একান্ত আলাপাচারিতায় চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজের নবাগত অধ্যক্ষ প্রফেসর রহমত আলী

আমাদের সময় প্রাইভেটের বালাই ছিলো না

 

ইসলাম রকিব: চলতি বছরের ১২ সেপ্টেম্বর চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজের নবাগত ২২তম অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদান করেছেন চুয়াডাঙ্গার কৃতীসন্তান প্রফেসর অধ্যক্ষ রহমত আলী। এক সময়ের এইচএসসি প্রথমবর্ষের ছাত্র এখন সে কলেজের সর্বোচ্চ পদ অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ছাত্র-শিক্ষক হিসেবে তিনি চুয়াডাঙ্গা সরকারি  কলেজে কাটিয়েছেন জীবনের ২৩টি বছর। নিজ কার্যালয়ে বসে তিনি তার ছাত্রজীবন ও অধ্যাপনা জীবনের কথা স্মৃতির ফ্রেম থেকে কিছুটা বর্ণনা করেন।

১৯৬৯’র অসহযোগ গণআন্দোলন পরবর্তী বছর ১৯৭০ সাল। যে সালে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বাঙালি জাতি ব্যালটের মাধ্যমে অবস্থান সুদৃঢ় করেছে আমরা আর পাকিস্তানিদের অধীনে চলতে  চাই না। চাই বাঙালির স্বাধীনতা। দেশে তখন থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। ঠিক এ সময় চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উথলী মাধ্যমিক বিদ্যায়ের ৮ম শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষা শেষ করেছিলেন এ গ্রামেরই শ্যামলা হালকা-পাতলা গড়নের ছোট্ট ছেলে রহমত আলী। বয়স তখন ১৩-১৪ বছর। পরবর্তী বছর ১৯৭১ সাল। ৯ম শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে ভালোই চলছিলো পড়ালেখা। ১৯৭০’র নির্বাচন পরবর্তী থমথমে অবস্থার পথ ধরে বাঙালি জাতিকে ধ্বংস করার জন্য ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালোরাতে ইতিহাসের জঘন্যতম হত্যাযজ্ঞ শুরু করলো পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। ঢাকাসহ সারা বাংলাদেশে (পূর্বপাকিস্তানে) তার প্রভাব পড়লো। এর আওতায় খুব কাছাকাছি ছিলো চুয়াডাঙ্গা। প্রভাব পড়বে এটাই স্বাভাবিক। কারণ ১৯৭১ সালের ১০ মার্চ বিকেলে চুয়াডাঙ্গার কৃতীসন্তান অকুতোভয় ডা. আসাবুল হক জোয়ার্দ্দারের নেতৃত্বে বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী রাজধানীর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয় চুয়াডাঙ্গার বর্তমান সদর হাসপাতাল চত্বরে। ফলে পাকিস্তানি বাহিনীর টাগের্টের শীর্ষ তালিকায় ছিলো চুয়াডাঙ্গা। ২৫ মার্চের পরের দিন থেকে চুয়াডাঙ্গায়ও শুরু হলো বোম্বিং। এ এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সকল প্রতিষ্ঠান বন্ধ হতে লাগলো। অনেক যুবক, ছাত্রশিক্ষক, কৃষক দেশের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করলো। সে যুদ্ধে রহমত আলীও অংশগ্রহণ করেছিলেন। ছাত্র বয়সে ৮ নং সেক্টরের অধীনে চাপড়া, রাজাপুরসহ বিভিন্ন স্থানে গেরিলা প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে দেশমাতৃকার দুর্দিনে অস্ত্র হাতে নিয়েছিলেন কিশোর রহমত আলী। যুদ্ধ শেষে দেশ স্বাধীন হলো। ১৯৭২ সালে এসএসসি (মেট্টিক) পরীক্ষায় পাস করে চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজে ভর্তি হলো সেই কিশোর। এরপর ১৯৭৫ সালে এইচএসসি পরীক্ষায় কৃতিত্বের সাথে পাস করে ১৯৭৬ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাণিবিদ্যা বিভাগে ভর্তি হন। ১৯৮২ সালে প্রাণিবিদ্যা বিভাগ থেকে অনার্স মাস্টার্স পাস করে অপেক্ষা করছিলেন চাকরির জন্য। ১৯৮৫ সালে ঈশ্বরদী কলেজে চাকরি পান। সেখানে একনাগাড়ে (১৯৮৫-১৯৯০) পাঁচ বছর চাকরি করেন। চুয়াডাঙ্গা কলেজ সরকারি হলে ১৯৯০ সালেই বদলি অর্ডার নিয়ে চলে আসেন চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজে। প্রভাষক হিসেবে ১৯৯৬ সালে চাকরি করাকালীন সহযোগী অধ্যাপক পদে পদায়ন লাভ করেন। ২০০৬ সালে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে নড়াইল ভিক্টোরিয়া কলেজে প্রাণিবিদ্যা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান হিসেবে যোগদান করেন। ২০০৮ সালে ঝিনাইদহের কোর্টচাঁদপুর সরকারি কলেজে উপাধ্যক্ষ হিসেবে চাকরি করেন ১ বছর। ২০০৯ সালে আবারও চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজে যোগদান করেন। তবে এবার যোগদান করেন উপাধ্যক্ষ হিসেবে। ২০১৩ সালের জানুযারি মাসে অধ্যাপক হিসেবে পদোন্নতি লাভ করে ময়মনসিংহের আনন্দমহন কলেজে প্রাণিবিদ্যা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান হিসেবে যোগদান করেন। সেখানে চাকরির ৫ মাসের মাথায় গত ৯ মে অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব লাভ করেন। এরপর চলতি বছরের ১২ সেপ্টেম্বর কলেজ জীবনের প্রথম লেখাপড়া যে কলেজে শুরু করেছিলেন সেখানে অর্থাৎ চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজে অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদান করেন।

গতকাল তার দপ্তরে (অধ্যক্ষের কার্যালয়ে) বসে তিনি স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবেগ আপ্লুত হয়ে বলেন, ছাত্র-শিক্ষক হিসেবে সব মিলিয়ে এ কলেজে আমি বিচরণ করেছি ২৩ বছর। কলেজের প্রতিটি ইট-কাঠ, পাথর, দেয়াল ও ঘাসের সাথে আমার নাড়ির সম্পর্ক জড়িয়ে আছে। আমি বেশ কিছুদিন আগে প্রচণ্ড অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম। ভেবেছিলাম পৃথিবীর মায়া ছেড়ে হয়তো পরপারে পাড়ি জমাতে হবে। অবশেষে চুয়াডাঙ্গার মানুষের (আমার ছাত্র-শিক্ষক, সহপাঠী) দোয়া ও আল্লাহর অশেষ মেহেরবানিতে আমি সুস্থ হয়ে উঠি। তাই জীবনের বাকি দিনগুলো যেন এখানে কাটাতে পারি সেই দোয়া কামনা করি সকলের কাছে। স্মৃতিচারণের এক পর্যায়ে তিনি আরো বলেন, আমি যখন চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজের বিজ্ঞান বিভাগে পড়ালেখা করতাম। তখন তো আর আজকের দিনের মতো প্রাইভেটের কোনো বালাই ছিলো না। কোনো সমস্যা হলে কলেজের পাশেই অধ্যাপক সিদ্দিকুর রহমান স্যারের বাসায় ছুটে যেতাম। রাত নেই দিন নেই যখন ইচ্ছা তখন। একদিন বিকেলে আমরা কয়েকজন ছাত্র প্রাণিবিদ্যার একটি বিষয়ে জানার জন্য সারের বাসায় গিয়েছিলাম। দেখি স্যার খালি গায়ে বসে আছেন। আমরা তখন ফিরে চলে আসতে যাচ্ছি। কিন্তু সিদ্দিক স্যার আমাদের দেখে ফেলে ডেকে বললেন এই তোমরা আসো। সংকোচ সত্ত্বেও আমরা বসলাম। স্যার সেই অবস্থায় খালি গায়ে বসেই আমাদের সমস্যার সমধান করে দিলেন। এ ধরনের অসংখ্য দিন আমরা স্যারের বাসায় গেছি। কোনো দিন আমাদের প্রতি রাগান্বিত হননি স্যার। আজ চাকরি জীবনের শেষ দিকে এসে স্যারদের সে মহানুভবতা আমাকে আন্দোলিত করে। পরম স্নেহের পরশ বুলিয়ে দেয় অব্যক্ত ভালোবাসায়। এসব কথা বলতে বলতে তিনি (রহমত স্যার) অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠলেন।

সব শেষে অশ্রু সংবরণ করে কলেজের লেখাপড়া ও শিক্ষার বিষয়ে তিনি কলেজের অভিভাবকদের উদ্দেশে বলেন, চুয়াডাঙ্গায় উচ্চ শিক্ষার পরিবেশ তৈরি হয়েছে, আরো হচ্ছে। এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে আপনাদের সন্তানদেরকে মানুষের মতো মানুষ করে গড়ে তুলুন। আর সন্ধ্যার আগেই আপনার সন্তান বাসায় ফিরেছে কি-না, নিয়মিত পড়ালেখা করছে কি-না, কলেজে নিয়মিত ক্লাস করছে কি-না তা সার্বক্ষণিকভাবে খোঁজ নেবেন। আর আমার জন্য দোয়া করবেন। কলেজের লেখাপড়ার মান যেন আরও উন্নত করতে পারি।

উল্লেখ্য, প্রফেসর অধ্যক্ষ রহমত আলী চুয়াডাঙ্গার জীবননগরের উথলী গ্রামের মরহুম এরশাদ আলী বিশ্বাস ও আশরাফুন নাহারের দ্বিতীয় পুত্র এবং চুয়াডাঙ্গা পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান অ্যাড. আশরাফ আলী বিশ্বাসের ছোট ভাই। বর্তমানে  তিনি চুয়াডাঙ্গা পলাশপাড়াস্থ বাসায় বড় ভাইয়ের সাথে একত্রে বসবাস করছেন। সংসার জীবনে তিনি তিন কন্যাসন্তানের জনক। স্ত্রী গৃহিণী। প্রথম কন্যা ঢাকার ইউডা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের শেষবর্ষে, দ্বিতীয় মেয়ে ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পশুপালন বিভাগের দ্বিতীয়বর্ষে অধ্যয়নরত এবং ছোট মেয়ে চুয়াডাঙ্গা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ২০১৩ সালের জেএসসি পরীক্ষার্থী।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *