শাহজালালের চোখ গেল কোথায়

স্টাফ রিপোর্টার: ‘বাবা, পুলিশ দুই লাখ টাকা না পেয়ে নিষ্ঠুরভাবে আমার ছেলের দুই চোখ চাকু দিয়ে তুলে ফেলে। তাকে চিরতরে অন্ধ করে দিয়েছে। আমরা তার চোখ আর কোনো দিন ফেরত পাবো না। কিন্তু, যে পুলিশরা তার দুই চোখ উপড়ে ফেলে তাকে চিরতরে অন্ধ করে দিয়েছে আমি তাদের বিচার চাই, শাস্তি চাই। গরিব মানুষ বলে কি আমরা বিচার পাব না? গত ১৮ জুলাই রাতে খুলনা মহানগরীর গোয়ালখালী মোড়ে ছিনতাই করার অভিযোগে দুই চোখ উপড়ে ফেলা শাহজালাল ওরফে জীবনের পিতা জাকির হোসেন কাঁদতে কাঁদতে গতকাল মঙ্গলবার এসব কথা বলেন। তিনি তার ছেলের দুই চোখ উপড়ে ফেলার ঘটনায় জড়িতদের কঠোর শাস্তি দাবি করেন। তিনি বলেন, তার পরিবারের সদস্যরা ওইদিন থানায় গিয়ে শাহজালালকে স্বাভাবিক অবস্থায় দেখেছিলো। তার দুই চোখ স্বাভাবিক ছিলো। অথচ এর কয়েক ঘণ্টা পর শাহজালালকে দুই চোখ রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন।

খালিশপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাসিম খান পুলিশের বিরুদ্ধে শাহজালালের চোখ উপড়ে ফেলার অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন। তিনি বলেন, ১৮ জুলাই রাত ১১টা ৪০ মিনিটের দিকে নগরীর খালিশপুর গোয়ালখালী বাসস্ট্যান্ডে মোটরসাইকেলে ছিনতাই করে পালিয়ে যাওয়ার সময় ওইখানে থাকা ক্ষিপ্ত জনতা শাহজালালকে আটক করে গণধোলাই দিয়ে তার চোখ তুলে নেয়। খবর পেয়ে ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে। শাহজালালের চোখ তুলে ফেলার সঙ্গে পুলিশের কোনো সম্পর্ক নেই। এটা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন অভিযোগ। গতকাল দুপুরে নগরীর খালিশপুরের নয়াবাটিতে রেল লাইনের পাশে শাহজালালের শ্বশুর বাড়িতে গেলে দেখা যায়, টিনের ছাপড়া দেয়া দু রুমের ওই বাড়িটিতে শাহজালালের শ্যালকের স্ত্রী কারিমা, নানী শাশুড়ি রিজিয়া বেগম ও তাদের কাছে শাহজালালের ১০ মাসের শিশু কন্যা আঁখি রয়েছে। বাড়িটিতে ঢুকতেই তাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তবে সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে আশ্বস্ত হন তারা।

কারিমা জানান, তাদের পরিবারের সদস্যরা প্রায় সবাই এখন ঢাকায় রয়েছেন। তারা শাহজালালের চিকিত্সা নিয়ে ব্যস্ত। তিনি বলেন, পিরোজপুরের কাউখালী উপজেলার সুবিদপুর গ্রাম থেকে ঘটনার দুই দিন আগে (১৬ জুলাই) শ্বশুরবাড়ি বেড়াতে আসেন শাহজালাল (৩০)। স্ত্রী রাহেলার সাথে মনোমালিন্য হওয়ায় সে আগে থেকেই বাবার বাড়িতে ছিলেন। গত ১৮ জুলাই তার ১০ মাসের মেয়ে আঁখির খাবারের গুঁড়ো দুধ শেষ হয়ে যায়। ওই দিন বিকাল সাড়ে চারটার দিকে শাহজালাল আমার কাছ থেকে ১ হাজার টাকা নিয়ে বাসা থেকে গোয়ালখালী মোড়ের উদ্দেশে বের হন। রাত ৯টার দিকে তিনজন যুবক তাদের বাসায় আসে। তারা জানায়, শাহজালালকে স্থানীয় কয়েকজন যুবক ছিনতাই করার অভিযোগে গোয়ালখালী বাসস্ট্যান্ডের কাছে আটকে রেখে মারধর করেছে। তারা খালিশপুর থানা পুলিশকে খবর দিলে পুলিশ এসে তাকে থানায় নিয়ে গেছে। খবর দেওয়া ওই তিন যুবকের মধ্যে একজনের নাম নয়ন। তিনি তাকে দেখলে চিনতে পারবেন বলে জানান কারিমা।

কারিমা আরো জানান, তিনি, তার ননদ (শাহজালালের স্ত্রী রাহেলা) ও তার নানী শাশুড়ি রিজিয়া বেগম রাত সাড়ে ৯টার দিকে খালিশপুর থানায় গিয়ে শাহজালালকে সেখানে দেখতে পান। এ সময় তারা তার সঙ্গে কথাও বলেন। তাদের দেখে পুলিশের একজন ‘দালাল’ বলেন, দুই লাখ টাকা থানায় নিয়ে আসো, ওকে ছাড়ানোর ব্যবস্থা করে দিবানে। তখন আমরা তাকে বলি ‘আমরা গরিব মানুষ ওতো টাকা পাব কই, ২০ হাজার টাকা দিবানে।’ তখন তিনি তাদের বলেন, ওই টাকায় কাজ হবে না। রাত সাড়ে ১১টার দিকে শাহজালালের জন্য খাবার নিয়ে গেলে থানা থেকে তাদের জানানো হয়, ‘তার খাবার লাগবে না। পুলিশই তার খাবার দেবে।

তিনি বলেন, পরে পুলিশ তাকে একটি গাড়িতে করে থানার বাইরে নিয়ে যায়। ওই সময় ওই গাড়িতে ৪-৫জন পুলিশ ও দুটি মোটরসাইকেলে আরো চারজন পুলিশ ছিল। ভোরে থানায় গেলে তাদের বলা হয়, এখানে শাহজালাল নেই। খুলনা মেডিক্যাল কলেজে যাও। আমরা সেখানে গিয়ে দেখি শাহজালাল হাসপাতালের প্রিজন সেলের বারান্দায় পড়ে আছে। তার চোখ সাদা কাপড় দিয়ে ঢাকা। রক্তে ভেসে যাচ্ছে।

শাহজালালের শ্বশুরবাড়ির আশপাশের কয়েকজন জানান, তারা শাহজালালকে তেমন একটা চেনেন না। দু’-একবার তারা তাকে দেখলেও তার সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণা নেই। এ ব্যাপারে গতকাল দুপুরে গোয়ালখালী মোড়ে কয়েকজন দোকানদারের সঙ্গে কথা বললে তারা ঘটনার কথা শোনার কথা জানালেও কিছু বলতে অপরাগতা প্রকাশ করেন। শাহজালাল বর্তমানে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ৩০১ নম্বর ওয়ার্ডের ৬ নম্বর বেডে চিকিত্সাধীন। গতকাল তার বাবা জাকির হোসেন অভিযোগ করেন, ‘ দুই লাখ টাকা না পেয়ে ওসি নাসিম খান, এসআই মামুন ও দারোগা রাসেল তার ছেলের দু’চোখ তুলে ফেলেছে। আমি তাদের বিচার দাবি করছি। চিকিত্সকরা জানিয়েছেন, তার ছেলে আর কোনো দিন চোখ দিয়ে দেখতে পারবে না। শাহজালালের দুই চোখের অপারেশন করেন অধ্যাপক ডা. ফরিদুল হাসান। তিনি বলেন, ‘চোখে অপারেশন করা হয়েছে। তবে তার চোখের আলো ফেরার সম্ভাবনা খুবই কম।

 

Leave a comment

Your email address will not be published.