভাবে চিকিৎসাদেয়ার ব্যাপারে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাগিদ দেয়া হয়েছে। অন্যদিকে বিয়েরপর যেসব আত্মীয়স্বজনের তাপস-জোৎস্না দম্পতির খোঁজখবর নেয়ার কথা, তাদেরদেখতেই এখন হাসপাতাল আর বাড়ি বাড়ি ছুটছেন তাপস। ফুলশয্যা আর বৌভাতেরঅনুষ্ঠান বিলীন হয়ে গেছে শোকের মাতমে। ফুলহরি গ্রামটিতে বিরাজ করছে শোকেরছায়া।

বারোবাজার স্টেশনমাস্টার আব্দুল বারী জানান, রেললাইনের পাশে মাছ বাজার গড়েউঠেছে। এ রেললাইনের ওপর দিয়ে প্রতিদিন ৯টি আপ ও ৯টি ডাউনসহ মোট ১৮টি ট্রেনচলাচল করে। এছাড়া স্থানীয় অনেকে নাকি রেলওয়ে থেকে ডিসিআর কেটে এনে অবৈধস্থাপনা গড়ে তুলেছেন। মাছের পানিতে স্লিপারগুলোর নিচে পানি জমে মাটি নরম হয়েরেললাইন সরে যায়। স্লিপারগুলো মরিচা পড়ে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এসব কারণে অনেকসময় রেললাইনচ্যুত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অতীতে এখানে আরও কয়েক জন মারাওগেছেন। তিনি রেললাইনের পাশে গড়ে ওঠা বাজার ও অবৈধভাবে নির্মাণ করা স্থাপনাউচ্ছেদের দাবি জানান।

বারোবাজার মাছবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন বলেন, এদুর্ঘটনার জন্য তাদের বা মাছ বাজারের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। কারণ হিসেবে তিনিজানান, দুর্ঘটনাটি ঘটেছে রাত সাড়ে ৩টায়। সে সময় বাজারের কোনো লোকজন ছিলো না।এটিগেটম্যান ও স্টেশন মাস্টারের দায়িত্ব অবহেলার কারণে ঘটেছে বলে তিনিজানান। তিনি আরও বলেন, এখানে ১৭ থেকে ২০ জনের মতো আড়তদার রয়েছেন। দেশেরবিভিন্ন স্থান থেকে এসব আড়তে প্রতিদিন কয়েক শ’ শ’ মণ বিভিন্ন প্রজাতির মাছআসে। এসব মাছ ক্রয় করে তারা ঢাকা, সিলেট ও চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্নস্থানে পাঠিয়ে থাকেন। বেশির ভাগ মাছ সিলেট জেলার বিভিন্ন স্থানে বিক্রিরজন্য পাঠানো হয়। প্রতিদিন এখানে অর্ধ কোটি টাকার মাছ বেচাকেনা হয়। আবারমাছের সিজনে আরও বেশি টাকার ক্রয়-বিক্রয় হয়ে থাকে। প্রায় ৫ হাজার পরিবারমাছ ক্রয়-বিক্রয়ের সাথে জড়িত থেকে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করছেন। প্রতি আড়তে২০ থেকে ২৫ ব্যক্তি কাজ করে থাকেন। মাছবাজার থেকে প্রতিবছর সরকারকে ৫ থেকে ৭লাখ টাকার রাজস্ব প্রদান করা হয়। অথচ দীর্ঘ কয়েক যুগেও বারোবাজারেমাছবাজারের জন্য স্থায়িভাবে কোনো জায়গা নির্ধারণ করা হয়নি। গড়ে ওঠেনি মাছেরহাটচাঁদনী। তিনি প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাছবাজারের জন্য আলাদা হাটচাঁদনী করেদেয়ার দাবি জানান। অপর এক ব্যবসায়ী জানান, মাছ ব্যবসায়ীরা মাছবাজারের জন্যআলাদা একটি জায়গা ক্রয় করেছেন সরকার সহযোগিতা করলে শিগগিরিই মাছবাজারটি চালুকরা সম্ভব হবে। দুর্ঘটনার পর ওই দিন সকালে অনেক ব্যবসায়ীরেললাইন সংলগ্নতাদের নিজ নিজ আড়তের সামনের টিন ও চালা খুলে ফেলেছেন।

এদিকে রেলক্রসিঙের ব্যারিয়ার ভেঙে যাওয়ায় রেলগেট এখনও অরক্ষিত রয়েছে।বর্তমানে বাঁশ দিয়ে যানবাহন গতিরোধ করা হচ্ছে। যা রীতিমতো ঝুঁকিপূর্ণ।অপরদিকে রেলওয়ের সিগন্যালের তার নষ্ট হয়ে যাওয়ায় সিগন্যাল কাজ করে না।সেগুলো মেরামতের কাজ চলছে।

ঝিনাইদহ জেলা প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম জানান, তদন্ত কমিটি কাজ করছে। তারা ৭দিনের মধ্যে তদন্ত রিপোর্ট জমা দেবেন। ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্ট ও অন্যদেরজবানবন্দি নেয়া হয়েছে। অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের বিষয়ে তিনি জানান, যেহেতুজায়গাটি রেলওয়ের, তারা উচ্ছেদের বিষয়ে আমাদের জানালে আমরা কার্যকর ব্যবস্থানেব। এছাড়া রেললাইনের ওপর অবৈধভাবে মাছবাজার থাকলে তা উচ্ছেদের বিষয়েরিপোর্টে সুপারিশ করা হবে বলে তিনি জানান।

দুর্ঘটনার বিষয়ে বাস চালকের নামে কোনো মামলা হয়েছে কিনা জানতে চাইলেকালীগঞ্জ থানার অফিসারইনচার্জ আনোয়ার হোসেন জানান, স্থানীয় থানায় কোনোঅভিযোগ দায়ের করা হয়নি। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ মামলা করেছে। সেখানে তাকে আসামিকরা হয়েছে বলে তিনি শুনতে পেরেছেন।

উল্লেখ্য, গত পয়লা আগস্ট রাত সাড়ে ৩টায় ঝিনাইদহের কালীগঞ্জের বারোবাজারেররেলক্রসিঙে মর্মান্তিক বাস-ট্রেন সংঘর্ষে ১১ জন নিহত ওঅন্তত ৫০ জনবরযাত্রী আহত হন।

Leave a comment

Your email address will not be published.