আস্তানা ছাড়েনি পাখিটি : মানুষ দেখেই বললো সাবধান

0
35

 

সমতলেরমানুষ তো বটেই : পাহাড়ী জনগোষ্ঠীরও সেখানে যাওয়া ছিল মানা

 

স্টাফ রিপোর্টার:চারদিকেশুধু ঘন বৃক্ষরাজি, ঝোঁপঝাড়। দিনের আলোও সেখানে প্রবেশ করে না। গা ছমছমকরা বিভিন্ন কীটপতঙ্গের শব্দে শুধুই আতঙ্ক। সাড়ে তিন হাজার একর জমির ওপরসাতছড়ি জাতীয় এ উদ্যানে ছোটবড় পাহাড়ের সংখ্যা তিন শতাধিক। এর মধ্যে কমপক্ষেঅর্ধশত পাহাড় এক সময় ছিলো ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের নিয়ন্ত্রণে। বহু বছরধরেই এ পাহাড়গুলোকে তারা ব্যবহার করেছে নিজেদের আস্তানা হিসেবে। সমতলেরমানুষ তো বটেই, পাহাড়ী জনগোষ্ঠীরও সেখানে যাওয়া ছিলো মানা। অনেক পাহাড়েপ্রবেশের পথে বড় করে লেখা রয়েছে বিনা অনুমতিতে প্রবেশ নিষেধ। এমনই সব পাহাড়এখন জনমানবশূন্য। পাহাড়ের চূড়ায় অসংখ্য বাড়িঘর দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যক্ত।রোববার থেকে সমতলের প্রায় আধা কিলোমিটার দূরত্বে র‌্যাব সদস্যরা দুটিপাহাড়ে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ সমরাস্ত্র এবং গোলাবারুদ উদ্ধার করেছে।বাকি পাহাড়গুলোতে অনুসন্ধানের প্রস্তুতি নিচ্ছে র‌্যাবসহ আইনশৃংখলা বাহিনীরসদস্যরা।

গতকাল শুক্রবার সরেজমিন পরিদর্শনে দেখে গেছে, পাহাড়েরচূড়ায় গিয়ে দেখা যায়, ঝোপঝাড়ের ভেতর পরিত্যক্ত অনেক বাড়ি। আশপাশে রয়েছেনিরাপত্তা চৌকিসহ বেশ কিছু বাংকার। বৃষ্টিপাতে বাংকের মাটি ধসে আংশিক বন্ধহয়ে গেছে। পাহাড়ী জনগোষ্ঠীর কাছে উগ্রপন্থী টিলা নামে পরিচিত একটি পাহাড়েগিয়ে দেখা মিলল অনেক আগে তৈরি করা বিচ্ছিন্নতাবাদী বা বিপ্লবীদের মূলঘাঁটি। বাড়ি এবং ক্যাম্পের চারপাশে রয়েছে বিশাল ঝোঁপঝাড়। সাপ ও বানরের দেখামিলল সেখানে। দীর্ঘদিনের পরিত্যক্ত বাড়ির স্যাঁতসেঁতে উঠানে নামতেই ভয়ঙ্করএকটি শব্দে সবাই আঁতকে ওঠে। সাবধান, সাবধান। কখনও অনুমান হচ্ছিলো মানুষের শব্দ আবার কখনও মনে হচ্ছিলো এটিপাখি বা বন্যপ্রাণীর ডাক। ত্রিপুরা পল্লি থেকে পাহাড়মুখী হওয়ার সময়ই টিমেরসঙ্গী বন্য কুকুরও শব্দে কিছুটা দিশেহারা। শব্দের উৎসের সন্ধানে কুকুরওশুরু করে ছোটাছুটি। কুকুরের পেছনে গিয়েই পাওয়া গেলো শব্দের উৎসস্থল। ময়নারআদলে একটি পাখি এভাবেই ডাকছিলো। কোনো এক সময়ে পোষমানা পাখিটিকে হয়তো সাবধানশব্দটি শিখিয়ে দেয়া হয়েছিলো। পাখিটি মালিক সাথে না থাকলেও শেখানো শব্দটিভুলতে পারেনি। হতে পারে বিচ্ছিন্নতাবাদীরাই নিজেদের স্বার্থে পাখিটি পোষমানিয়েছিলো। আস্তানা ফেলে যাওয়ার সময় ছেড়ে দিয়ে গেছে পাখিটিকে।বিচ্ছিন্নতাবাদীরা চলে গেলেও আস্তানা ছাড়েনি পাখিটি। হয়তো মানুষ দেখেইশেখানো বুলি আওড়ানো শুরু করেছে সাবধান সাবধান।

উঠোন পেরিয়ে ঘরে প্রবেশকরতেই পাওয়া গেলো বিচ্ছিন্নতাবাদীদের গোপন জীবনের নানা প্রমাণ। আধভাঙাডাইনিং টেবিল। ডাইনিং রুমের পাশে কিচেনে যেতেই দেখা গেলো বিশাল আকৃতিরকয়েকটি চুলো। এ থেকেই অনুমান করা যায় এ আস্তানায় এক সময় লোক সমাগম ছিলো অনেকবেশি। ঘরের ভেতর পাওয়া গেলো ইংরেজি ও ত্রিপুরী ভাষায় সশস্ত্র প্রশিক্ষণেরবিভিন্ন বই, উগ্রপন্থীদের নিয়ে ভারতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্টের কাটিং, আইন-চিকিৎসার বইসহ অস্ত্র ও গোলাবারুদ রাখার বিভিন্ন বেল্ট ও খাঁপ। পাহাড়েরওপর মূল এ আস্তানা ঘিরে অসংখ্য বাংকার। প্রায় আধা ঘণ্টা অবস্থানের পরউগ্রপন্থী টিলা থেকে নেমে কথা হয় ত্রিপুরা পল্লির জনগণের সাথে। পাহাড়েরচূড়ায় বাংকারের কথা বলতেই এক বৃদ্ধ বললেন সে অনেক আগের কথা। একসময়বিপ্লবীরা এখানে এসে আশ্রয় নিতো। গোপনে থেকে আবার চলেও যেতো। তার দীর্ঘ জীবনেকোনো দিন এ পাহাড়ে গুলির শব্দ শুনেননি। ট্রেনিংয়ের জন্য কাউকে দৌড়ঝাঁপওকরতে দেখেননি।

ত্রিপুরাপল্লীর পার্শ্ববর্তী লাল টিলায় ফিরে কথা হয় র‌্যাব সদস্যদের সাথে। ওইটিলাতেই গত চার দিন ধরে অভিযান চালাচ্ছে র‌্যাব। ওই টিলায় একটি বাংকারথেকেই উদ্ধার হয়েছে সমরাস্ত্র ও গোলাবারুদ। সেখানে আরও সাতটি বাংকারে এখনওখোঁড়াখুঁড়ি চলছে। লাল পতাকা উড়িয়ে র‌্যাব সদস্যরা সেখানে সতর্ক প্রহরায়রয়েছেন। ওই টিলায় দায়িত্বরত র‌্যাব কর্মকর্তা এসআই কাজল জানান, তারা অভিযানস্থলের বাইরে অন্য কোনো টিলায় এখনও যাননি। সেসব টিলায় কি আছে নাআছে তা তাদের জানা নেই।

ত্রিপুরা পল্লির বাসিন্দারা যা বললেন : নামপ্রকাশ না করার শর্তে ত্রিপুরা পল্লির একাধিক বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করেবলেছেন, এসব পাহাড়ে বিচ্ছিন্নতাবাদীরাঅনেক আগে মাঝেমধ্যে আসতো।একথা প্রায় কেউ জানত না। ওই বাসিন্দারা বলেন, বিচ্ছিন্নতাবাদীরা এসব টিলায়এসে দুএকদিন করে থাকলেও তাদের পল্লির অধিকাংশই জানত না। যে দুএকজন জানতভয়ে মুখ খুলতো না। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের নিরাপত্তার কথা ভেবে তারানীরবতা পালন করেছেন। ত্রিপুরা পল্লির বাসিন্দারা বলেন, ২০০৫ সালের পর থেকেতাদের আনাগোনা প্রায় বন্ধই হয়ে যায়। এ সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এসব এলাকায় জোরতল্লাশি শুরু করে। ২০০৭ সালের পর থেকে একদম শান্ত। এরপর থেকেবিচ্ছিন্নতাবাদী বা বিপ্লবী কারও দেখা মেলেনি এ এলাকায়। তবে একটা সময় ছিলোচাপে বা লোভে পড়ে ত্রিপুরা পল্লির কেউ কেউ হাত মেলায় বিচ্ছিন্নতাবাদীসংগঠনের সদস্যদের সাথে। বিনিময়ে তারা প্রতিমাসে মোটা অংকের টাকাও পেয়েছে।সেই টাকার জোরে ভাগ্যবদলানোর রেশ এখনও বিদ্যমান। যে হাত মিলিয়ে টাকাবানিয়েছে সেই নেই। তবে তার পরিবারের সদস্যরা আরামে দিন কাটাচ্ছে। তার নমুনাদেখা মিললো সরেজমিনে গিয়ে।পেশায় বন বিভাগের ভিলেজার (বন পাহারাদার)হলেও তাদের ঘরে গিয়ে দেখা যায় আভিযাত্যের ছোঁয়া। বিদ্যুৎ না থাকলেও সৌরবিদ্যুৎ সংযোগ রয়েছে প্রায় ঘরেই। এ পল্লিতেই সোমবার দুটি বাংকার আবিষ্কারকরে র‌্যাব। এর একটি ওই পল্লির বাসিন্দা সুরেষ দেব বর্মার মালিকানাধীন ঘরেরনিচে। অপরটি শম্ভু দেব বর্মার মালিকানাধীন বাড়ির নিচে অবস্থিত। প্রথমটিতেকিছু না পেলেও দ্বিতীয়টিতে মিলেছে সেনাবাহিনীর পোশাকের আদলে বিপুল পরিমাণকাপড়, বোতাম, সেলাই মেশিন, বিভিন্ন বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনের লিফলেট, তাদেরভাষায় রাজস্ব (চাঁদা) আদায়ের রসিদ, বিভিন্ন বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনের প্যাড।

ত্রিপুরাপল্লীতে আভিযাত্যের ছোঁয়া : অনুসন্ধানের এক পর্যায়ে জানা গেলো এ পল্লিরইবাসিন্দা সচিত্র দেববর্মার ছেলে আশীষ দেববর্মা বিলাসী জীবনযাপনের মোহে বিংশশতাব্দীর শুরুতে বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন এটিটিএফর (অল ত্রিপুরা টাইগারফোর্স) সাথে হাত মিলায়। ত্রিপুরা পল্লীর তৎকালীন হেডম্যান (তাদের মন্ত্রী)চাচা যোগেশ দেববর্মার মাধ্যমেই এ দলে ভিরে। এর পরেই রাতারাতি তার ভাগ্যেরচাকা ঘুরে যায়। এরপর তাকে আর পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি। এটিটিএফর টাকায় একটিট্রাক কিনে। যার নম্বর ঢাকা মেট্রো ট-১১-৩৩৬৬। এ ট্রাকে করেই ওই সময়সাতছড়ির বিচ্ছিন্নতাবাদীদের আস্তানা থেকে সমরাস্ত্র ও গোলাবারুদ পৌঁছে দিতোদেশের অন্যান্য অঞ্চলে থাকা বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনের হাতে। আনারসসহবিভিন্ন ফল বোঝাই ট্রাকে করে অস্ত্র সরবরাহ করা হতো। এমনই একটি চালান ২০০৩সালের ২৬ জুন বগুড়ার কাহালুতে ধরা পড়ে। ট্রাকের চালক আলতু মিয়া ধরা পড়লেওপালিয়ে যায় আশীষ দেববর্মা। এরপর থেকেই সে মূলত পলাতক। তবে মাঝে মাঝেপল্লিতে যাতায়াত করতো বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। গতকালশুক্রবার ওই পল্লিতে আশীষদেববর্মার বাড়িতে গিয়ে এর সত্যতা মিলেছে। বাড়ির বাড়ান্দায় পাওয়া গেছে তারব্যবহৃত নম্বারবিহীন একটি মোটরসাইকেল। সুসজ্জিত তার ঘরে রয়েছে দামি কয়েক সেটসোফাসহ অন্যান্য আসবাবপত্র। ওই সময় এখানে মাঝেমধ্যেই সেবিচ্ছিন্নতাবাদীদের নিয়ে বৈঠক করতো এমন তথ্যও মিলেছে।

যেভাবে অস্ত্র ওগোলাবারুদ আসতো : স্থানীয় সূত্রগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ভারত থেকে মশারকয়েল তৈরির প্রধান উপকরণ মেন্দা গাছের ছালভর্তি বস্তার ভেতর করেই অনা হতোঅবৈধ অস্ত্র। ভারত থেকেই তারা এ অস্ত্রগুলো সাতছড়ির এ গহীন অরণ্যে নিরাপদআস্তানায় নিয়ে আসে। কৌশলে বিডিআর সদস্যদের চোখ ফাঁকি দিয়ে আনা হতো এ ধরনেরবস্তা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here