অশ্রুসিক্ত স্বজনদের হাতে প্রিয়জনের লাশ

কফিনে ফিরেছে ওরা ২৩ জন কাঁদছে বাংলাদেশ

স্টাফ রিপোর্টার: ‘কেন দূরে চলে গেলে’ বলেই আর্মি স্টেডিয়ামে কান্নায় ভেঙে পড়লেন সুলতানা আক্তার। তার বুকে তখন স্বামী নুরুজ্জামানের ছবি। গতকাল সোমবার ১০ বছর বয়সী ছেলে হামিম ও স্বজনদের নিয়ে স্বামীর লাশ নিতে এসেছিলেন তিনি। সুলতানার মতো আরও ২২ জনের স্বজনরা প্রিয়জনের লাশ নিতে গতকাল সোমবার আর্মি স্টেডিয়ামে জড়ো হয়েছিলেন। তাদের প্রিয় মানুষগুলো কাঠমান্ডুতে বিমান দুর্ঘটনায় নিহত হন। লাশ নেয়ার সময় স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে গোটা আর্মি স্টেডিয়ামের আকাশ-বাতাস। সৃষ্টি হয় হৃদয়বিদারক পরিবেশের। এর মধ্যদিয়ে টানা সাত দিনের অনাকাঙ্ক্ষিত অপেক্ষার সমাপ্তি ঘটেছে স্বজনদের। সুলতানার মতো নিহতদের স্বজনদের পাশাপাশি সারা দেশের মানুষের মনে বাজছে বিষাদের সুর। তারা সবাই ১২ মার্চ নেপালের কাঠমান্ডু ত্রিভুবন বিমানবন্দরে ইউএস-বাংলার বিধ্বস্ত হওয়া একটি উড়োজাহাজের যাত্রী ছিলেন। গতকাল সোমবার দুপুর আড়াইটায় কাঠমান্ডু থেকে ২৩ জনের মরদেহ নিয়ে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি বিশেষ উড়োজাহাজ দেশের উদ্দেশে রওনা দেয়। বিকেল ৪টায় ওই বিমানটি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে পৌঁছে। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বিমানবন্দরে নিহতদের মরদেহ আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করেন।

এ সময় ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের বলেন, আমরা নিহতদের স্বজনদের পাশে আছি, পাশে থাকব। তাদের স্বজনদের সব ধরনের সহযোগিতা দেয়া হবে। এ সময় বিমান পরিবহনমন্ত্রী একেএম শাহজাহান কামালও উপস্থিত ছিলেন। সোয়া ৪টার দিকে উড়োজাহাজ থেকে প্রথমেই নামানো হয় তাহিরা তানভিন শশী রেজা ও বেগম হুরুন নাহার বিলকিস বানুর লাশের কফিন। এরপর একে একে সবার লাশ নামিয়ে ১৯টি লাশবাহী গাড়িতে উঠানো হয়। এরপর লাশবাহী গাড়িগুলো বনানীর আর্মি স্টেডিয়ামের উদ্দেশে রওনা হয়। ওই সময় স্টেডিয়ামে অপেক্ষা করছিলেন স্বজনরা। বিকেল ৫টা ১০ মিনিটে লাশবাহী গাড়িগুলো সেখানে পৌঁছুনোর পরপরই কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বজনরা। চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি সেখানে উপস্থিত অন্যরাও। বিশেষ করে জানাজার পর যখন স্বজনরা কফিনের কাছে যান কেউ নিজেকে সামলাতে পারছিলেন না। কফিন জড়িয়ে হাউমাউ করে কেঁদে উঠেন তারা। কান্নায় ভারী হয়ে উঠে সেখানকার আকাশ-বাতাস।

এদিকে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়। পরে আর্মি স্টেডিয়ামে সর্বস্তরের মানুষের উপস্থিতিতে জানাজা সম্পন্ন হয়। তারপর আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে লাশগুলো স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

বিমান দুর্ঘটনায় নিহত যাত্রীদের যেসব স্বজন কাঠমান্ডুতে গিয়েছিলেন, গতকাল সোমবার ইউএস-বাংলার একটি বিশেষ উড়োজাহাজে তাদের দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। তারাসহ দেশে থাকা পরিবারের অন্য স্বজনরাও দুপুরের পর থেকেই আর্মি স্টেডিয়ামে জড়ো হতে শুরু করেন। আসরের নামাজ শেষ হলে বিকাল ৫টা ১০ মিনিটে লাশবাহী গাড়ি থেকে সেনাবাহিনীর সদস্যরা কাঁধে কফিন নিয়ে আর্মি স্টেডিয়ামে স্থাপিত মঞ্চের ওপর সারি করে রাখেন।

এরপর জানাজা শেষে রাষ্ট্রপতির পক্ষে তার সামরিক সচিব মেজর জেনারেল সরোয়ার হোসেন, প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এবং স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী কফিনে ফুল দিয়ে নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। এছাড়া আওয়ামী লীগ-বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং আপামর জনতা একে একে শ্রদ্ধা জানায়। শ্রদ্ধা জানানো শেষে মৃতদের নাম মাইকে ঘোষণা করে তাদের স্বজনদের লাশ বুঝে নিতে মঞ্চে ডাকা হয়। অবশ্য তার আগেই লাশের দায়িত্বে থাকা মৃতদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে তার পাসপোর্ট নম্বর, জাতীয় পরিচয়পত্র, নাম-ঠিকানা, পরিবারের সদস্যদের নাম-পদবিসহ প্রয়োজনীয় তথ্যাদি মিলিয়ে নেন। লাশ গ্রহণের সময় পরিবারের পক্ষ থেকে একজন স্বাক্ষর করেন।

মাওলানা মাহমুদুর রহমানের পরিচালনায় জানাজায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এএইচ মাহমুদ আলী, পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল, বিমানমন্ত্রী একেএম শাহজাহান, বিএনপি নেতা মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ, এয়ার ভাইস (অব.) আলতাফ হোসেন, খায়রুল কবির খোকন, ছাত্রলীগের সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ, সাধারণ সম্পাদক এসএম জাকির হোসাইন, বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি আতিকুর রহমান, তিন বাহিনীর প্রধানসহ সিনিয়র সামরিক কর্মকর্তা এবং অগণিত জনতা অংশ নেন।

হতাহতদের স্বজনদের সঙ্গে দেখা করবেন প্রধানমন্ত্রী: লাশ হস্তান্তর অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও অনিবার্য কারণবশত তিনি আসতে পারেননি। তবে, জানাজা শেষে ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের বলেন, হতাহতদের পরিবারের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শিগগির দেখা করবেন। দ্রুতই তাদের গণভবনে ডেকে কথা বলবেন প্রধানমন্ত্রী।

শেষবিদায় জানাতে উপস্থিত ছিলেন মেহেদিও: নেপালের বিমান দুর্ঘটনায় বেঁচে যাওয়া মাহমুদুল হাসান মেহেদিও আর্মি স্টেডিয়ামে জানাজায় অংশ নিতে এসেছিলেন। তাকে ঢাকায় ফিরিয়ে নিয়ে এসে ঢাকা মেডিকেল কলেজে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। সেখান থেকে অসুস্থ অবস্থায়ই জানাজায় যোগ দিতে উপস্থিত হন আর্মি স্টেডিয়ামে। হাতে স্যালাইন দেয়ার ক্যানোলা, ঘাড়ে আলাদা সাপোর্ট নিয়ে আসা মেহেদি সাংবাদিকদের বলেন, ‘ভাই আর বাবুটাকে শেষবিদায় জানাতে এসেছি।’ প্রসঙ্গত, স্ত্রী, ফুফাতো ভাই ফটোসাংবাদিক প্রিয়ক, তার স্ত্রী ও সন্তানসহ পাঁচজন মিলে নেপালে যাচ্ছিলেন মেহেদিরা। বিমান দুর্ঘটনায় ভাই ও ভাস্তির মৃত্যু হয়।

কাঁদতে কাঁদতে মেহেদি সাংবাদিকদের আরও বলেন, উড়োজাহাজের পেছনের দিকের পাঁচটি আসনে পাশাপাশি বসেছিলেন সবাই। মেহেদি বসেছিলেন জানালার পাশে। বিধ্বস্ত হওয়ার ১০ থেকে ১৫ মিনিট আগে অবতরণের ঘোষণা দেয়া হয়। সবাইকে সিট বেল্ট বাঁধতে বলা হয়। সবাই সিট বেল্ট বাঁধেন। ঘোষণা দেয়ার পরপরই মেহেদি জানালা দিয়ে দেখেন ল্যান্ডিং গিয়ার বের হয়েছে। উড়োজাহাজটি অনেক নিচু দিয়েই উড়ছিল বেশ কয়েক মিনিট ধরে। সবই স্বাভাবিক ছিল। প্রথমে ভূমি স্পর্শ করে ছিটকে পড়ে উড়োজাহাজটি। ভেঙে যায়। মেহেদি ও তার স্ত্রী সামনের ভাঙা অংশ দিয়ে নামতে পারেন। মেহেদি নেমেই নিচে কয়েকজনকে পড়ে থাকতে দেখেন। পরে উদ্ধারকারীরা এসে তাদের নিয়ে যান।

বিদায়ের মুহূর্তে ২টি মৃতদেহ নিয়ে জটিলতা: এদিকে মৃতদেহ হস্তান্তরের পর বিদায়ের মুহূর্তে দুটি মৃতদেহের পাসপোর্ট মিলে যাওয়ায় তৈরি হয় জটিলতা। রানার গ্রুপের মৃত দুই কর্মকর্তা এসএম মাহমুদুর রহমান এবং মতিউর রহমানের কফিনের ওপর নিজেদের নাম লেখা থাকলেও দু’জনের পাসপোর্টের ঘরে একই নম্বর লেখা ছিলো। এ নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় পড়েন পুলিশ ও সেনাবাহিনীর কর্মকর্তারা। পরে রানার গ্রুপের অফিসে নিয়ে কফিন খুলে লাশ চিহ্নিত করার সিদ্ধান্ত মেনে নেন দুই পক্ষের স্বজনরা। দুর্ঘটনায় এ দু’জন ছাড়াও এ গ্রুপের নুরুজ্জামান নামের আরেক কর্মকর্তা নিহত হন।

নেপালে প্রথম জানাজা: শনাক্ত হওয়ার পর গতকাল সোমবার সকালে নেপালি কর্তৃপক্ষ কাঠমান্ডুতে বাংলাদেশ দূতাবাস কর্তৃপক্ষের কাছে ২৩ মরদেহ হস্তান্তর করা হয়। পরে দূতাবাস প্রাঙ্গণে ২৩ বাংলাদেশির প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় প্রবাসী বাংলাদেশি, বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং ইউএস-বাংলার কর্মকর্তারা অংশ নেন।

আরও এক বাংলাদেশির লাশ শনাক্ত: বিমান দুর্ঘটনায় নিহত ২৬ বাংলাদেশির মধ্যে আগেই ২৩ জনের লাশ শনাক্ত হয়। গতকাল সোমবার নজরুল ইসলাম নামে আরও এক যাত্রীর লাশ শনাক্ত করা হয়েছে। আগামীকাল বুধবার তার লাশ দেশে আনা হতে পারে বলে জানা গেছে। এদিকে আনিসুজ্জামান ও পিয়াস রায় নামে দু’জনের মরদেহ এখনও শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে তাদের লাশ শনাক্ত করা হবে। এ ক্ষেত্রে দুই থেকে তিন সপ্তাহ লেগে যেতে পারে।

১২ মার্চ কাঠমান্ডুতে বাংলাদেশের বেসরকারি বিমান সংস্থা ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের একটি উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হয়। উড়োজাহাজের ৭১ আরোহীর মধ্যে ৫১ জন নিহত হয়েছেন। আর আহত হয়েছেন ২০ জন। নিহতের মধ্যে বিমানের পাইলট, কো-পাইলট ও দু’জন ক্রুসহ বাংলাদেশের ২৬ জন, নেপালের ২৪ জন ও চীনের একজন রয়েছেন। এ ছাড়া আহতদের মধ্যে ১০ জন বাংলাদেশি, নয়জন নেপালের এবং একজন মালদ্বীপের নাগরিক রয়েছেন।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *