কখনো পালিত মা কখনো পাচারকারীদের কোল : শেষ পর্যন্ত পড়শির কোলে মৃত্যু

বহু ঘটনার জন্মদিয়ে চলে গেলো বস্তির শিশু ফাতেমা

 

স্টাফ রিপোর্টার: ভুমিষ্ঠ হওয়ার পর বহু ঘটনার জন্ম দিয়ে ৮৮ দিনের মাথায় চলে গেলো ফাতেমা। চুয়াডাঙ্গা মাতৃসদনে ভুমিষ্ঠ হয় এ নবজাতক। অসহায় মায়ের দুর্গতি দেখে নবাজতককে তুলে নেন মাতৃসদনের অপর প্রসূতি আফরোজা। নাম রাখে ফাতেমা। পালিত মায়ের কোল থেকে নিয়ে আকলিমা হাজেরা খাতুনের কোলে দিলে শিশু ফাতেমা পাচারের মুখে পড়ে। উদ্ধার করে চুয়াডাঙ্গা পুলিশ। পালিত মা আফরোজা কোলে ফেরত পেলেও শেষ পর্যন্ত সেখানে রাখেননি তার মা বিউটি। অবশেষে অভাব অনটনের সংসারে অনেকটা বিনা চিকিৎসায় গতকাল বুধবার সকাল ৯টার দিকে প্রতিবেশীর কোলে মারা যায় ফাতেমা। ২ মাস ২৮ দিন বয়সে ঝরে যাওয়া ফাতেমা এখন স্মৃতি। তাকে পাচারের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় গ্রেফতারকৃত চুয়াডাঙ্গা হকপাড়ার আকলিমা জামিনে থাকলেও হাজেরা খাতুন এখনও জেলহাজতে বন্দী।

জানা গেছে, চুয়াডাঙ্গা জেলা শহরের স্টেশনের অদূরবর্তী বস্তিতে বসবাস করেন বিউটি খাতুন ওরফে শিউলী ওরফে শিলর। স্বামী আমিরুল ইসলাম কখনো অপর স্ত্রীর কাছে থাকে, কখনো হয় নিরুদ্দেশ। বিউটির কোলে দু সন্তান থাকার পর আবারও অন্তঃস্বত্ত্বা হয়। রোজার ঈদের পরদিন তথা ১০ অক্টোবর চুয়াডাঙ্গা শিশু ও মাতৃকল্যাণ কেন্দ্রে এক কন্যাসন্তান প্রসব করে। বিউটি নিজে যেমন অসুস্থ, তেমনই স্বামী উড়নচণ্ডি। সন্তানকে কে দেখবে? এ প্রশ্ন তুলে কান্না জুড়ে দিলে একই চিকিৎসা কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন অপর প্রসূতি টিঅ্যান্ডটির অপরপ্রান্তের বাসিন্দা আফরোজা খাতুনের মায়া হয়। তিনি অবস্থাদৃষ্টে শিশুকন্যাকে নিজের কন্যা হিসেবে বড় করে তোলার আগ্রহ প্রকাশ করেন। আফরোজা পুত্রসন্তান প্রসব করেন। নিজের ছেলের পাশাপাশি পালিত মেয়ে পেয়ে খুশি হন। তিনি দু নবজাতককে নিজের সন্তানের মতো করে বড় করে তোলার স্বপ্ন দেখেন। ছেলে ও মেয়ে নিয়ে বাড়ি ফেরার কয়েকদিনের মাথায় আফরোজা পড়েন চাপের মুখে। বিউটি তার মেয়েকে অন্যের কোলে দেয়ার জন্য আফরোজাকে সন্তান ফেরত দিতে বলে। বাড়ি বসে কান্না জুড়ে দেয়। এক পর্যায়ে বিউটি নিজের মেয়েকে নিয়ে বস্তিতে ফেরে। গত ২০ আগস্ট রাতে শিশু পাচারের খবর পায় পুলিশ। ঢাকার একটি কোচযোগে ঢাকার পথে শিশুকে নেয়ার সময় কোচের কয়েকযাত্রীর সহযোগিতায় শিশুটি উদ্ধার হয়। ধরা পড়ে চুয়াডাঙ্গা হকপাড়ার বাসিন্দা আবুল কাশেমের স্ত্রী আকলিমা ও নয়নের স্ত্রী হাজেরা খাতুন। পরদিন এদেরকে আদালতে সোপর্দ করা হলে বিজ্ঞ আদালত জেলহাজতে প্রেরণের আদেশ দেন। নবজাতককে তার পালিত মায়ের কোলেই তুলে দেয়া হয়। আকলিমা অবশ্য পরে জামিনে মুক্ত হন। হাজেরা জেলহাজতেই বন্দী।

এদিকে বিউটি তার শিশুকন্যাকে পালিত মা আফরোজা খাতুনের নিকট থেকে ফিরিয়ে নেয়ার জন্য উৎপাত শুরু করেন। কখনো কান্না, কখনো আপত্তিকর অভিযোগ। ফলে আফরোজা খাতুন আদালতের মাধ্যমে গত ২৯ সেপ্টেম্বর বিউটির মেয়ে ফাতেমাকে বিউটির কোলে ফেরত দেন।

প্রতিবেশীরা বলেছেন, বিউটি খাতুন ওরফে শিউলী ওরফে শিলরের স্বামী থেকেও নেই। দরিদ্র। বিউটির পেট বিউটিকেই চালাতে হয়। প্রতিদিন সকালে বাড়ি থেকে বের হয়। সন্ধ্যায় ফেরে। সারাদিন এটা সেটা কুড়িয়ে যা হয় তা দোকানে বিক্রি করে সন্তানদের জন্য ওষুধপথ্য ও চাল নুন কিনে বাড়ি ফেরে। সকালে বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় শিশুকন্যাকে প্রতিবেশী যেকোনো একজনের বাড়িতে ফেলে রেখে যায়। গতকালও সকালে এক প্রতিবেশীর কোলে রেখে বিউটি বের হয় পথে। কিছুক্ষণ পরই খবর পেয়ে বাড়ি ফেরে। শিশুকন্যার মৃতদেহ দেখে কান্নায় ভেঙে পড়ে। এ সময় আকলিমা অবশ্য অভিযোগ তুলে বলে, ওই আফরোজা যখন ফেরত দেয়, তখন থেকেই ফাতেমা অসুস্থ। সেই অসুস্থতা থেকে আর সুস্থ হলো না। শেষ পর্যন্ত বাঁচিয়ে রাখা গেলো না। আকলিমার অভিযোগ মনগড়া বলে মন্তব্য করে স্থানীয়দের কয়েকজন বলেছেন, পালিত মায়ের নিকট থেকে ফেরত নেয়ার জন্য এরাই চক্রান্ত করেছিলো। অভাবের সংসারে পেটই চলে না। এরপরও বিউটি রোজ ওষুধ কিনে বাড়ি ফিরতো। আর মাঝে মাঝে আফরোজা খোঁজখবর নিতো। কিছু দিতোও।

চুয়াডাঙ্গা পৌরসভায় চাকরি করেন আফরোজা। স্বামী প্রকৌশলী। গতকাল আফরোজা খাতুনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি অন্তঃস্বত্ত্বা অবস্থায় মাতৃসদনে ভর্তি হয়েছিলাম। পাশের বিছানায় ছিলো বস্তির বিউটি ওরফে শিউলী। আমার সন্তান হলো ছেলে, আর বিউটির মেয়ে। মেয়েসন্তান ফেলে চলে যাওয়ার চেষ্টা করে বিউটি। বস্তির দুর্দশার বিস্তারিত শোনার পর শিশুকন্যার ওপর মায়া হলো। কন্যাটাও কেমন যেন আমার দিকে মায়া মায়া দৃষ্টিতে তাকাতে লাগলো। সেই মায়া থেকেই নিজের মেয়ে হিসেবে বড় করে তোলার কথা ভাবতে শুরু করলাম। মেয়েক রেখে বিউটির চিকিৎসার জন্য কিছু টাকা দিয়ে মাতৃসদন থেকে বিদায় দিলাম। আমার ছেলে ও বিউটির মেয়েকে নিজের মেয়ের মতো করেই কোলে নিয়ে বাড়ি ফিরলাম। অমনি চক্রান্ত শুরু হলো। আমার কোল থেকে খানেকটা কেড়ে নেয়ার মতো করে নিয়ে গেলো বিউটি। পরে শুনি শিশুকন্যা পাচার হয়ে গেছে। ঢাকায় পাচার হওয়ার খবরে বসে থাকতে না পেরে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছিলাম। ফেরতও পেয়েছিলাম শিশু ফাতেমাকে। রাখতে পারলাম না ওই বিউটির জন্যই। রাখতে না পেরে আদালতের মাধ্যমে ফেরত দিয়েও চুপ করে বসে থাকিনি। মায়ার টানেই মাঝে মাঝে খোঁজ নিতাম। খাবারও দিতাম। এরপরও ওরা ফুটফুটে মেয়েটাকে বাঁচিয়ে রাখতে পারলো না। বাঁচাতে পারলো না, বাঁচাতে দিলোও না।

কতোদিন ধরে শিশু ফাতেমা অসুস্থ? এর জবাবে বস্তিবাসীদের কয়েকজন বলেন, মাসখানেক ধরেই বুকে ঘড়ঘড় শব্দ করতো। হাসপাতালেও নেয়া হয়েছিলো। ইনজেশকনসহ কিছু ওষুধ লিখিয়ে দিয়েছিলো ডাক্তার। অভাবী বিউটি ওষুধ কোথায় পাবে? তবুও চাল কেনার টাকা বাঁচিয়ে কিছু ওষুধ নিয়েই বাড়ি ফিরতো। খাওয়াতো। তাতে তো কাজ হলো না। ফুলে গেলো পেট। প্রতিবেশীর কোলেই মারা গেলো শিশু ফাতেমা। অল্প কিছুদিনের জন্য জগতে এসে ফাতেমা বহু ঘটনার জন্ম দিয়ে বিনা চিকিৎসায় পাড়ি জমালো পরপারে। কাঁদালো বিউটিকে, মুখ লুকিয়ে কাঁদলেন আফরোজাও। ফাতেমাকে বাঁচাতে না পারার দায় কার? প্রশ্নটা থেকেই গেলো।

Leave a comment

Your email address will not be published.