এবার অভিজিত হত্যার প্রধান আসামি বন্দুকযুদ্ধে নিহত

 

স্টাফ রিপোর্টার: পুলিশ বলছে, লেখক, প্রকাশক, ব্লগারসহ অন্তত ৭টি হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত ছিলো সে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন গুরুত্বপূর্ণ একজন আসামিকে গ্রেফতার করতে গিয়ে পুলিশের কি আরো বেশি সতর্ক হওয়া উচিত ছিলো না? যারা শরীফকে গ্রেফতারের অভিযানে গিয়েছিলেন তাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া উচিত।

আবার সেই বন্দুকযুদ্ধ। পুলিশের ভাষ্যমতে, শনিবার দিবাগত রাত ২টার দিকে রাজধানীর খিলগাঁও থানার মেরাদিয়া এলাকার বাঁশপট্টি এলাকায় এই বন্দুকযুদ্ধ হয়। এবার নিহত হয়েছে শরীফুল ওরফে সাকিব ওরফে শরীফ ওরফে সালেহ ওরফে আরিফ ওরফে হাদি (৩৫)। পুলিশ বলছে, শরীফ বিজ্ঞানমনষ্ক লেখক অভিজিত্ রায় হত্যা মামলার ‘প্রধান আসামি’। শুধু তাই নয়, লেখক, প্রকাশক, ব্লগারসহ অন্তত ৭টি হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত ছিলো সে।

বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন তুলেছেন, এমন গুরুত্বপূর্ণ একজন আসামিকে গ্রেফতার করতে গিয়ে পুলিশের কি আরো বেশি সতর্ক হওয়া উচিত ছিলো না? একদিন আগেই মাদারীপুরে প্রভাষককে হত্যা চেষ্টা মামলার হাতেনাতে ধরা পড়া আসামি পুলিশের হেফাজতে থাকা অবস্থায় একই কায়দায় বন্দুকযুদ্ধে নিহত হলো। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পুলিশের দাবি যদি সত্য বলে ধরে নিলে যারা শরীফকে গ্রেফতারের অভিযানে গিয়েছিলেন তাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া উচিত। কারণ যে আসামি এতোগুলো হত্যাকাণ্ডে জড়িত তার কাছ থেকে অনেক তথ্যই জানার ছিলো। ঘটনার পেছনের মদদদাতা, উসকানিদাতাসহ সংশ্লিষ্টদের তথ্য জানা যেতো। কেন তাকে গ্রেফতার করতে গিয়ে সতর্ক ছিলো না পুলিশ?

খোদ মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপ-কমিশনার মাশরুকুর রহমান খালেদ গতকাল রবিবার ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে ঘোষণা করেছেন, লেখক-ব্লগার হত্যার যতগুলো ঘটনা ঘটেছে তার প্রত্যেকটি শরীফ জানত। শরীফ ব্লগার অভিজিত্ রায় হত্যায় সরাসরি অংশ নিয়েছিল, প্রকাশক টুটুল হত্যাচেষ্টার দিন লালমাটিয়ায় বাড়ির বাইরে অবস্থান করছিল এবং ওয়াশিকুর বাবু হত্যা, আশুলিয়ায় রিয়াজ মোর্শেদ বাবু হত্যারও সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেছিল। অন্তত ৭টি হত্যাকাণ্ডে তার সম্পৃক্ততা ছিলো।

ব্রিফিংয়ে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার আব্দুল বাতেন জানান, শরীফ নিষিদ্ধ আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সামরিক ও আইটি শাখার শীর্ষ পর্যায়ের একজন প্রশিক্ষক ছিল। ব্লগার, প্রগতিশীল লেখক ও প্রকাশক হত্যায় আনসারুল্লাহর যে ৬ সদস্যকে ধরতে পুলিশ গত ১৯ মে ১৮ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছিল, শরীফ তাদের মধ্যে ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’। তাকে ধরতে ৫ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছিল মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ।

দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো ‘বন্দুকযুদ্ধ’ বা ‘ক্রসফায়ারে’ নিহত হওয়ার ঘটনাকে ‘বিচারবহির্ভূত হত্যা’ হিসেবে চিহ্নিত করে সরকার ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সমালোচনা করে আসছে। শনিবার সকালে মাদারীপুরে  কলেজ শিক্ষক রিপন চক্রবর্তীর উপর হামলার সময় হাতেনাতে গ্রেফতার ‘শিবিরকর্মী’ গোলাম ফাইজুল্লাহ ফাহিমও ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন। ওই ঘটনাকে ‘বন্দুকযুদ্ধের নামে হত্যা’ হত্যা দাবি করে বিএনপি বলছে, সরকার প্রকৃত ঘটনা ‘আড়ালের’ চেষ্টা করতেই এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। এভাবে সরাসরি খুনের সঙ্গে জড়িতরা মারা যাওয়ায় মামলার ক্ষতি হবে কি-না এমন প্রশ্নের জবাবে যুগ্ম-কমিশনার আব্দুল বাতেন বলেন, ‘অন্যদের জবানবন্দি দিয়েই চলবে।’

গত বছর ফেব্রুয়ারিতে অভিজিত্ খুন হওয়ার পর একে একে খুন হয়েছেন অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট ওয়াশিকুর রহমান বাবু, ব্লগার অনন্ত বিজয় দাশ, নীলাদ্রি চট্টোপাধ্যায় নীলয়, অভিজিতের বইয়ের প্রকাশক ফয়সল আরেফিন দীপন এবং গণজাগরণ মঞ্চের কর্মী ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নাজিমুদ্দিন সামাদ। এর আগে যুদ্ধাপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবিতে ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে গণজাগরণ আন্দোলন শুরুর কয়েক দিনের মাথায় খুন হয়েছিলেন ব্লগার আহমেদ রাজীব হায়দার। গোয়েন্দা পুলিশ বলছে, আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের ‘অপারেশন বিভাগ’-এর ‘গুরুত্বপূর্ণ সদস্য’ ছিলেন শরীফ, যে বিভাগ প্রত্যেক হত্যার পরিকল্পনা থেকে পুরো পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের দায়িত্বে।

শরীফ যে অভিজিত্ রায় হত্যাকারীদের অন্যতম তা নিশ্চিত হলেন কিভাবে সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে আব্দুল বাতেন বলেন, আমরা টিএসসির ভিডিও ফুটেজ মিলিয়ে দেখেছি। তাছাড়া আমাদের কাছে আগে থেকেই তথ্য ছিল অভিজিত্ হত্যাকাণ্ডে শরীফ অংশ নেয়। তার গ্রামের বাড়ি সাতক্ষীরায়। বন্দুকযুদ্ধের পর ওইসব তথ্য মিলিয়ে আমরা নিশ্চিত হয়েছি শরীফ অভিজিতের হত্যাকারী। অন্যান্য হত্যাকাণ্ডে তার কি ভূমিকা ছিল -এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, শরীফ মূলত পরিকল্পনাকারী ও প্রশিক্ষক। জুলহাজ ও তনয় হত্যাকাণ্ডে তার টিম অংশ নিয়েছিল। ওয়াশিকুরের ঘটনায় তার বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে।

জাগৃতির প্রকাশক ফয়সাল আরেফিন দীপন হত্যা, তেজগাঁও এ ওয়াশিকুর রহমান বাবু হত্যা এবং গত দুই মাসে সুত্রাপুরে সংঘটিত ব্লগার নাজিমউদ্দিন সামাদ, কলাবাগানে জুলহাজ মান্নান ও তনয় হত্যার অন্যতম পরিকল্পনাকারী হিসেবেও তার বিষয়ে তথ্য পাওয়া গেছে। অভিজিত্ রায় হত্যাকাণ্ডে তদন্তে সিসিটিভি ফুটেজে তার উপস্থিতি ধরা পড়েছে বলে জানান তিনি।

ডিবির উপ-কমিশনার মাশরুকুর রহমান খালেদ বলেন, গত ১৫ জুন একই দলের সদস্য সুমন হোসেন পাটোয়ারি ওরফে শিহাব ওরফে সাকিব ওরফে সাইফুলকে গ্রেফতার করে পুলিশ। শুদ্ধস্বরের প্রকাশক আহমেদুর রশীদ টুটুল হত্যাচেষ্টা মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে তাকে রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। তিনি বলেন, শিহাবের কাছ থেকে জিজ্ঞাসাবাদে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে শনিবার রাতে খিলগাঁয়ের মেরাদিয়া এলাকায় অভিযান চালায় ডিবি। ওই সময় একটি মোটরসাইকেলে ৩ জন দ্রুত গতিতে ডিবির চেকপোস্ট অতিক্রম করার সময় তাদের থামার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু তারা নির্দেশ অমান্য করে দ্রুত গতিতে পালানোর চেষ্টা করে এবং একই সাথে তারা ডিবিকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। পরে ডিবিও পাল্টা গুলি চালালে মোটরসাইকেলসহ তিন আরোহীই রাস্তায় পড়ে যায়। পরে দু’জন দৌড়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেও গুলিবিদ্ধ এক যুবক ঘটনাস্থলেই পড়ে থাকে। ওই যুবককে সংজ্ঞাহীন অবস্থায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিত্সক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। পরে মোস্ট ওয়ান্টেড ৬ জঙ্গির ছবির সাথে মিলিয়ে পুলিশ নিশ্চিত হয়, নিহত ব্যক্তিই এবিটির সামরিক শাখার শীর্ষ নেতা শরিফুল ওরফে শরীফ ওরফে হাদি-১।

সেলিম নামে আনসারুল্লাহর ‘উচ্চপর্যায়ের এক সদস্য’ রয়েছেন জানিয়ে পুলিশ কর্মকর্তা মাশরুকুর বলেন, ‘কাকে হত্যা করতে হবে, কেন হত্যা করতে হবে, কোনো এলাকায় কীভাবে গিয়ে হত্যা করতে হবে- তার সব তথ্য সংগ্রহ করে নির্দেশনা দেন সেলিম। এছাড়া যারা হত্যায় অংশ নেবেন তাদের উদ্বুদ্ধকরণ প্রশিক্ষণ দেন। নিজেদের যুক্তি তুলে ধরে সংগঠনের পক্ষ থেকে কেন ওই লোককে হত্যা করা জরুরি- তাও সেলিম ব্যাখ্যা করেন। হত্যা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগে শরীফ ও সেলিম তাদের একজন অপারেশনাল প্রধান (বড় ভাই) এর সঙ্গে বৈঠক করতেন। এজন্য তারা রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় তাদের ভাড়া বাসায় বসতেন।’

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের এই রকম বেশ কিছু ভাড়া বাসার তথ্য গোয়েন্দারা সংগ্রহ করেছেন বলে জানান তদন্ত সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা। মাশরুকুর রহমান খালেদ বলেন, ‘অপারেশনাল প্রধানের সঙ্গে বৈঠকে হত্যায় সংগঠনের লক্ষ্য কিভাবে বাস্তবায়ন হবে সেটিও তুলে ধরতেন সেলিম ও শরীফ। এরপর যাকে হত্যা করতে হবে তার গতিবিধির উপর নজরদারি বাড়াতেন। তার বাসা ও কর্মস্থলের এলাকা তারা সাত দিন আগে রেকি করতেন।’ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজির ছাত্র শরীফের বাড়ি সাতক্ষীরা এলাকায়। তিনি একটি বেসরকারি এনজিওতে চাকরি করতেন বলে গোয়েন্দাদের কাছে তথ্য ছিল। ব্লগার, প্রগতিশীল লেখক, প্রকাশক হত্যায় জড়িত সন্দেহভাজন যে ছয় জঙ্গি সদস্যকে ধরিয়ে দিতে পুলিশ মাসখানেক আগে পুরস্কার ঘোষণা করেছিল, তাদের মধ্যে শরিফুল দ্বিতীয় জন, যার সন্ধান পাওয়ার খবর দিল পুলিশ।

উল্লেখ্য, ২০১৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় কুপিয়ে হত্যা করা হয় অভিজিেক। যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী অভিজিত্ বই মেলায় অংশ নিতে ওই মাসেই স্ত্রীকে নিয়ে দেশে এসেছিলেন। অভিজিত্ হত্যাকাণ্ডের কয়েক মাস পর ওই হত্যার দায় স্বীকার করে বিবৃতি এসেছিল আল-কায়েদার ভারতীয় উপমহাদেশ শাখার (একিউআইএস) নামে।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *