নিজের পায়ে দাঁড়াতে চায় বিএনপি

স্টাফ রিপোর্টার: বল বল আপন বল, জল জল গঙ্গার জল- চিরাচরিত এ প্রবাদ বাক্যই বিএনপি নেতাকর্মীদের এখনকার আত্মোপলব্ধি। তাই পরনির্ভরতা বাদ দিয়ে দলটি এবার পুরোপুরি নিজের পায়ে দাঁড়াতে চায়। আগের মতো তারা আর কূটনীতিক নির্ভর হতে রাজি নয়। রাজি নয় রাজপথের আন্দোলনে জামায়াতের ওপর নির্ভর করতেও। বলা হচ্ছে- যুদ্ধাপরাধ বিচার মামলার রায়কে কেন্দ্র করে জামায়াত তার সাংগঠনিক শক্তির অনেকটাই আগে ক্ষয় করে ফেলেছে। ফলে আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে আশানুরূপ শক্তি নিয়ে তারা বিএনপির পাশে দাঁড়াতে পারেনি।

অপরদিকে আশাবাদ সত্ত্বেও ২৯ ডিসেম্বর যুগপৎ কর্মসূচি নিয়ে পাশে দাঁড়ায়নি হেফাজতে ইসলাম। দেশের অন্য কোনো শক্তিও তৎপর হয়নি। ফলে চূড়ান্ত পর্বে বিএনপিকে একাই খেলতে হয়েছে। অথচ একা খেলার প্রস্তুতি দলটির ছিলো না।
সূত্রমতে, নির্বাচন পরবর্তী পরিস্থিতি মূল্যায়নে এ ধরনের আত্মোপলব্ধি থেকেই বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এবার দল গোছানোর উদ্যোগ নিয়েছেন। দলের সাংগঠনিক ভিত মজবুত করেই তিনি আন্দোলনে যেতে চান। এজন্য কৌশলে কিছুটা পরিবর্তন আনা হয়েছে। ইতোমধ্যে স্থগিত করা হয়েছে সারাদেশে বিএনপির সাংগঠনিক সফর। কেন্দ্রীয় নেতাদের সমন্বয়ে মোট ৪৫টি টিমের এ মাস থেকেই সাংগঠনিক সফরে যাওয়ার কথা ছিলো। মূলত উপজেলা নির্বাচনে নেতাকর্মীদের কাজের ব্যাঘাত সৃষ্টি না করার অংশ হিসেবেই ওই সফর স্থগিত করা হয়েছে। আরেকটি কারণ হলো- কর্মীদের ক্ষোভের বহির্প্রকাশ আপাতত এড়িয়ে চলা। আন্দোলন যৌক্তিক পরিণতি না পাওয়ার জন্য কেন্দ্রীয় অনেক নেতার ওপর তৃণমূল নেতাদের ক্ষোভ রয়েছে বলে মনে করা হয়। এছাড়া অতিমাত্রায় কূটনৈতিক নির্ভরতায় বিএনপির ক্ষতি হয়েছে। কারও কারও মতে, বিএনপির কূটনৈতিক টিম পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বের আশ্বাসের ওপর নির্ভর করা বিএনপির মোটেই উচিত হয়নি। ওই দেশগুলোর নেতারা অনবরত সহিংসতা বন্ধের কথা বললেও বস্তুত সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির মতো পরিস্থিতি তৈরি করতে তারা ব্যর্থ হয়েছেন। অথচ তাদের আশ্বাসে বিএনপির আন্দোলন প্রচণ্ডভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আন্দোলনের বদলে নেতাকর্মীরা ধরে নিয়েছেন, পশ্চিমারা নির্বাচন হতে দেবে না। ফলে তারা ঝুঁকি নেননি। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তাদের ধারণা ছিলো কূটনীতিকদের হাতে ট্রাম্পকার্ড রয়েছে। সময় হলে তারা তা ব্যবহার করবেন।

অপরদিকে, আন্দোলনের ব্যাপারে নিজেদের শক্তির ওপর নির্ভর না করে পরোক্ষভাবে জামায়াতের ওপর নির্ভর করাও ঠিক হয়নি বলে এখনকার আত্মোপলব্ধি বিএনপির একাংশের। তাদের মতে, এতে একদিকে জামায়াত নিজেদের বড় শক্তি হিসেবে প্রমাণ করার সুযোগ পেয়েছে। পাশাপাশি সহিংস আন্দোলনের অপবাদে জড়িয়ে বিএনপিকেও চাপে ফেলার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এর চেয়ে সাংগঠনিকভাবে বিএনপি এককভাবে আন্দোলনে গেলে তাতে জনসম্পৃক্ততা বাড়তো। তাছাড়া এতো সহজে ওই আন্দোলনের ওপর গুলি চালানোর সাহসও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পেতো না।
তাছাড়া আন্দোলন সফল না হওয়ার জন্য দায়ী বা নেতাদেরও চিহ্নিত করা দরকার বলে মনে করছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। দলের দুর্দিনে কারা ঝুঁকি নেননি, কারা ইচ্ছাকৃত আত্মগোপনে থেকেছেন, আর কারাই বা হাইকমাণ্ডের নির্দেশ মানেনি, এসবই পর্যালোচনা ও চিহ্নিত করা প্রয়োজন বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে দলের কিছু নেতার সরকারের সাথে গোপন আঁতাত রয়েছে বলেও অভিযোগ উঠছে। ফলে এসব বিবেচনায় নিয়েই সংগঠনকে পুরোপুরি ঢেলে সাজিয়ে আন্দোলনে যেতে চাইছেন খালেদা জিয়া। অংশ হিসেবে দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি, মহানগরী ও অঙ্গসংগঠনগুলো পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। প্রয়োজন হলে পুনর্গঠন করা হবে বিশেষ কিছু জেলার কমিটিও। এরপর আগামী এপ্রিল অথবা মে মাসে অনুষ্ঠিত হবে দলের জাতীয় কাউন্সিল। আর কাউন্সিলের পরেই সরকারবিরোধী আন্দোলনের কথা ভাবা হচ্ছে। ঢাকা মহানগরী কমিটির সাথে খালেদা জিয়ার বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে ১০ ফেব্রুয়ারি। ওই বৈঠকে আন্দোলনে ঢাকার নেতাদের সফলতা-ব্যর্থতা নিয়ে আলোচনা হতে পারে। এরপর পর্যায়ক্রমে বৈঠক হবে ছাত্রদল, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলসহ সবগুলো অঙ্গসংগঠনের ভূমিকা নিয়ে।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দাবি করেন- বিএনপির আন্দোলন ব্যর্থ হয়নি, আন্দোলন চলমান রয়েছে। সময় হলেই বিএনপি ঘুরে দাঁড়াবে। তিনি বলেন, বিশ্বায়ন ও গণতান্ত্রিক রাজনীতি থেকে কূটনীতিকরাও বাইরে নন। তাই গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রাখার জন্য কূটনীতিকরা নিজের মতো করে চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তারা ব্যর্থ নাকি সফল হয়েছেন এটা ভবিষ্যত বলে দেবে। তবে সরকার যে সব গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে একতরফা নির্বাচন করেছে এটা আজ সর্বজনবিদিত। তাই গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলন অবশ্যই সফল হবে। বিএনপি নিজের শক্তির ওপর দাঁড়িয়েই আন্দোলনের নেতৃত্ব দেবে বলে জানান তিনি। বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমানের মতে, গণতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনে বিএনপি ব্যর্থ হয়নি। ব্যর্থ হয়েছে কূটচাল ও অপশক্তির পরীক্ষায়। বিশেষ করে আন্দোলন ভণ্ডুল করার জন্য এবারে সরকারের অতিমাত্রায় দমন-পীড়ন যা আগে কখনো দেখা যায়নি। সরকার এতো লোককে হত্যা বা গুম করবে এটা এ দেশের কেউ ভাবতে পারেনি। তাই আওয়ামী সরকারবিরোধী আন্দোলনে এবার আমাদেরও নতুন করে ভাবার সময় হয়েছে।
দলের যুগ্মমহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, বিএনপি কারও শক্তির ওপর নির্ভর করে দাঁড়িয়ে নেই। তবে এটা সত্য যে, কূটনীতিকরা এ দেশের গণতন্ত্রের স্বার্থে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কথা বলেছেন। এগুলোর মধ্যে গণতন্ত্রের পক্ষের যেসব বক্তব্য তার সাথে বিএনপি একমত। তবে শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ গণতান্ত্রিক সব প্রক্রিয়া ধ্বংস করে একটি ভোটারবিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে একটি প্রায় একদলীয় শাসন কায়েম করেছে। এর বিরুদ্ধে অবশ্যই বিএনপি রুখে দাঁড়াবে।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *