ঝিনাইদহের ফুরসন্দি ইউনিয়নের ৫টি গ্রামের সহস্রাধিক পুরুষ গ্রামছাড়া

0
33

দিন ও রাতের আঁধারে ইচ্ছামতো চলছে ভাংচুর ও লুটপাট

 

শাহনেওয়াজ খান সুমন, ঝিনাইদহ থেকে: ঝিনাইদহের দহকোলা গ্রামের ভূমিহীন কৃষক আলী কদরের চারটি গরু নিয়ে গেছে প্রতিপক্ষ। মাঠে থাকা একমাত্র শ্যালোমেশিনটিও লুট করেছে। যে মেশিন দিয়ে বর্গা নেয়া আড়াই বিঘা জমি চাষ করতেন ওই কৃষক। এখন রাস্তায় রাস্তায় কান্নাকাটি করে বেড়াচ্ছেন। কৃষক আলী কদরের অভিযোগ চেয়ারম্যান শহিদুল ইসলাম শিকদারের সমর্থক হওয়ায় প্রতিপক্ষ আব্দুল মালেকের লোকজন এ ঘটনা ঘটিয়েছে। তিনি বলেন নিজে কোনো রাজনীতি করেন না, তারপরও প্রতিপক্ষ তার সব কেড়ে নিয়ে নিঃস্ব করে দিলো।

এ অবস্থা ঝিনাইদহ সদর উপজেলার ফুরসন্দি ইউনিয়নের ৫ গ্রামের বেশ কিছু কৃষক ও দরিদ্র পরিবারের। যেখানে প্রতিনিয়ত চলছে লুটপাট আর ভাঙচুর। মাঠ থেকে লুট করে নেয়া হচ্ছে শ্যালোমেশিন। গত ৬ দিনে ৫৩টি শ্যালোমেশিন লুট হয়েছে। প্রতিপক্ষ গোয়াল থেকে দেড় শতাধিক গরু খুলে নিয়েছে। গ্রামগুলোর সহস্রাধিক পুরুষ মানুষ এখনও গ্রামছাড়া রয়েছে। মেয়েরা দিনের বেলায় ঘরে থাকলেও রাত কাটাচ্ছে আতঙ্কে।

টিকারী গ্রামের আলতাফ বিশ্বাস, নাসির বিশ্বাস, শামসুর রহমান, সাইদুল ইসলাম, শামসুদ্দীন মৌলভী, লিয়াকত হোসেন, আব্দুর রাজ্জাক, মফিজুল ইসলাম, আবু বক্কর, বাবুল হোসেন, সানারুদ্দীন, আসাদ মুন্সী, পলাশ মুন্সী, দহকোলা গ্রামের আবদুল আজিজ বিশ্বাস, আফজাল শিকদার, লিয়াকত আলী, আলী কদর, রাশেদ বিশ্বাস, আব্দুর রহমান, আব্দুল মজিদ, আবুল হোসেন ভরশ, শমসের শিকদার, জিতড় গ্রামের রিপন, জামাল, ভবানীপুর গ্রামের সাহেব, আয়েব, মজনু, দিঘিরপাড় গ্রামের রেজওয়ান বিশ্বাস, জিল্লুর রহমান, মাজেদুর রহমানসহ অনেকের পরিবার গ্রামছাড়া। তাদের মাঠের পাকা মরসুমি ফসল সরিষা, মসুরি ঘরে তুলছে পারছেন না। এছাড়া মাঠের শ্যালোমেশিন লুট করে নেয়ায় চলতি ইরি-বোরো মরসুমে চাষাবাদ ব্যাপকভাবে ব্যাহত হবে। শুক্রবার সকালে টিকারী গ্রামের আলতাফ বিশ্বাসের মেয়ে শিলা খাতুনের সোনার গয়না ও মোবাইলফোন লুটসহ মারপিট করা হয়েছে। এছাড়া মফিজুল ইসালামের স্ত্রী বিনা খাতুন ও শামসুর রহমান সানুর স্ত্রী মাজেদা খাতুনকে মারপিট করে বাড়ি থেকে বের করে দেয়া হয়েছে। দহকোলা গ্রামের ওবাইদুর রহমান বলেন, দু গ্রামের পারাপারের একমাত্র সংযোগ সাঁকোটিও প্রতিপক্ষ প্রায় ভেঙে দিয়েছে। এতে চলাচলেও এলাকাবাসীকে দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে।

প্রসঙ্গত, গত ১৮ জানুয়ারি ঝিনাইদহের টিকারী গ্রামের মাঝপাড়ায় আওয়ামী লীগের দু গ্রুপের সংঘর্ষের জের ধরে পুলিশের সাথে গুলি বিনিময়ে দু যুবক নিহত হয়। তারা হলেন টিকারী গ্রামের ইব্রাহিম হওলাদারের ছেলে শাহ আলম ও তৈয়ব আলীর ছেলে আরিফ হোসেন। গ্রামবাসী বলেছে, পুলিশের গুলিতে তাদের মৃত্যু হয়েছে। তবে নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে প্রতিপক্ষের নামে মামলা করা হয়েছে। এলাকাবাসী জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের দু পক্ষের গোলমাল হলেও সাবেক চেয়ারম্যান বিএনপি জেলা কমিটির তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক ওহিদুর রহমানসহ প্রায় ৩০ বিএনপি কর্মীকে আসামি করা হয়েছে। ওহিদুর রহমান দাবি করেছেন রাজনৈতিকভাবে তাদের ঘায়েল করতে এ মামলায় আসামি করা হয়েছে।

সরেজমিনে টিকারী গ্রামে গিয়ে কথা হয় একাধিক গ্রামবাসীর সাথে। যারা প্রকাশ্যে নাম না বললেও জানিয়েছেন, ফুরসন্দি ইউনিয়নে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের মধ্যে রয়েছে দুটি শক্তিশালী পক্ষ। এক পক্ষের নেতৃত্বে রয়েছেন বর্তমান ইউপি চেয়ারম্যান ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতি শহিদুল ইসলাম শিকদার, আর অপরপক্ষে রয়েছেন ওই নির্বাচনে পরাজিত প্রার্থী জেলা আওয়ামী লীগ সদস্য আব্দুল মালেক। ২০০৭ সাল থেকে তাদের মধ্যে বিরোধ চলে আসছে। প্রায়ই তাদের সমর্থকরা সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। হামলা-পাল্টা হামলায় দু শতাধিক বাড়িঘর ভাঙচুর করা হয়েছে। উভয় পক্ষের বাড়িঘর লুটপাটে ক্ষতি হয়েছে কয়েক কোটি টাকার। এ দু যুবক ছাড়াও আরো একজন খুন ও ৫/৬ জন পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন।

গ্রামবাসী জানায়, এ দু নেতার সমর্থকদের আধিপত্য বিস্তার করা নিয়ে ১৮ জানুয়ারি শনিবার বিকেলে টিকারী বাজারে শহিদুল ইসলাম শিকদার ও আব্দুল মালেক গ্রুপের সমর্থকদের মধ্যে কথাকাটাকাটি হয়। এক পর্যায়ে শহিদুল ইসলাম শিকদারের ভাতিজা শরিফুল ইসলামকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে মারাত্মক আহত করে প্রতিপক্ষ। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে উভয় পক্ষ একে অপরের ওপর হামলার আশঙ্কায় সশস্ত্র অবস্থান নেয়। খবর পেয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য সন্ধ্যায় পুলিশের একটি দল টিকারী গ্রামের মাঝপাড়ায় যায়। সেখানে আগে থেকেই ওঁত পেতে থাকা আব্দুল মালেক গ্রুপের লোকজন প্রতিপক্ষ ভেবে পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি ছোঁড়ে। পুলিশও পাল্টা গুলি ছোঁড়ে। এতে গুলিবিদ্ধ হয়ে দু জন নিহত হয়। আহত হয় দু পুলিশসহ কমপক্ষে ১০ জন।

প্রত্যক্ষদর্শী টিকারী মাঝপাড়া জামে মসজিদের ইমাম মো. আব্দুল মজিদ জানান, ঘটনাটি তার সামনেই ঘটে। সে সময় তিনি মসজিদের মধ্যে ছিলেন। ১৬/১৭ জন মসজিদের মধ্যে প্রবেশ করে, যাদের অনেকের পুলিশের পোশাক পরা ছিলো। আবার অনেকে ছিলেন শাদা পোশাকে। মসজিদের বাইরে গ্রামের বেশকিছু মানুষ ভেতরে প্রবেশকারীদের তাড়া করে এগিয়ে আসেন। এ সময় মসজিদের মধ্যে থাকা ব্যক্তিরা অস্ত্র উচিয়ে বাইরে বের হয়ে গুলি শুরু করে। এ গুলিতে গ্রামের দু যুবক নিহত হয়। গ্রামের আরেক ব্যক্তি দাবি করেন ঘটনার সময় ওই স্থানে প্রতিপক্ষ শহিদুল ইসলাম শিকদারের সমর্থকরা ছিলেন না। তারপরও তাদেরকে দায়ী করা হচ্ছে। মূলত পুলিশের গুলিতেই দু আওয়ামী লীগ কর্মী মারা গেছেন। নিহত শাহ আলমের মা আকলিমা খাতুন দাবি করেছেন প্রতিপক্ষই তার সন্তানকে গুলি করে হত্যা করেছে। এ সময় তিনি নিজে বাধা দেয়ার চেষ্টা করেন, কিন্তু তারা কথা শোনেনি। নিহত আরেক যুবক আরিফ হোসেনের মা মাজেদা বেগম জানান, মসজিদ থেকে বের হয়ে তার সন্তানের ওপর গুলি চালানো হয়। সেখানে পুলিশের পাশাপাশি শাদা পোশাকের মানুষও ছিলো।

ইউপি চেয়ারম্যান শহিদুল ইসলাম শিকদার জানান, তাদের কোনো লোক সংঘর্ষের সময় ছিলো না। বরং তার এক ভাতিজা শরিফুল ইসলামকে কুপিয়ে আহত করার পর প্রতিপক্ষ নিজেদের অবস্থান ঠিক রাখতে একত্রিত হয়ে গ্রামে অবস্থান নেয়। সেটা সামাল দিতে পুলিশ গেলে ভুল বোঝাবুঝিতে গোলাগুলি শুরু হয়। এখন তাদের লোকজনের বাড়িঘর লুটপাট ও ভাঙচুর করা হচ্ছে। মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে।

আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল মালেক জানান, পুলিশের গুলিতে নয় চেয়ারম্যানের লোকজন লাইসেন্সধারী ও অবৈধ অস্ত্র দিয়ে তার দু সমর্থককে হত্যা করেছে। আর এখন লুটপাট হচ্ছে কি-না জানতে চাইলে তার কোনো লোকজন এমন ঘটনার সাথে জড়িত নেই বলে জানান। ঝিনাইদহ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ইকবাল বাহার চৌধুরী জানান, কার গুলিতে দু জন নিহত হয়েছে তা পুলিশ এখনও নিশ্চিত হতে পারেনি। তবে তদন্ত চলছে। তিনি আরো জানান, এক পক্ষ একটা এজাহার দিয়েছে, যা তদন্ত চলছে। এলাকায় সামাজিক দুটি পক্ষ থাকায় এক পক্ষ অপর পক্ষকে ঘায়েল করতে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করছে। এলাকায় পুলিশি পাহারা অব্যাহত রয়েছে। লুটপাটের বিষয়ে তিনি খোঁজ নিয়ে দেখবেন বলে জানিয়েছেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here