দামুড়হুদায় কমছে আবাদি জমি : বাড়ছে বনজ ফলজ বাগানসহ ঘরবাড়ি

দামুড়হুদা অফিস: দেশের ক্রমবর্ধমান বিপুল পরিমাণ জনসংখ্যার খাদ্যের চাহিদা মেটাতে আমাদের কৃষিক্ষেত্রে খাদ্য উৎপাদনের কোনো বিকল্প নেই। এমনিতেই আমাদের দেশের জনসংখ্যার তুলনায় মাথাপিছু কৃষি জমির পরিমাণ  কম। তার ওপর আবার প্রতিবছর কৃষি জমি দখল করে অপরিকল্পিত রাস্তাঘাট, বাড়িঘর, দোকানপাট, হাটবাজারসহ সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ইটভাটা স্থাপনের কারণে কৃষি জমির পরিমাণ কমে যাচ্ছে। প্রতি বছর এভাবে কৃষিজমি কমতে থাকলে ভবিষ্যতে দামুড়হুদা উপজেলাসহ আশপাশ এলাকায় খাদ্য ঘাটতির আশঙ্কা রয়েছে বলে সচেতন মহল মনে করছেন।

দামুড়হুদা কৃষি অফিস সুত্রে জানা গেছে, বর্তমানে দামুড়হুদা উপজেলায় আবাদি জমির পরিমাণ ২৫ হাজার ৮শ হেক্টর। দশ বছর আগে এর পরিমাণ ছিলো ২৬ হাজার ১শ ৫০ হেক্টর। এলাকায় নতুন নতুন রাস্তাঘাট, বাড়িঘর তৈরিতে ইটের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় গত ১০ বছরে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রায় অর্ধ শতাধিক ইটভাটা গড়ে উঠেছে। ইটভাটা মালিক সুত্রে জানা গেছে, প্রতিটি ইটভাটা স্থাপনে কমপক্ষে ২০ বিঘা জমির প্রয়োজন হয় এবং ইট তৈরিতে কৃষি জমির উপরিভাগের মাটি (টপসয়েল) ব্যবহার হয়। প্রতি বছর একটি ইটভাটায় ব্যবহৃত মাটির যোগান দিতে গড়ে ৪ বিঘা কৃষিজমি নষ্ট হয়। তাতে দেখা যায় শুধুমাত্র ইটভাটা স্থাপনের কারণেই গত এক দশকে প্রায় আড়াই হাজার বিঘা কৃষিজমি নষ্ট হয়েছে। অনেক জমির উপরিভাগের মাটি (টপসয়েল) কেটে নেয়ার ফলে সে সব জমিতে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।

অন্যদিকে প্রয়োজনের তুলনায় কম বৃষ্টিপাত, খরা, কৃষি উপকরণ সার, বীজ, কীটনাশক ইত্যাদির মূল্য, শ্রমিকের মজুরী বৃদ্ধি, উৎপাদিত ফসলের কাঙ্খিত বাজার মূল্য না পেয়ে ফসলের আবাদ করে উপর্যুপরি লোকসানের কারণে অনেক কৃষক কৃষি জমিতে নানা রকম বনজ ও ফলজ বাগান করার দিকে ঝুঁকে পড়েছে। এসব জমিতে গাছ লাগানোর পরও ৫/৬ বছর যাবৎ সাথী ফসল হিসাবে নানারকম ফসলের আবাদ করা যায়। সে কারনে যেসব কৃষকের বেশি জমি আছে তাদের অনেকেই কৃষি জমিতে বাগান করছেন। উপজেলার লোকনাথপুর গ্রামের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী বখতিয়ার হোসেন বলেন, গত ১০/১২ বছরে পর্যায়ক্রমে আমরা ৫ ভাই প্রায় ৬০ বিঘা জমিতে আম, জাম, লিচু, কাঁঠালসহ নানা রকম ফলজ ও বনজ বাগান করেছি। তাতে প্রতিবছর এসব বাগানের ফল বিক্রি করেই অন্যান্য ফসলের তুলনায় বেশি লাভবান হচ্ছি। বাগানের গাছ বড় হওয়ার সাথে সাথে ফলের পরিমাণও বাড়ছে। সেই সাথে বাড়ছে বনজ বাগানের কাঠের পরিমাণ। গোবিন্দপুর গ্রামের শিক্ষক নূরুল ইসলাম বলেন, গত ৬/৭ বছরে আমি প্রায় ১২ বিঘা জমিতে আম ও লিচুরবাগান করেছি। এ বাগানের ফল বিক্রি করে প্রতিবছর মোটা অঙ্কের টাকা পাচ্ছি। যা অন্যান্য ফসলের আবাদের চেয়ে লাভজনক। বাগান করে একদিকে যেমন আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছি অন্যদিকে বর্তমানে আমাদের দেশের বিপন্ন পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করতে অপরিসীম ভূমিকা পালন করছে এসব বাগানের গাছ। তবে বাগান করে লাভবান হতে হলে পরিকল্পিত ভাবে বাগান করে তার যতœ নিতে হবে। দুধপাতিলা গ্রামের আব্দুল কুদ্দুস বলেন, গত বছর ৭ বিঘা জমিতে থাই জাতের পেঁয়ারা বাগান করেছি। গাছের চেহারাও ভালো হয়েছে। আগামী মরসুমে ফল আসার সম্ভাবনা রয়েছে। দক্ষিণচাঁদপুর গ্রামের কৃষক রহমত আলী বলেন, বিগত বেশ কয়েক বছর যাবৎ নানা ফসলের আবাদ করে উপর্যুপরি লোকসান হওয়ায় বর্তমানে আবাদি জমিতে বাগান করার দিকে ঝুঁকে পড়েছি। আমরা চার ভাই প্রায় ৪২ বিঘা জমিতে বিভিন্ন ফলজ ও বনজ বাগান করেছি। এ বছর ৬ বিঘা জমির বাগানের পেঁয়ারা বিক্রি করে প্রায় ৪ লক্ষাধিক টাকা আয় করেছি।

অভিজ্ঞ কৃষকেরা মনে করছেন, খাদ্য উৎপাদনের জন্য আরোও উন্নত প্রযুক্তি ব্যাবহার প্রয়োজন। তা নাহলে ভবিষ্যতে উপজেলার মানুষ খাদ্য ঘাটতিতে পড়বে। তাই এখন থেকেই অধিক খাদ্য উৎপাদনের বিষয়ে ভাবা উচিৎ সংশ্লিষ্টদের।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *