ইসির সংলাপে বিএনপির আগ্রহ নির্বাচনকালীন সরকারে

স্টাফ রিপোর্টার: সংসদ ভেঙে সহায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন করাসহ প্রায় দেড় ডজন প্রস্তাবনা নিয়ে আজ নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সাথে সংলাপে বসছে বিএনপি। বেলা ১১টায় নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে সংলাপ অনুষ্ঠিত হবে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কেএম নুরুল হুদার সভাপতিত্ব সংলাপে নির্বাচন কমিশনারসহ ইসির ভারপ্রাপ্ত সচিবও উপস্থিত থাকবেন। আর বিএনপি প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেবেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বিএনপির এক সিনিয়র নেতা জানান, বর্তমান ইসি সরকারের নির্দেশনার বাইরে গিয়ে দলের প্রস্তাবগুলো আমলে নেবে এমনটা মনে করে না বিএনপি। শুধু নিয়ম রক্ষার্থে নির্বাচন কমিশনের আমন্ত্রণে সংলাপে অংশ নিচ্ছে তারা। আর সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য নির্বাচন। হকমিশনকে নিরপেক্ষ থাকতে দিক নির্দেশনাসহ প্রায় দেড় ডজন প্রস্তাবনা তুলে ধরবে বিএনপি। তবে সহায়ক সরকারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করলেও রূপরেখা সংলাপে দেয়া হবে না।

সংলাপের জন্য বিএনপি তৈরি করা প্রস্তাবনা বিষয়ে জানা যায়, নির্বাচনকালে সংসদ ভেঙে দেয়া, নির্বাচনের সাত দিন আগে বিচারিক ক্ষমতা দিয়ে সেনা মোতায়েন, বিতর্কিত ইভিএম পদ্ধতি না রাখা, ২০০৮ সালের আগের সীমানা নির্ধারণ কার্যকর করাসহ অন্তত দেড় ডজন প্রস্তাব নিয়ে নির্বাচন কমিশনে যাচ্ছে বিএনপি।

প্রস্তাবনায় প্রশাসনের সর্বস্তরে রদবদলে ইসির কার্যকর ভূমিকা ছাড়াও গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশে (আরপিও)’ল ইনফোর্সিং এজেন্সি’ হিসেবে সেনাবাহিনীকে যুক্ত করাসহ একাধিক বিষয়ে সংশোধনীর প্রস্তাবও থাকবে।

দলের প্রস্তাবনায় রয়েছে- নির্বাচন কমিশনকে নিজস্ব সচিবালয় ও মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এবং সবপর্যায়ের নির্বাচনী কর্মকর্তা অর্থাৎ রিটার্নিং অফিসার, সহকারী রিটার্নিং অফিসার, আপিল কর্তৃপক্ষ, প্রিজাইডিং অফিসার, সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার, পোলিং অফিসার, আইনশৃঙ্খলা রাকারি কর্মকর্তা, রেজিস্ট্রেশন অফিসার, সহকারী রেজিস্ট্রেশন অফিসার, রিভাইজিং অথরিটি, নির্বাচন কাজে নিয়োজিত বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে। নির্বাচন কমিশন সচিবালয় ও মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে রাজনৈতিক দলের প্রতি প্রকাশ্য আনুগত্য পোষণকারী কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করে প্রত্যাহার এবং প্রত্যাহারকৃত কর্মকর্তাদের যেকোনো ধরনের নির্বাচনী দায়িত্বপালন হতে বিরত রাখতে হবে। নির্বাচন কমিশন সচিবালয় ও তাদের মাঠপর্যায়ের যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারী বিগত ২০০৮ ও ২০১৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন পর্যায়ের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ও অন্যান্য নির্বাচনী বিধিবিধানের ব্যত্যয় ঘটিয়েছেন তাদের তালিকা প্রণয়ন করতে হবে এবং তাদের নির্বাচনী কার্যক্রম থেকে বিরত রাখতে হবে। প্রেষণে নির্বাচনী দায়িত্বে নিয়োজিত প্রকাশ্য রাজনৈতিক মতাবলম্বী নির্বাচনী কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করতে হবে।

একটি কমিটি গঠন করে বিগত ২০০৮ ও ২০১৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন পর্যায়ের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রেষণে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে প্রকাশ্য দলীয় আনুগত্য পোষণকারীদের চিহ্নিত করে তালিকা প্রণয়ন করতে হবে। ওই সব চিহ্নিত কর্মকর্তাদের ভবিষ্যতে অন্য যেকোনো নির্বাচনী দায়িত্ব পালন থেকে বিরত রাখতে হবে। সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে ইসি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার সময় মাঠপর্যায়ে কর্মরত জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারদের প্রত্যাহার করে নতুন কর্মকর্তা পদায়নের ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। নতুন কর্মকর্তা পদায়নে বিগত পাঁচ বছর বিভিন্ন পদমর্যাদায় ওই জেলায় চাকরিরত ছিলেন এমন কর্মকর্তাদের একই জেলায় জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার পদে পদায়ন করা যাবে না, একইভাবে ইসি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার সময় প্রত্যেক উপজেলা এবং থানায় কর্মরত উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের প্রত্যাহার করে নতুন কর্মকর্তা নিয়োগের ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

ইতোপূর্বে কোনো সময় যে কোনো পদমর্যাদায় ওই উপজেলা বা থানায় চাকরিরত ছিলেন এমন কোনো কর্মকর্তাকে একই উপজেলায় বা থানায় নিয়োগ দেয়া যাবে না, নির্বাচনের সময়সূচি ঘোষণার প্রাক্কালে নির্বাচনের সাথে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় যেমন- স্বরাষ্ট্র, অর্থ, তথ্য, জনপ্রশাসন, স্থানীয় সরকার, শিক্ষা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা, পররাষ্ট্র এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় সংবিধানের ১২৬ অনুচ্ছেদ ও গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২ এর ৫ অনুচ্ছেদ অনুসারে নির্বাচন কমিশনের চাহিদা অনুযায়ী কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বাধ্য থাকতে হবে। সাধারণ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার তারিখ থেকে নির্বাচিত নতুন সরকার দায়িত্ব না নেয়া পর্যন্ত এ ব্যবস্থা বলবৎ থাকবে।

প্রস্তাবে আরও রয়েছে ভোট গ্রহণের আগে বিভিন্ন বুথে খালি বাক্স সরবরাহের পর অবশিষ্ট শূন্য ব্যালট বাক্সগুলো (যদি থাকে) এমন নিরাপদ স্থানে রাখতে হবে, যাতে তা প্রার্থী অথবা নির্বাচনী এজেন্ট অথবা পোলিং এজেন্টদের কাছে দৃশ্যমান থাকে। ভোট চলাকালে ব্যালট বাক্স পরিপূর্ণ হয়ে গেলে ব্যালট ভর্তি বাক্স বা বাক্সগুলো সংশিস্নষ্ট বুথেই রাখতে হবে যাতে তা সংশিস্নষ্ট সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার এবং নির্বাচনী এজেন্ট এবং অথবা পোলিং এজেন্টদের কাছে দৃশ্যমান থাকে।

ভোট শেষে ব্যালট গণনার জন্য কেবল ভোটগ্রহণে ব্যবহূত ব্যালট বাক্সগুলো খোলা হবে। প্রিজাইডিং অফিসার তার স্বাক্ষরিত ফলাফল শিট ভোটকেন্দ্রে পোলিং এজেন্টকে হস্তান্তর না করে ভোটকেন্দ্র ত্যাগ করবেন না। কেন্দ্রভিত্তিক এজেন্টদের তালিকা ও তাদের নমুনা স্বাক্ষর নির্বাচনের দিনের আগেই কমিশন প্রার্থীর কাছ থেকে সংগ্রহ করবে এবং তা গোপন রাখতে হবে। প্রত্যেক কেন্দ্রে ভোট গণনার সময় ওই কেন্দ্রের প্রত্যেক বুথে প্রার্থী কর্তৃক নিযুক্ত পোলিং এজেন্টকে অবশ্যই উপস্থিত রাখতে হবে, ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার সাথে সাথে ভোট গণনা শুরু করতে হবে। ভোটগ্রহণ শেষ হওয়া এবং ভোট গণনা শুরুর মধ্যবর্তী সময়ে কোনো বিরতি দেয়া যাবে না।

প্রস্তাবনায় নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্বিন্যাসের বিষয়টিও থাকবে। বিএনপি মনে করছে, ১৯৮৪ সাল থেকে বজায় থাকা সংসদীয় সীমানা ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে তৎকালীন কমিশন কারো কোনো দাবি না থাকা সত্ত্বেও একক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছে। জনসংখ্যার ভিত্তিতে সীমানার ওই পুনর্বিন্যাসের ফলে শতাধিক আসনে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। বিএনপি এখন ভোটার অনুপাতে সীমানা পুনর্বিন্যাস কিংবা ২০০৮ সালের আগের পদ্ধতিতে ফিরে যাওয়ার বিষয়টিতে জোর দেবে।

বিএনপির দাবির মধ্যে আরো থাকছে গণমাধ্যম কর্মীদের সব কেন্দ্রে উন্মুক্ত প্রবেশাধিকার, নির্বাচন কমিশন কর্মকর্তাদের ম্যাজিস্ট্রেরিয়াল ক্ষমতা প্রদান করতে হবে, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার অব্যবহিত পর থেকে নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক ফলাফল ঘোষণা পর্যন্ত নির্বাচনী আইন, আচরণবিধি ও অন্যান্য নির্বাচনী বিধিবিধান ভঙ্গের অভিযোগপত্র এবং নির্বাচন সংশ্লিষ্ট যেকোনো বিষয়ে দাখিলকৃত অভিযোগপত্র গ্রহণ ও লিখিত প্রাপ্তি স্বীকার করতে হবে, তাৎণিকভাবে কার্যকর প্রতিবিধান করতে হবে এবং গৃহীত কার্যক্রম জনসম্মুখে প্রকাশ করতে হবে।

সূত্রমতে, নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সংলাপে প্রস্তুতি নিতে এ পর্যন্ত বিএনপির সিনিয়র নেতারা একাদিক বৈঠক করেছেন। একটি বৈঠকে সংলাপের তারিখ পরিবর্তনের জন্য আবেদন করারও সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু পরবর্তীতে সে সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে। এছাড়া শুক্রবারও সিনিয়র নেতারা বৈঠক করে প্রস্তাবনার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি। শনিবার রাতে লন্ডনে অবস্থানরত দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে টেলিফোনে আলোচনা করে প্রস্তাবনা এবং দলের কোনো কোনো সদস্য সংলাপে অংশ নেবে তা ঠিক করেন দায়িত্বপ্রাপ্ত এক সিনিয়র নেতা।

সংলাপের বিষয়ে শনিবার দুপুরে নয়া পল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে নিজের চেম্বারে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, সংলাপের বিএনপির স্থায়ী কমিটির সব সদস্যরা যাচ্ছেন। নির্বাচন কমিশন ১০ জনের কথা বললেও বিএনপি স্থায়ী কমিটির সব সদস্যের কথা জানিয়ে চিঠি দিয়েছে।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, সংলাপে একাদশ সংসদ নির্বাচন নিরপেক্ষ করতে বিএনপি একটি ‘সামগ্রিক প্রস্তাবনা’ তুলে ধরবে। সেখানে লিখিতভাবে দলের সব প্রস্তাব উত্থাপন করা হবে। তাতে, সংসদ বিলুপ্তি, সেনাবাহিনী নিয়োগ ছাড়াও নির্বাচনকালীন সময়ে যখন তফসিল ঘোষণা হবে, তখন প্রশাসনকে যে ব্যবস্থাগুলো নিতে হবে সে বিষয়গুলো থাকবে। এছাড়া আরপিওর কোথায় সমস্যা আছে সেটা বলার পাশাপাশি ভোট প্রদানের ক্ষেত্রে কী কী নিয়ম চালু করা উচিত সেসবের ডিটেলস প্রস্তাবনায় থাকবে।

সহায়ক সরকারের রূপরেখা দেয়া হবে কিনা জানতে চাইলে মির্জা আলমগীর বলেন, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় থাকলে নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়ার সম্ভাবনা নেই তা কমিশনে বলা হবে। তবে সংলাপে নির্বাচন কমিশনের কাছে সহায়ক সরকারের রূপরেখা দেয়া হবে না। রূপরেখাটা পরে দেয়া হবে।

প্রসঙ্গত, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে পরামর্শ পেতে গত ৩১ জুলাই সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সাথে বসার মধ্যদিয়ে শুরু হয় নির্বাচন কমিশন। এর ১৬ ও ১৭ আগস্ট গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময়ের পর ২৪ আগস্ট থেকে শুরু হয় নিবন্ধিত ৪০টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ধারাবাহিক সংলাপ। নিবন্ধনক্রমের নিচ থেকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। সে হিসেবে বিএনপির জন্য ১২ অক্টোবর ও আওয়ামী লীগের জন্য ১৫ অক্টোবর সংলাপের তারিখ প্রস্তাব করা হয়। কিন্তু বিএনপি দলীয় কর্মসূচির কথা বলে ১৫ অক্টোবর বসতে চাইলে তাদের জন্য সেইদনিই ঠিক হয়। আওয়াম লীগের অনুরোধ তাদের সংলাপের জন্য ১৮ অক্টোবর তারিখ রাখা হয়।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *