মেহেরপুরের লোকজ ঐতিহ্য নকশিকাঁথা এখন ইউরোপে

মাজেদুল হক মানিক: নকশিকাঁথা। বাংলার লোকশিল্পের একটি প্রাচীনতম অনুষঙ্গ। প্রকৃতি, পরিবেশ তথা গ্রামের সাধারণ মানুষের জীবন-যাপনের উপযোগিতার নিরিক্ষে এদেশের মেয়েদের অনুভব ও চেতনার সাথে জড়িয়ে আছে নকশিকাঁথা। মেহেরপুরের সহগলপুর গ্রামের অর্ধশতাধিক গরিব ও অবহেলিত নারী হাতের তৈরি নকশিকাঁথা বিক্রি করে হচ্ছেন স্বাবলম্বী। শুধু দেশেই নয় মেহেরপুরের নকশিকাঁথা এখন যাচ্ছে ইউরোপে।
বাংলার লোকজ জীবনের তথা লোকসংস্কৃতির অন্যতম উপাদান হিসেবে আজও টিকে আছে নকশিকাঁথা। দেশের বিভিন্ন স্থানের মতো মেহেরপুরের সহগলপুর গ্রামের অর্ধশতাধিক নারী নিজেরা উদ্যোক্তা হয়ে তৈরি করছেন বাহারী নকশার নকশিকাঁথা। যা বিক্রি করে স্বাবলম্বী হওয়ার পাশাপাশি সুনাম কুড়িয়েছেন দেশ-বিদেশে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ওই নকশিকাঁথা এখন রফতানি হচ্ছে- যুক্তরাষ্ট্র, কানাডাসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে। এই গ্রামের নারীরা অনেক আগে থেকেই কাঁথা সেলাইয়ের কাজ করেন। তবে বিদেশে এখন তাদের কাঁথা বিক্রি হওয়ায় এই কাজে আরও বেশি উৎসাহ পেয়েছে তারা। এমনটি জানালেন কাঁথা সেলাইকারী কয়েকজন নারী।
জানা গেছে, উদ্যেক্তাদের মধ্যে কেউ বিধবা, কেউ অতি দরিদ্র আবার কারো সংসারে নেই উপার্জনক্ষম পুরুষ। তাই এসব অসহায় নারীরাই দৈনন্দিন কাজ শেষ করে বসে যান নকশিকাঁথা তৈরির কাজে। এসব নকশিকাঁধা তৈরিতে ব্যবহৃত হচ্ছে পুরোনো লুঙ্গি, শাড়ি, বেডশিটসহ কাপড়ের দোকানের অবিক্রিত নানা রঙের অব্যবহৃত কাপড়। ওই কাপড়গুলো পরিষ্কার করে তৈরি করা হচ্ছে নানা ডিজাইনের নকশিকাঁথা। যেসব নারী শ্রমিক হিসেবে রয়েছেন তারা প্রতিটি কাঁথায় পরিমাপ ও ডিজাইন অনুযায়ী সর্বনিম্ন ৮শ’ থেকে ২ হাজার টাকা মজুরি পেয়ে থাকেন। তাদের এই পণ্য দেশে ও বিদেশে বাজারজাত করতে সহযোগিতা করে থাকে বেসরকারি এনজিও সিডিএফ।
ওই নারী উদ্যেক্তারা বলছেন, তাদের পণ্য যখন বিদেশে রফতানি হয়, সেখান থেকে কাঁথার ডিজাইন ও মানভেদে ৮শ’ টাকা থেকে ৩ হাজার টাকা পেয়ে থাকেন তারা। ইউরোপে সর্বোচ্চ ১০ থেকে ১২ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। সিডিএফের ম্যানেজিং ডিরেক্টর প্রভঞ্জন বিশ্বাস বলেন, গ্রামের অবহেলিত এসব নারীকে স্বাবলম্বী করতেই তারা সহযোগিতা করে থাকেন।
বিধবা আনোয়ারা খাতুন বলেন, আমি সংসারে বসবাস করি। উপার্জনকারী কোনো পুরুষ না থাকায় অর্ধাহারে দিন কেটেছে। নকশিকাঁথা সেলাই করে যা আয় হয় তা দিয়ে সংসার চলছে। আমি ও আমার মা অন্যান্য কাজের ফাঁকে এ কাজ করছি। সহগলপুর গ্রামের কলেজছাত্রী লিপি খাতুন বলেন, আমার দরিদ্র পিতার পক্ষে লেখাপড়ার খরচ দেয়া সম্ভব নয়। কাঁথা সেলাই করে আমার লেখাপাড়া খরচ জোগাড়া হয়। এছাড়াও আমার আয় দিয়ে ছোট বোনকে লেখাপড়া করাচ্ছি। সে আগামী বছর এসএসসি দেবে।
সিডিএফ এনজিওসূত্রে জানা গেছে, সহগলপুর গ্রামে একটি কেন্দ্র রয়েছে। সেখান থেকে নির্বাচিত নারীদের বাড়িতে ডিজাইনসহ কাপড় ও সুঁতা পৌঁছে দেয়া হয়। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাঁথা সেলাই সম্পন্ন হলে তা বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মধ্যদিয়ে ইউরোপের দেশগুলোতে বিক্রি করা হয়। ক্রেতাদের কাছ থেকেও ডিজাইন ও আকার-আয়তন নির্ধারিত করে দেয়া হয়। ওই দেশের মানুষেরা বিভিন্নভাবে কাঁথা ব্যবহার করে। শিশুদের জন্যও ছোট আয়তনের কাঁথা তৈরি করা হয়। এ পর্যন্ত তারা যে কাঁথাগুলো কিনেছেন তাতে বেশ সন্তুষ্ট।
সিডিএফ সুপারভাইজার লিলি খাতুন বলেন, সংস্থার পক্ষ থেকে আমাকে ডিজাইন আকার-আয়তনের হিসেব দেয়া হয়। যারা কাঁথা সেলাই করেন তাদের নিয়ে বৈঠক করে বুঝিয়ে দেয়া হয়। কাপড়ের সাথে সুঁতোর ম্যাচিং এবং মাপ ঠিক করে তাদের হাতে পৌঁছে দেয়া হয়। ভিন্ন ভিন্ন ডিজাইনের কাঁথা তৈরির জন্য মাঝে মাঝে তাদের প্রশিক্ষণও দেয়া হয়।
মেহেরপুর জেলা প্রশাসক পরিমল সিংহ বলেন, আমাদের দেশের ঐতিহ্যবাহী নকশিকাঁথা বিদেশে রফতানি হওয়াটা অবশ্যই গর্বের। আমি তাদের কাজ পরিদর্শন করেছি। অসহায় এসব নারীদের সহযোগিতা করা হবে। তবে কাঁথা সেলাইয়ের মজুরি বাড়াতে সিডিএফ কর্র্তৃপক্ষকে বলেছি।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *