চুয়াডাঙ্গা-১ আসনের বৃহত্তর অংশ আলমডাঙ্গা উপজেলা তৃণমূলে গুরুত্ব আওয়ামী লীগের : এখনও উপেক্ষা বিএনপির

রহমান মুকুল: আওয়ামী লীগ শুধু বয়জেষ্ঠ রাজনৈতিক দলই নয়, সাংগঠনিকভাবে মজবুত বটে। তবে স্থানীয় নেতাদের দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়া টিআর, কাবিখা বিভাজনের কর্তৃত্ব বারবার পরিবর্তন, এমপির একনায়কসুলভ আচরণ ইত্যাদির কারণে সে দৃঢ়মূল সাংগঠনিক শক্তিমত্তা বেশ খানিকটা নাজুক অবস্থায় পড়েছে। শুধু এমপিকে তুষ্ট করে আলমডাঙ্গার অনেক নেতা বছরের পর বছর তৃণমূলকে উপেক্ষা করে নিজের আখের গুছিয়েছেন। ফলে তৃণমূলে অসন্তুষ্টির উত্তাপে সমর্থকদের মন পুড়েছে। নেতার একনায়কতান্ত্রিকতা নিশ্চিত করতে ভারপ্রাপ্তের ভারে নতজানু করা হয়েছে দলকে। আলমডাঙ্গা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সম্পাদকের দুটি পদই দীর্ঘদিন ধরে ভারপ্রাপ্ত দিয়ে চালানো হচ্ছে। একে তো সভাপতি ও সম্পাদকের পদের মর্যাদা ও ভার বহনে স্বাভাবিকভাবেই এ ক্ষতি। এ ক্ষতির জবাবদিহিতার ভয়ে দলের ক্ষমতাবানদের বাঘবন্দির ছকে স্বেচ্ছাবন্দি হয়ে পড়েন তারা। অযোগ্যতা ঢাকতে শুরু করেন মাত্রাতিরিক্ত ওপরওয়ালা তোষণ। এ প্রসঙ্গে কথা হয় ইয়াকুব আলি মাস্টারের সাথে। তিনি উপজেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক। নিজে ব্যতিক্রম শুধু দাবি করে ইয়াকুব আলি মাস্টার জানিয়েছেন, তিনি ছাত্রজীবন থেকে রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত। তাকে সংগঠনের কাজ করার সুযোগ দেয়া হয়নি। এক্ষেত্রে যে ব্যর্থতা, তার দায়ভার তার নয়। সভাপতি ও সম্পাদককে বাদ দিয়ে এমপি তার পছন্দমতো ব্যক্তি দিয়ে টিআর, কাবিখার চাল ও গম ভাগ করিয়েছেন। ফলে একদিকে যেমন ক্ষমতার ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে, অন্যদিকে দলীয় শৃঙ্খলাও নষ্ট হয়েছে। সভাপতি ও সম্পাদকের প্যারালাল শক্তি সৃষ্টি করেছেন। বছরের পর বছর ধরে এ অপনীতি অনুসরণের ফলে দলীয় চেন অব কমান্ড ভেঙে পড়েছে। পরিবর্তে চালু হয়েছে লাগামহীন ওপরওয়ালা তোষণনীতি। তৃণমূল পর্যায়েও সৃষ্টি করা হয়েছে চাটুকার সংস্কৃতি। এ চাটুকাররা সর্বত্র এমনকি তৃণমূল পর্যায়েও দলীয় শৃঙ্খলা নষ্ট করেছে। ফলে তৃণমূল পর্যায়ে সরকারের ব্যর্থতা আড়াল কিংবা সফলতা তুলে ধরার চে তোষামোদি করে স্বার্থ হাসিল করতেই এরা ব্যস্ত থাকে। সে কারণে বছরের পর বছর ধরে দুর্বল হয়েছে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক শক্তি।

                তৃণমূলের এ বেহালদশা স্বাভাবিকভাবেই প্রবীণ আওয়ামী লীগারদের ক্ষুব্ধ করেছে। ক্ষুব্ধ হয়েছে সরকারের ওপর সাধারণ মানুষ। তবে দেরিতে হলেও কিছুটা বোধদয় হয়েছে নেতাদের। সম্প্রতি খোকনের তৃণমূল পর্যায়ে গণসংযোগ আওয়ামী লীগের নিষ্পৃহ কর্মীদের উজ্জীবিত করেছে। যুবলীগ নেতা খোকনের গণসংযোগের পর নড়েচড়ে বসেছেন এমপি সোলায়মান হক জোয়াদ্দার ছেলুন। তিনিও পাল্টা এক বিশাল মোটরসাইকেল শোভাযাত্রা বের করেন। এ ঘটনা দুটি অনেকে বাঁকা চোখে দেখলেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে দলে। স্থবিরতা ভুলে আড়ামোড়া ভেঙে জেগে উঠতে শুরু করেছে দল।

                কিন্তু যুগ সঞ্চিত স্থবিরতা বিরাজ করছে এখনও বিএনপিতে। স্থানীয়ভাবে মোটা দাগে বিএনপি দু ভাগে বিভক্ত হলেও এখন তাতে আরও দুটি উপগ্রুপ যোগ হয়েছে। পূর্বে শুধু টিলু গ্রুপ ও মীর মহি গ্রুপ ছিলো। এখন দু গ্রুপের কিছু নেতা নতুন করে কর্নেল কামরুজ্জামান গ্রুপ সৃষ্টি করেছেন। আবার টিলু গ্রুপের মধ্যে টিলু ও শেখ সাইফুল গ্রুপ সৃষ্টির পাঁয়তারা চলছে। স্থানীয় বিএনপির এসব বিভক্তি শুধু শহর কেন্দ্রিক। স্থানীয় বিএনপির জনপ্রিয় নেতা শহিদুল কাউনাইন টিলূ বর্তমানে বেশির ভাগ সময় বাইরে থাকেন। এ সুযোগে সংগঠনে নিজের কর্তৃত্ব প্রকট করে তুলতে এতো বিভক্তির সূচনা। বিভক্তির ফলে অপেক্ষাকৃত কম এমন কি অযোগ্যরাও গুরুত্ব পায়, নেতা হয়। অবস্থা এমন ‘একি বিধির লীলা খেলা/বকের গলায় তুলসী মালা’। এ সব গ্রুপবাজরা বিএনপি ক্ষমতায় এলে কে কী দায়িত্ব নেবেন সেই মহড়া দেন। অপ্রিয় হলেও সত্য যে, কে থানার দালালি, কে খাদ্য গুদামের আর কে রেজিস্ট্রি অফিসের দায়িত্ব নেবেন সে বিষয়ে চালাচ্ছেন জোর তদবির ও গালগল্প। এদের তৃণমূলে সাংগঠনিক কোনো তৎপরতা নেই। মূলগ্রুপ হিসেবে টিলু গ্রুপ কেন্দ্রীয় কর্মসূচি পালন করে এলেও মীর মহি গ্রুপ প্রায় নিস্ক্রিয়। মীর মহি গ্রুপের উপজেলা সম্পাদক সানোয়ার হোসেন লাড্ডু ও টিলু গ্রুপের সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল জব্বার সাংগঠনিক ব্যক্তি। দলীয় স্বার্থে তাদেরকে কাজ করার সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়া উচিত ছিলো। এ সব গ্রুপবাজরা ‘আকাশে ফাঁদ পেতে চাঁদ ধরতে’ উস্তাদ। এরা বিএনপির রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় যাওয়া খুবই সহজ ব্যাপার বলে মনে করেন। যেন রাতে খেয়ে ঘুমুলাম, আর সকালে উঠে চোখ মেলে দেখলাম বিএনপি রাষ্ট্র ক্ষমতায়।

বিরোধীদল দমন করতে একদিকে চাণক্যনীতি। অন্যদিকে নষ্ট বামদের অপকৌশলের মুখে সারাদেশে বিএনপির অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। কিন্তু আলামডাঙ্গার বিএনপি নেতারা অনেকটা জামাই-আদরে ছিলেন। ইচ্ছে থাকলে সংগঠনকে তৃণমূলে আশাতীত শক্তিশালী করে তুলতে পারতেন। কিন্তু তা করা হয়নি। শুধু ক্ষমতার যাবরকাঁটা আর উজির- নাজির মারা হয়েছে। বিএনপি নেতা নাসির উদ্দিন বিশ্বাস, ড. আসাদুজ্জামান ও কামরুজ্জামানের নিকট থেকে চিকিৎসা বাবদ যতো টাকা নেয়া হয়েছে, তা যদি সংগঠনের পেছনে খরচ করা হতো; তাহলে সংগঠন অনেক শক্তিশালী হতো। এমনটা মনে করেন অনেক রাজনৈতিক বোদ্ধা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন সকল বিভেদ, গ্রুপ, ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব ও ইগো ভুলে বিএনপিকে এখনই তৃণমূলে ঝাঁপিয়ে পড়া উচিত। কারণ সংগঠন শক্তিশালী না হলে স্বাভাবিকভাবেই সরকারি দল পাত্তা দেবে না। এমন কি নির্বাচনও অনিশ্চিত। এ কঠিন বাস্তবতা উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হলে সামনে ‘ঢাকি শুদ্ধ বিসর্জন দেয়ার’ মতো দুঃখজনক পরিণতি অপেক্ষা করছে।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *