অন্ধকারে নির্বাচন কমিশন

স্টাফ রিপোর্টার: সংসদ বহাল রেখে নির্বাচন হবে কি-না তা নিয়ে অন্ধকারে খোদ নির্বাচন কমিশন। বিষয়টি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য এলেও শেষ পর্যন্ত সমঝোতা হবে বলেই তাদের আশা। নির্বাচন কমিশনার আবু হাফিজ এ বিষয়ে গতকাল বুধবার সাংবাদিকদের বলেন, প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য শেষ কথা নয়। নির্বাচনে সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি হয়নি। এ ব্যাপারে আইনগত ব্যবস্থা নিতে নির্বাচনকালীন সময় শুরু পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। সংসদের মেয়াদ উত্তীর্ণের পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সেই হিসেবে আগামী ২৪ অক্টোবর থেকে ২৪ জানুয়ারির মধ্যে নির্বাচন হওয়ার কথা। আর এটাকে ভিত্তি ধরেই সোমবার সচিবদের সাথে এক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, সংবিধান অনুযায়ী ২৪ জানুয়ারি পর্যন্ত সরকারের মেয়াদ আছে। এর আগের ৯০ দিন সংসদ থাকলেও এই সময় সংসদ অধিবেশন বসবে না। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সংবিধানের বর্তমান ধারা অনুসরণ করে নির্বাচনের কথা বললেও প্রধান বিরোধী দল বিএনপির এতে আপত্তি রয়েছে। নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়ে তারা বলছে, দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাবে না তারা।

এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আবু হাফিজ বলেন, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড কোথায়, কীভাবে হবে- তা যে পরিস্থিতিতে নির্বাচন হবে তার ওপর নির্ভর করবে। তবে এখনো সেটা হয়নি। তিনি বলেন, সংসদ বহাল রেখে নির্বাচন করার কথা প্রধানমন্ত্রী বলেছেন। এটা কী ফাইনাল? এটা তারা জানেন না। এটা উনার শেষ কথা কিনা তাও জানেন না। এ বিষয়টা চূড়ান্ত হলো কিনা তারা বুঝতে পারছেন না। সংসদ বহাল রেখে নির্বাচন হবে কিনা সে বিষয়টি এখনো ‘পরিষ্কার নয়’ বলে মন্তব্য করেন এই নির্বাচন কমিশনার।

হাফিজ বলেন, আল্টিমেটলি এটা রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত হবে। সংসদ বহাল থাকলে কী হবে, ভেঙে গেলে কী হবে- তা তারা জানেন না। তবে নির্বাচন প্রস্তুতি প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য ধরেই (২৪ জানুয়ারি) এগোচ্ছে বলে জানান তিনি। উনি যেভাবে বলেছেন সেভাবে করছি। চূড়ান্ত কীভাবে হবে সময় বলে দেবে। নির্বাচন এলেই বুঝবেন- কোন পরিস্থিতিতে নির্বাচন হবে।

২৪ অক্টোবরের আগে নির্বাচনের বিষয়ে কিছু হচ্ছে না জানিয়ে হাফিজ বলেন, রাজনৈতিক সমঝোতার দিকে কমিশন তাকিয়ে রয়েছে। নির্বাচনে প্রধান বিরোধী দল বিএনপির অংশগ্রহণের আশা রেখে তিনি বলেন, নির্বাচনের বিষয়ে গ্রহণযোগ্য একটা কিছু হবে। সমঝোতা হবে বলে মনে করেন। তারা সবার অংশগ্রহণে নির্বাচন করতে চান। এদিকে, কমিশনের দায়িত্বের ব্যাপারে সংবিধানের ১১৮-৪ ধারায় বলা আছে, নির্বাচন কমিশন স্বাধীন থাকিবেন এবং কেবল এই সংবিধানের অধীন হইবেন। সংবিধান বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাংবিধানিক এ বাধ্যবাধকতার কারণে সংবিধানের সর্বশেষ পঞ্চম সংশোধনীর আলোকে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন আয়োজন করতে হবে কমিশনকে। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার শাহনেওয়াজ বলেন, সংবিধান নির্বাচন কমিশনকে যে ক্ষমতা দিয়েছে সেই আলোকেই নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। কারো কোনো এজেন্ডা বাস্তবায়ন তাদের লক্ষ্য নয়। সাংবিধানিক ক্ষমতার বাইরে গিয়ে কোনো কিছু করার ক্ষমতা তাদের নেই। তারপরও দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল নির্বাচন নিয়ে বিপরীতমুখি অবস্থান নেয়ায় নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নিয়ে সমস্যার তৈরি হয়েছে। কমিশনকে উদ্বেগ উৎকণ্ঠার মধ্যদিয়ে সময় পার করতে হচ্ছে। দুই ধরনের সরকারের অধীনে নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতিও নিতে হচ্ছে তাদের। এতে তাদের বাড়তি অর্থ খরচ করতে হচ্ছে। তবে দেশের সর্বশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতির সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এ সিদ্ধান্তকেই সঠিক মনে করছে ইসি।

দু ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে রাখার যৌক্তিকতা বিষয়ে এক নির্বাচন কমিশনার বলেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সৃষ্ট সঙ্কট দূর হতে পারে। এজন্য কমিশন বিকল্প চিন্তা মাথায় রেখে নির্বাচনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করছে। তাছাড়া সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা থাকায় সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতিও শেষ পর্যায়ে রাখা হয়েছে। তবে কমিশনের এ কাজের সমালোচনা করেছেন সংবিধান বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেছেন, সবাইকে আস্থায় আনতে সংবিধানের বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই তাদের। এ বিষয়ে ব্যারিস্টার রফিকুল হক বলেন, সংবিধানের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই নির্বাচন কমিশনের। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজনের জন্য সব দলকেই সমান গুরুত্ব দিয়ে তাদের কাজ করা উচিত।
এ বিষয়ে সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক বলেন, সাংবিধানিকভাবে বর্তমান নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি সংবিধানের বাইরে গিয়ে কোনো কাজ করতে পারবে না। সে ক্ষেত্রে তাদের সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর আলোকে নির্বাচন আয়োজন করতে হবে। সংবিধানের আলোকে নির্বাচনের আয়োজন করলে তাতে যদি বিরোধীদল তাদের দলীয় কমিশন বলে অভিযোগ তোলে তা নিছক রাজনৈতিক।

এদিকে কমিশনের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে সংবিধানের ১১৮ অনুচ্ছেদের ৫ উপধারায় বলা হয়েছে, সংসদ কর্তৃক প্রণীত যে কোনো আইনের বিধানাবলি সাপেক্ষে নির্বাচন কমিশনারদের কর্মের শর্তাবলি রাষ্ট্রপতি আদেশের দ্বারা যেরূপ নির্ধারণ করিবেন, সেইরূপ হইবে। ১১৯ অনুচ্ছেদের ১ উপধারায় বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি পদের ও সংসদের নির্বাচনের জন্য ভোটার তালিকা প্রস্তুতকরণের তত্ত্বাবধান, নির্দেশ ও নিয়ন্ত্রণ এবং অনুরূপ নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের উপর ন্যস্ত থাকিবে। ২ উপধারাতে বলা হয়েছে, নির্ধারিত দায়িত্বসমূহের অতিরিক্ত যেরূপ দায়িত্ব এ সংবিধান বা অন্য কোনো আইনের দ্বারা নির্ধারিত হইবে, নির্বাচন কমিশন সেইরূপ দায়িত্ব পালন করিবেন।

কমিশন সচিবালয়সূত্র জানায়, সংসদ নির্বাচনের চূড়ান্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে সচিবালয় মধ্য জানুয়ারিতে নির্বাচন আয়োজনের সম্ভাব্য তারিখ ধরে নথি প্রস্তুত করছে। তাদের এ প্রস্তুতি সম্পন্ন হলে কমিশনের কাছে তা উপস্থাপন করা হবে। পরে কমিশন রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে আলোচনা করে নির্বাচনের চূড়ান্ত তারিখ নির্ধারণ করবেন এবং তফসিল ঘোষণা করবেন।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *